পেন্যু কাঠের মশালের চারপাশে জোয়ান ছেলেরা অসহ্য শীতে কুঁকড়ে যাচ্ছিল তখন। হিমের কামড় থেকে নিজেদের দেহগুলো বাঁচাবার জন্য সবাই কুণ্ডলী পাকিয়ে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে পরস্পরের গায়ে গা ঘষে উত্তাপ সৃষ্টি করে নিচ্ছিল।
চমকে জোয়ান ছেলেরা তাকিয়েছিল ওঙলে আর পিঙলেই-এর দিকে, কি রে, কী ব্যাপার? চিতাটা কোথায়?
আতঙ্কগ্রস্তের মতো ওঙলে বলেছে, শিগগির উঠে পড়। বাঘ-মানুষ হুই চিতাটার পেছনে রয়েছে। চল, চল।
বাঘ-মানুষ! ভয়ে প্রথমটা কাঠ হয়ে গিয়েছে জোয়ান ছেলেগুলো। পরক্ষণে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। মাটিতে পেন্য কাঠের মশাল পুঁতে রাখা ছিল। পট পট করে সেগুলো তুলে ফেলেছিল তারা।
ওঙলে বলেছিল, বস্তির দিকে পালাই চল। হুই বাঘ-মানুষ যদি বাঘ চালান করে, তাহলে নির্ঘাত সাবাড় হয়ে যাব। চল চল–দৌড়ো, দৌড়ো–
প্রাণ বাঁচানোর তাড়নায় জোয়ান মানুষগুলো মশাল হাতে খাড়া চড়াইয়ের দিকে উঠে গিয়েছিল।
কে যেন বলেছিল, সেঙাইটা কোথায় যে পড়ে রইল! তাকে খুঁজে বার করতে হবে না? সেঙাই-এর কথা সদ্দারকে কী বলবি, কি রে ওঙলে?
থাম শয়তানের বাচ্চা, আগে বাঘ-মানুষের হাত থেকে জান বাঁচা। তারপর সেঙাই-এর কথা ভাবিস।
অন্য একজন বলেছিল, এ নির্ঘাত হুই নানাকোয়া বস্তির মেজিচিজুঙ। পশ্চিম, উত্তর আর দক্ষিণ পাহাড়ের বনে ওর অনেক বাঘ পোষা আছে। রাত্তিরে বাঘ নিয়ে বেরোয় ইদিকে সিদিকে।
বনের মধ্যে দিয়ে চড়াই উতরাই পেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে কেলুরি গ্রামের মোরাঙের সামনে চলে এসেছিল ওঙলেরা। রীতিমতো হাঁপাচ্ছে তারা।
মোরাঙের চারপাশে গোল হয়ে ঘিরে বসে ছিল গ্রামের মেয়েপুরুষ। পুরুষদের মধ্যে কেউ কেউ মোরাঙের ভেতর চলে এসেছিল। বিশাল পাথরখানার ওপর দাঁড়িয়ে খ্যাপা মোষের মতো তখন ফোঁসফোঁস করছে বুড়ো খাপেগা, সিজিটোর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিতে হবে। এত বড় পাপ চলবে না এই বস্তিতে। হু-হু, সিধে কথা।
বুড়ো খাপেগার পাশে একটা বর্শা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সারুয়ামারু। তার চোখ দুটো দপদপ করছিল। সেই মুহূর্তে সে হত্যা পর্যন্ত করতে পারত, সে পারত একটা বাঘের মতো গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়তে।
ওঙলেরা মোরাঙের মধ্যে ঢুকে জিগ্যেস করেছিল, কী ব্যাপার সদ্দার?
কী আবার? সিজিটো হুই সারুয়ামারুর বউ জামাতসুর ইজ্জত নিয়েছে। শয়তানটাকে জানে মেরে ফেলে দেব একেবারে।
হু-হু। আমি মোরাঙে এসেছিলাম, সেই ফাঁকে হুই শয়তান সিজিটোটা আমার কেসুঙে হাজির হয়েছে। আমি ঘরে ঢুকে হাতেনাতে ধরেছি। তা আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে হুই পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেল। একেবারে কলিজা ফেঁড়ে রক্ত নিয়ে আনিজাকে দেব। ইজাহান্টসা সালো–হাতের থাবায় বিশাল বর্শাটায় ঝাঁকানি দিয়ে, রক্তাভ চোখ দুটোকে আরো দপদপে করে হুঙ্কার দিয়ে উঠেছে সারুয়ামারু।
মোরাঙের বাইরে একটানা হইচই চলছিল। ছোট্ট গ্রাম কেলুরির সমস্ত মানুষ সমস্বরে চেঁচাচ্ছিল। সে চিৎকারের ছেদ নেই, বিরতি নেই। ওঙলে জিগ্যেস করেছিল, জামাতসু আর সিজিটো কোথায়?
সারুয়ামারু খ্যাপা গলায় গর্জে উঠেছে, বললাম তো, সিজিটো হুই বাইরের পাহাড়ের দিকে পালিয়েছে। আর জামাতসুকে বর্শা দিয়ে ফুড়ে রেখে দিয়েছি। আহে ভু টেলো। কদর্য গালাগালিতে জা কুলি মাসের রাতটাকে কুৎসিত করে তুলেছে সারুয়ামারু, সিজিটোর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে তবে এবার ছাড়ব। রামখোটাকে পেলে বর্শা দিয়ে ছুঁড়ব।
মোরাঙের বাইরে দাঁড়িয়ে সিজিটোর মা বুড়ি বেঙসানুও সমানে ভাঙাচোরা দাঁতগুলোতে কড়মড় আওয়াজ করে বলেছে, ইজা রামখো। আমার আবার জানতে বাকি আছে! হুই সারুয়ামারুর বউ জামাতসু মাগীর কথা বস্তির কে না জানে! শয়তানীর সঙ্গে সব জোয়ানের পিরিত। যত দোষ হল সেঙাইর বাপের! আপোটিয়া।
দৌড়ে মোরাঙের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল সারুয়ামারু, চুপ কর বুড়ি মাগী। বেশি বকর বকর করবি তো একেবারে গলা টিপে মেরে ফেলব। সাউঁকিরি করতে হবে না ছেলের হয়ে। মোরাঙের দিকে হুসিও পাখির মতো গলাটা বাড়িয়ে দিয়ে সারুয়ামারু চেঁচিয়ে উঠেছে, সদ্দার, তুই ইদিকে আয়। একবার খালি বল, সিজিটোর ঘরবাড়ি সব জ্বালিয়ে দিই–
কয়েক দিন আগে সূর্য ওঠার রূপকথা নিয়ে সারুয়ামারুর সঙ্গে বুড়ি বেঙসানুর প্রায় একটা খণ্ডযুদ্ধ বাধবার উপক্রম হয়েছিল। সেদিন এই কেলুরি গ্রামের সব মানুষ বর্শা বাগিয়ে বেঙসানুর পাশে দাঁড়িয়েছিল। তারাই আজ আবার সারুয়ামারুর পাশে অন্তরঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাতের থাবায় তাদের জীমবো পাতার মতো ভয়াল বর্শাফলক। আর গলায় প্রবল চিৎকার।
হো-ও-ও-আ—আ–
মশালের আলোতে তাদের ভয়ঙ্কর হিংস্র দেখাচ্ছিল। ভিড়ের ভেতর একজনেরও তর সইছিল না। তারা বলছিল, কই রে সারুয়ামারু, চল তাড়াতাড়ি। সিজিটোর ঘরখানা পুড়িয়ে আসি।
ও সদ্দার, তুই একবার খালি বল। অনেকগুলো গলা উত্তেজনায় ক্রমশ উঁচু পর্দায় চড়ছিল, তুই বললেই আমরা মশাল নিয়ে আসি।
বুড়ো খাপেগা একপাশে দাঁড়িয়ে মানুষগুলোর ভাবগতিক লক্ষ করছিল। এবার সে রায় দিয়েছে। সব গলার কোলাহল ছাপিয়ে তার হুঙ্কার উঠেছে আকাশের দিকে, চুপ কর শয়তানের বাচ্চারা। কানের পর্দা ফাটিয়ে দিচ্ছে সবগুলো মিলে।
