মেহেলী বলল, কি রে, উঠে পড়েছিস দেখছি–
সেঙ্গাইর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দপ করে চোখ জ্বলে উঠল মেহেলীর। সাঁ করে ঘরের এক কোণ থেকে লোহার একটা মেরিকেতসু তুলে এনে তাক করল সে।
মাথার ওপর উদ্যত মেরিকেতসু। আর পাহাড়ী মেয়ের দুচোখে নিষ্ঠুর ঝিলিক। অসহায় করুণ হয়ে এল সেঙাই-এর দৃষ্টি। আর্ত গলায় সে বলল, আমাকে মারিস না মেহেলী, কাল রাত্তিরে খাদে পড়ে গিয়েছিলাম। এই দ্যাখ, মাথা-হাত-পা কেটে ফালা ফালা হয়ে গেছে।
উবু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মেহেলী। এবার লোহার মেরিকেতসুটা বাঁশের পাটাতনের ওপর নামিয়ে সেঙাই-এর পাশে এসে বসল।
সেঙাই-এর দৃষ্টি থেকে তখনও ভয় আর চমক একেবারে মুছে যায়নি। ফিসফিস গলায় সে বলল, তুই এখানে কী করে এলি মেহেলী!
বাঃ, বেশ বললি তো! আমাদের বস্তিতে আমি থাকব না? হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠল মেহেলী।
আমি এখানে এলাম কী করে?
আমার পিঠে চেপে। খাদের বন থেকে আমি তুলে নিয়ে এসেছি তোকে।
কৃতজ্ঞতায় চোখ দুটো কোমল হয়ে এল সেঙাই-এর। গলাটা কেমন যেন মধুর শোনাচ্ছে তার, তুই না তুলে আনলে আমি মরেই যেতাম মেহেলী। তুই আমাকে বাঁচিয়েছিস। সেঙাই এর দৃষ্টিটা মেহেলীর মুখের ওপর এখনও নিষ্পলক হয়ে রয়েছে।
হাসির প্রপাত এবার উদ্দাম হয়ে উঠল মেহেলীর, বাঁচাবার জন্যে তোকে তুলে আনিনি সেঙাই। ভালো করে মারার জন্যে এনেছি। তুই আমার দাদাকে মেরেছিস। তার শোধ তুলব না? সন্ধের সময় মোরাঙের সামনে তোকে বলি দেওয়া হবে। এখুনি গিয়ে জোয়ান ছেলেদের ডেকে আনছি।
মেহেলী! প্রায় আর্তনাদ করে উঠল সেঙাই।
কী বলছিস? মেহেলীর চোখ কুঁচকে গেল।
সেদিন আমাদের বস্তিতে তুই গিয়েছিলি। আমিও তোকে মারতে পারতাম। কিন্তু মারিনি। আজ আমাকে বাঁচা তুই। কেলুরি গ্রামের পাহাড়ী যৌবনকে বড় অসহায় দেখাচ্ছে এই মুহূর্তে। সেঙাই-এর করুণ অবস্থাটা একটু একটু করে উপভোগ করতে লাগল মেহেলী।
তুই আমার দাদাকে মেরেছিস। তার কী হবে?
তোর দাদা কে? চমকে উঠল সেঙাই।
খোনকে। খোনকেকে ওরা কাল খাদে ফেলে দিয়েছিল আনিজার ভয়ে। দাদাকে খুঁজতে খাদে নেমেছিলাম। অন্ধকারে ভুল হল; দাদার বদলে আমার পিঠে চড়ে তুই এলি। একটু থামল মেহেলী, তারপর বলল, আজ সারা সকাল দাদাকে কত খুঁজে এলাম। খাদের কোথাও তাকে পেলাম না। হয়তো বাঘেরা তাকে খেয়ে ফেলেছে।
মেহেলীর সমস্ত মুখখানা বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। দু’টি কপিশ চোখে কয়েক বিন্দু লবণাক্ত জলের আভাসও ফুটে বেরুল। মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত। তারপরেই সে গর্জে উঠল, তুই এই বস্তিতে এসেছিলি কী করতে? মরতে? জানিস সবাই জেনে গেছে, তুই আমার দাদাকে মেরেছিস। আমাদের বস্তির ছোকরারা তোকে পেলে একেবারে কিমা বানিয়ে ছাড়বে।
কে বলেছে আমি খোকেকে মেরেছি? কাঁপা গলায় জিগ্যেস করল সেঙাই। সালুনারু, তোদের বস্তির রেঙকিলানের বউ। সে সব বলে দিয়েছে আমাদের সদ্দারকে। দুর্বল স্মৃতির ওপর কালকের সন্ধ্যাটা ফুটে উঠল সেঙাইর। পাহাড়ের একটা ভাজ থেকে সে দেখেছিল সালুনারুকে। একটা মশাল নিয়ে সে অনেক দূরের কেসুঙগুলোর আড়ালে অদৃশ্য। হয়ে গিয়েছিল।
শিথিল গলায় সেঙাই বলল, সালুনারু তা হলে তোদের বস্তিতে এসে আস্তানা গেড়েছে। আমাদের বস্তি থেকে পালিয়ে এসেছে টেফঙের বাচ্চাটা। সদ্দার ওকে পেলে বর্শা দিয়ে ফুড়ে ফেলবে একেবারে। জানিস, কত বড় শয়তানী হুই সালুনারু!
কী করেছে সালুনারু?
যেদিন তোর দাদা খোনকেকে আমি বর্শা দিয়ে ফুঁড়েছিলুম সেদিন রাত্তিরে রেঙকিলান তো রেজু আনিজার রাগে পাহাড় থেকে পড়ে মরল। এক তাজ্জবের ব্যাপার সেটা। আমি, রেঙকিলান, ওঙলে আর পিঙলেই বস্তিতে ফিরে যাচ্ছি। আচমকা সালুনারুর মতো গলায় কে যেন ডাকল। আর তাই শুনে রেঙকিলান বাইরের পাহাড়ের দিকে চলে গেল।
তারপর? মেহেলীর চোখেমুখে কৌতূহল।
সকালবেলা সালুনারু এল রেঙকিলানের খোঁজে। সে নাকি আগের রাত্তিরে রেঙকিলানকে ডাকেনি বাইরের পাহাড় থেকে। বস্তির জোয়ানরা সকলে মিলে সদ্দারের সঙ্গে খুঁজতে বেরুলাম। তারপর দক্ষিণ পাহাড়ের খাদে নেমে দেখলাম, রেঙকিলান মরে পড়ে রয়েছে।
তারপর কী হল?
কী আবার হবে। আমাদের সর্দারের সঙ্গে ঝগড়া করলে সালুনারু, রেজু আনিজাকে গালাগালি দিলে। তখন সদ্দার যেই বর্শা দিয়ে খুঁড়তে উঠল, সে বনের মধ্যে পালিয়ে গেল।
কী সর্বনাশ! রেজু আনিজাকে গালাগালি দিল সালুনারু! বিস্ময়ে, আতঙ্কে শিউরে উঠল মেহেলী।
দূরের কোনো একটা কেসুঙ থেকে মোষ বলির সেই বাজনাটা ভেসে আসছে। গম্ভীর আর ভয়ঙ্কর শব্দ তরঙ্গিত হয়ে যাচ্ছে এই নগণ্য জনপদটার ওপর দিয়ে।
ওপরে আতামারী পাতার চাল। তার ফাঁক দিয়ে দুপুরের রোদ এসে পড়েছে ঘরখানায়। ঝলমলে রোদ। জা কুলি মাসের সূর্য বড় আরামদায়ক, বড় মনোরম।
হঠাৎ গাছের ওপরে আদিম এই গৃহকোণ নিঝুম হয়ে গেল। এখন আর কেউ কথা বলছে না। সেঙাই তাকাল মেহেলীর দিকে, মেহেলী তারই দিকে অপলক তাকিয়ে রয়েছে। সেঙাই আর মেহেলী। টিজু নদীর এপার আর ওপার। পোকরি আর জোহেরি বংশের দুই বন্য যৌবন। মুখোমুখি হয়েছে। সালুয়ালাঙ আর কেলুরি গ্রামের দুই শত্রুপক্ষ দুজনের সারা দেহে সংকেতময় কোনো আরণ্যক ভাষা সন্ধান করে বেড়াচ্ছে।
মেহেলী একসময় বলল, কাল সারারাত তোর পাশে আমি শুয়ে ছিলাম সেঙাই। আঁচড়েছি, কামড়েছি, তবু তোর সাড়া পাইনি।
