কাল কি আমার জ্ঞান ছিল? কত ওপর থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। তুই না থাকলে কি আমি বাঁচতাম! এই দ্যাখ, গায়ে চাপ চাপ রক্ত জমে রয়েছে। বস্তিতে ফিরে একবার তামুনুর (চিকিৎসক) কাছে যেতে হবে।
সন্ধের পর আমাদের বস্তির তামুনুর কাছ থেকে ওষুধ এনে দেব তোকে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর ফের মেহেলী বলল, তুই দাদাকে মারলি কেন বল তো?
আমার ঠাকুরদাকে তোদের বস্তির লোকেরা মেরেছিল। তার শোধ নেব না? দুই চোখ ধক ধক করে জ্বলে উঠল সেঙাইর।
হু-হু। সেই জন্যে বুঝি খোকেকে মারলি? বেশ, শোধবোধ হয়ে গেল।
হু-হু, শোধবোধ হল।
আচ্ছা সেঙাই, আমি শুনেছি তোদের আর আমাদের এই দুটো বস্তি মিলিয়ে একটাই বস্তি ছিল অনেক কাল আগে। তার নাম কুরগুলাঙ। টিজু নদীর দুধারের লোকদের মধ্যে খুব খাতির ছিল, পিরিত ছিল।
আমিও তাই শুনেছি। আমাদের খাপেগা সদ্দার মোরাঙে বসে সেসব গল্প বলেছিল।
মেহেলী বলতে লাগল, তার কণ্ঠ এখন আশ্চর্য কোমল শোনাচ্ছে, আচ্ছা, আমাদের বস্তির লোক তোর ঠাকুরদার মুণ্ডু কেটেছিল। তুইও আমার দাদাকে মারলি। শোধবোধ হয়ে গেল। এবার দুবস্তিতে আবার পিরিত হতে পারে না? বেশ হয় তা হলে। তোদের হুই ঝরনার জলে। চান করতে যেতে আমার এত ভালো লাগে!
পিরীত হলে তো ভালোই হয়। কিন্তু ঠাকুরদার খুনের শোধ আর নিতে পারলাম কই? খোনকের মুণ্ডুটা তো আর কেটে নিয়ে যেতে পারিনি। অথচ তোরা আমার ঠাকুরদার মাথাটা। কেটে এনেছিলি সেদিন। সেঙাইর চোখের দৃষ্টি হিংস্র হয়ে ওঠে। সারা মুখে চাপ চাপ, শুকনো । রক্ত। এই মুহূর্তে অত্যন্ত বীভৎস দেখাচ্ছে তাকে।
ধূসর অতীতের স্মৃতি নিয়ে দু’টি পাহাড়ী যৌবন কখনও কোমল, কখনও ভয়াল, কখনও স্বপ্নাতুর, কখনও আবার নির্মম হয়ে উঠতে লাগল।
আবোল তাবোল কথার তুফান উঠল এক সময়। কোনো পারস্পর্য নেই, সঙ্গতি নেই, সুষ্ঠু ধারাবাহিকতা নেই কথাগুলোর মধ্যে। এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চকিতে সরে সরে আসতে লাগল সেঙাই আর মেহেলী।
বাইরে মোষ বলির বাজনা উদ্দাম হয়ে উঠেছে। দ্রাম-ম-ম-ম–দ্রাম-ম-ম-ম। চরম মুহূর্ত বোধ হয় উপস্থিত। বিশাল একটা কালো জানোয়ারের দেহ থেকে মাথাটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। টকটকে তাজা রক্তে লাল হয়ে উঠবে পাহাড়ী গ্রামের মাটি।
মেহেলী বলল, আমাদের এই সালুয়ালাঙ বস্তিতে কেন এসেছিলি, বললি না তো সেঙাই?
তোর খোঁজে। আমাদের ঝরনায় আজকাল আর যাস না কেন? সোজাসুজি তাকাল সেঙাই।
সদ্দার যেতে বারণ করে দিয়েছে।
এই সময় নিচের মাটি থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল, মেহেলী, এই মেহেলী কী করছিস ঘরে?
বাঁশের পাটাতন কাটা দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিল মেহেলী, কী আবার করব! যাচ্ছি রে পলিঙা। একটু দাঁড়া। এখুনি যাচ্ছি।
খাসেম গাছটার এলোমেলো শিকড়গুলির কাছে দাঁড়িয়ে আছে একটি কুমারী মেয়ে–পলিঙা। সে বলল, কাটিরি কেসুঙে মোষ বলি হয়েছে। দেখবি আয়। মাংস আনবি তো?
আনব। মুখখানা ঘরের ভেতর টেনে এনে সেঙাই-এর দিকে তাকাল মেহেলী, এখন যাই। সন্ধের সময় খাবার আর রোহি মধু নিয়ে আসব। তামুনুর কাছ থেকে ওষুধও নিয়ে আসব তোর ঘায়ে লাগিয়ে দেবার জন্যে।
সেঙাই বলল, সন্ধের পর আমি চলে যাব। অন্ধকার না নামা পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে। তোদের বস্তির লোকেদের কাছে আমার কথা বলিস না মেহেলী। কাতর আর্তি ফুটল সেঙাই এর গলায়।
অত সহজে যেতে পারবি না এই বস্তি থেকে। হুই খাদ থেকে পিঠে করে বয়ে এনেছি, সারা রাত তুলো গরম করে সেঁক দিয়ে তোকে বাঁচিয়েছি, সে কি এমনি এমনি? যতদিন আমার খুশি, যতদিন আমার আশা না মিটবে ততদিন এই ঘরে আটকে থাকতে হবে তোকে। দাদাকে সাবাড় করেছিস, তার বদলে একটু একটু করে তোকে খুন করব আমি। সারা জীবন তোকে এই ঘরে আটকে রাখব। পাহাড়ী মেয়ে মেহেলী অপরূপ রহস্যময়ী হয়ে উঠল। আউ পাখির মতো একবার ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল সে। তারপর বাঁশের সিঁড়িটার দিকে পা পাড়িয়ে দিল। নিচে তারই জন্য অপেক্ষা করছে পলিঙা।
কাটিরি কেসুঙে মোষের মাংস আনতে যাবে তারা।
.
১৩.
কাল রাত্তিরে টিজু নদীর কিনারায় অনেকক্ষণ বসে ছিল ওঙলেরা। আকাশের এক কোণে আনিজা উইখু (ছায়াপথ) বিবর্ণ রেখায় ফুটে ছিল। এলোমলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল কয়েকটা নিস্তেজ তারা। আর টিজু নদীর পারে ওঙলেদের পাশে নিবিড় বনের মধ্যে গোটাকয়েক মশাল দপদপ করে জ্বলছিল।
একসময় ওঙলে বলেছিল, কী করা যায় বল দিকি? হুই দিক থেকে তো কোনো আওয়াজ পাচ্ছি না।
হু-হু, তাই তো৷ সবাই মাথা নেড়েছে।
সেঙাই হুই দিকেই যে গিয়েছে, তারই বা ঠিক কী। ওঙলে ফের বলেছিল।
হু-হু, অন্য কোথায় যে যায়নি, তাই বা কে বলবে। দু-একজন ওঙলের কথায় সায় দিয়েছিল।
পিঙলেই কিন্তু জোর দিয়ে বলেছিল, নির্ঘাত হুই দিকেই গিয়েছে। সেঙাই সেই যে মেহেলীর কথা বলত, মনে আছে তোদের? মেহেলী সালুয়ালাঙ বস্তির মেয়ে। তার তল্লাশেই হুই বস্তিতে গিয়েছে সেঙাই। হু-হু।
হু-হু, ওকে খুব পিরিত করে সেঙাই। মেহেলী হল তার পিরিতের মাগী। এবার সরব হয়ে উঠেছিল আর-একটি জোয়ান ছেলে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। পেন্যু কাঠের মশাল একটানা অন্ধকার আর হিমের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছিল। জা কুলি মাসের রাত্রি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। হিমের দাঁত কেটে বসেছে অনাবৃত দেহগুলোর ওপর। মশালের অগ্নিবিন্দুর চারপাশে সাদা ঘন কুয়াশা ঘনতর হয়েছে।
