কে যেন বলেছিল, বড় শীত ওঙলে। আর এখানে বসে থাকা যাবে না। নির্ঘাত মরে যাব।
ওঙলে বলেছিল, তাই তো, সালুয়ালাঙ বস্তিটা মড়ার মতো পড়ে রয়েছে। সেঙাই-এর মাথা বর্শা দিয়ে গেঁথে নিয়ে যেতে পারলে এতক্ষণে হল্লা করে পাহাড় ফাটিয়ে ফেলত হুই শয়তানের বাচ্চারা।
হু-হু– সকলেই গোলাকার কামানো মাথা ঝাঁকিয়েছিল।
ওঙলে আবারও বলতে শুরু করেছিল, এক কাজ করি আয়, আমরা হল্লা শুরু করে দিই। যদি সত্যি সত্যি সেঙাই-এর মাথা ওরা নিয়ে থাকে, ঠিক সাড়া দেবে সালুয়ালাঙের রামখোরা।
হু-হু–
একটু পরেই টিজু নদীর নীল ধারাকে চমকে দিয়ে অনেকগুলো গলায় গর্জন উঠেছিল। সে গর্জনে শিউরে উঠেছিল আকাশের আনিজা উইথু।
হো-ও-ও-ও– য়া–আ—আ—
হো-ও-ও-ও– য়া –আ-আ–
একসময় গর্জনের রেশ থেমে গিয়েছিল। তারপরও অনেকক্ষণ টিজু নদীর কিনারায় উৎকর্ণ হয়ে থেকেছে ওঙলেরা। তাদের এই হুঙ্কারের জবাব ওপারের সালুয়ালা গ্রাম দেয় কিনা তা শোনার জন্য তারা ব্যর্থ হয়ে ছিল।
কিন্তু নাঃ, কেউ পালটা হুঙ্কার দেয়নি। সালুয়ালাঙ বস্তিটা একেবারেই নিঝুম হয়ে ছিল।
ওঙলে বলেছিল, ওপারে সেঙাই যায়নি বলেই মনে হচ্ছে। তবে সে গেল কোথায়? যাবি না কি একবার সালুয়ালাঙ বস্তিতে?
ওঙলের প্রশ্নগুলোর জবাব দেবার আগেই কয়েকটা গলায় উল্লসিত আওয়াজ শোনা গেল, চিতাবাঘ, হুই যে চিতাবাঘ—
জোয়ান মানুষগুলোর কৌতূহল চোখের পিঙ্গল মণিতে এসে ঘন হয়েছিল। সামনে, ঠিক টিজু নদীর মাঝামাঝি একটা কালো পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে জন্তুটা। দুই চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দু পাশের উপত্যকায় কী যেন খুঁজছিল চিতাটা। এই জা কুলি মাসের হিমাক্ত রাত্তিরে কী কারণে সে বেরিয়ে এসেছিল গুহার উষ্ণ আরাম ছেড়ে, কে জানে। মসৃণ একটি ঘুমের অতলে ডুবে যাবার ইচ্ছা তার হয়তো ছিল না।
চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে একবার মৃদু গর্জন করে উঠেছিল চিতাবাঘটা, হো-উ-উ–ম-ম–
ওঙলে এবার বলেছিল, তার গলাটা জা কুলি রাত্রির ভৌতিক অন্ধকারে আশ্চর্য ফিসফিস শুনিয়েছিল, তোরা সব বোস্। আমি আর পিঙলেই যাচ্ছি। বর্শা দিয়ে চিতাটাকে ছুঁড়ে আনব। তারপর মশালের আগুনে ঝলসে খাওয়া যাবে। বড় খিদে পেয়ে গেছে। খবদ্দার, হল্লা করবি কেউ।
ওঙলে আর পিঙলেই নিঃশব্দে পাহাড়ের উতরাই বেয়ে টিজু নদীর দিকে নেমে গিয়েছিল। আর খানিকটা উঁচুতে ঘন খাসেম বনের মধ্যে কয়েকটা রক্তবিন্দুর মতো জ্বলছিল পেন্য কাঠের মশালগুলো। আর সেগুলোকে ঘিরে ঘন হয়ে বসেছিল কেলুরি গ্রামের জোয়ান ছেলেরা। জা কুলি মাসের সেই রাত ক্রমশ ভয়ানক হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।
একসময় থমকে দাঁড়িয়েছে পিঙলেই আর ওঙলে। এখান থেকে বর্শার সীমানায় পাওয়া যাচ্ছে চিতাবাঘটাকে।
অস্পষ্ট গলায় ওঙলে বলেছিল, এখানে দাঁড়া পিঙলেই। আমি আগে তাক করি। তারপর তুই বর্শা ছুড়বি।
পরক্ষণে সাঁ করে ওঙলের হাতের মুঠি থেকে উল্কার মতো ছুটে গিয়েছিল বর্শাটা। অব্যর্থ। লক্ষ্য। চিতাটার কোমরের ঠিক ওপরে আধহাত লম্বা ফলাটা গিঁথে গিয়েছিল। টিজু নদীকে শিউরে দিয়ে হুঙ্কার ছেড়েছিল জন্তুটা, হো-উ-উ-উ-ম-ম–
এবার পিঙলেই-এর থাবার বর্শাটা আকাশের দিকে উঠে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা ছোঁড়ার আগেই চিতাবাঘের গলার সঙ্গে মিলিয়ে একটি মানবিক কণ্ঠ কানে এসেছে। মৃত্যু যন্ত্রণায় গলার স্বরটা এই বনভূমি আর জা কুলি মাসের এই রহস্যময় রাতকে চৌচির করে আর্তনাদ করে উঠেছিল, আ-উ-উ-উ–
হো-উ-উ-ম-ম–তারপর টিজু নদীর ওপারে উপত্যকার নিবিড় বনভূমিতে চিতাবাঘটা লাফাতে লাফাতে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। তার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক গলার আর্তনাদও মিলিয়ে গিয়েছিল।
পিঙলেই-এর হাতের বর্শা স্থির হয়ে ছিল আকাশের দিকে। আর পাথরের মূর্তি হয়ে গিয়েছিল ওঙলে। দুজনে এতটুকু নড়ছিল না। একেবারে স্থির, নিশ্চল। দুজোড়া চোখ শুধু নিষ্পলক টিজু নদীর ওপারে তাকিয়ে ছিল।
হো–উ-উ-ম-ম—
আ–উ—উ–উ–
একটি হিংস্র শ্বাপদের আর একটি মানুষের আর্তনাদ ওপারের উপত্যকায় একসময় ক্ষীণ হতে হতে মিলিয়ে গিয়েছিল।
ভয়ে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে দুজনে। এবার ওঙলে কাঁপা গলায় বলেছে, টেমি খামকোয়া (বাঘ-মানুষ)। ও নির্ঘাত বাঘ-মানুষ। শিগগির চল। চিতাবাঘ চালান করলে একেবারে সাবাড় হয়ে যাব সবাই। তার গলায় বিভীষিকা ফুটে উঠেছে।
হু-হু–আবছা গলায় দু’টি শব্দ কোনোরকমে বলতে পেরেছে পিঙলেই।
তারপর সমস্ত শরীর থেকে সব নিষ্ক্রিয়তা ঝরে গিয়েছিল ওঙলে আর পিঙলেই-এর। টিজু। নদীর কিনার থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ওপরের চড়াইতে দৌড়ে চলে এসেছিল দুজনে। পেছন ফিরে আর একবারও তাকায়নি কেউ। বার বার তাদের মনে হয়েছে, ঝাঁকে ঝাকে চিতাবাঘ দিগদিগন্ত থেকে থাবা বাগিয়ে, দাঁত বার করে সাঁ সাঁ করে ছুটে আসছে। আর উপায় নেই, আর রক্ষা নেই। বাঘ-মানুষের ক্রোধে তাদের দুজনের কেউ রেহাই পাবে না। তারা কি জানত, ওই চিতাবাঘের পেছনে একটা বাঘ-মানুষের ভয়ঙ্কর উপস্থিতি রয়েছে!
তীরের মতো ছুটতে ছুটতে পেন্যু কাঠের মশালগুলোর কাছে এসে পড়েছিল ওঙলেরা। জা কুলি মাসের এই হিমঝরা রাতে তাদের গা বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছিল। বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁপাতে শুরু করেছিল ওঙলে আর পিঙলেই।
