একসময় নিজের দিকে তাকাল সেঙাই। সারা দেহে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। থকথকে রক্ত হিমে জমে যাবার কারণে কালো হয়ে গিয়েছে। কপাল গলা বুক–দেহের প্রতিটি অংশে ফালা ফালা আঘাতের দাগ। কোথাও বা নখ আর দাঁতের অগভীর ক্ষত।
নিজের শরীরের এই বীভৎস আঘাতগুলোর কথা ভাবছে না সেঙাই। তার চেতনার মধ্যে চমক দিয়ে যাচ্ছে কালকের হিমাক্ত রাতটা। অস্পষ্ট কতকগুলি দৃশ্য। সেগুলোর ধারাবাহিকতা নেই, অসংলগ্ন সেই সব দৃশ্যের মিছিল সেঙাই-এর স্নায়ুর ওপর দোল খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে।
সালুয়া গ্রাম। সেখানকার মোরাঙ। খোনকের বুকের ক্ষতমুখে মেটে রঙের হৃৎপিণ্ড। তামুন্য। সালুয়ালা গ্রামের সর্দার। মোরাঙের দরজায় মশাল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল মেহেলী। একসময় খোনকেকে খাদে ফেলতে এসেছিল এই গ্রামের কয়েকটি জোয়ান ছেলে। তার আগেই খানিকটা নিচের দিকে নেমে একটা বিশাল পাথরের চাই ধরে আশ্রয় নিয়েছিল সেঙাই। তারপর হিম আর হিম। আশুমি সাপের বিষের মতো জা কুলি রাত্রির হিম তার দেহটাকে জর্জরিত করে দিয়েছিল। অবশ হয়ে গিয়েছিল চেতনাটা। একসময় খোনকেকে খাদে ফেলে গিয়েছিল জোয়ান ছেলেরা। খাড়াই পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে, নিবিড় বনের ফাঁক দিয়ে, গুম গুম শব্দ করতে করতে নেমে গিয়েছিল খোনকের দেহ। তারপরেই আশ্চর্য হিমে হাতের থাবা শিথিল হয়ে গিয়েছিল সেঙাই-এর। অস্পষ্ট চেতনার মধ্যে বুঝতে পারছিল, শূন্যে পাক খেতে খেতে সে নেমে যাচ্ছে। তারপর আর কিছু মনে নেই।
কিন্তু এই মুহূর্তে সেঙাই-এর দুর্বল স্মৃতি কিছুতেই ধরতে পারছে না, কেমন করে এই অচেনা ঘরের মধ্যে সে চলে এল? কে তাকে এই নিঃসঙ্গ বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গিয়েছে?
হঠাৎ বাঁ দিকে তাকাল সেঙাই। একটা কাঠের পাত্রে একপিণ্ড ভাত, খানিকটা ঝলসানো মাংস আর বাঁশের পানপাত্রে রোহি মধু রয়েছে। তার চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠল। মনে পড়ল, কাল দুপুরের পর এক কণা ভাতও পেটে পড়েনি। আর কিছু ভাবার সময় নেই। পেটের মধ্যে খিদের ময়াল এতক্ষণ পাক দিচ্ছিল। অসীম অবসাদের জন্য খিদের বোধটা কেমন যেন ভোতা হয়ে ছিল। এই মুহূর্তে ভাতের পাত্রটা দেখবার সঙ্গে সঙ্গে পেটের সেই ময়ালটা দাপাদাপি শুরু করে দিল।
বুক হিঁচড়ে হিঁচড়ে পাত্রটার কাছে এগিয়ে এল সেঙাই। ভাতের দলার ওপর অনেকগুলো পাহাড়ী পিঁপড়ে জমা হয়েছে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তার। ব্যগ্র একখানা থাবা পাত্রটার দিকে বাড়িয়ে দিল সে। বড় বড় গ্রাসে ভাত আর মাংস শেষ করে ফেলল। একপাশে বাঁশের পানপাত্রটা পড়ে ছিল, সেটা তুলে এক চুমুকে শূন্য করে দিল সেঙাই।
এখন অবসাদ অনেকটা কেটে গিয়েছে ইন্দ্রিয়গুলো থেকে। বেশ সুস্থ মনে হচ্ছে নিজেকে। ভাত, মাংস আর রোহি মধু খাওয়ার পর শরীরটা রীতিমতো চাঙ্গা হয়ে উঠল সেঙাই-এর। এতক্ষণ শুয়ে শুয়ে খাচ্ছিল, এবার বাঁশের পাটাতনের ওপর উঠে বসল।
খানিকটা সময় কেটে গেল। তারপর নিচের দরজার কাছে এসে মুখখানা বকের মতো বাড়িয়ে দিল সেঙাই। অচেনা গ্রাম। টিলার টিলায়, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে অজানা মানুষের জটলা। যুবতী মেয়েরা সরু বাঁশের ফ্যাফা দিয়ে তুলো পিঁজছে। কেউ কেউ ন দিয়ে দড়ির লেপ বুনছে। আরো দূরে মেয়ে-পুরুষরা একসঙ্গে বেতের ত্রিকোণ আখুতসা (চাল রাখার ঝোড়া) বানাচ্ছে। নারী-পুরুষের যৌথ পরিশ্রমে এই পাহাড়ী গ্রাম দিনের কাজ শুরু দিয়েছে। কেউ কেউ পাথরের ওপর বর্শার ফলা শানিয়ে নিচ্ছে। এখানে প্রতিকূল প্রকৃতি। হিংস্র চিতা কি বুনো মোষ, হিংস্রতর প্রতিবেশী তাদের সঙ্গে বসবাস। অতএব, ধারাল বর্শার চেয়ে গভীর অন্তরঙ্গতা আর কার সঙ্গে সম্ভব? রোদের আলোতে ঝকমক করে উঠছে বর্শার ফলাগুলো।
গাছের ওপর ছোট্ট ঘরখানায় নিশ্চুপ বসে রইল সেঙাই। এখানকার একটি মানুষও তার পরিচিত নয়। এই অজানা গ্রামে এখন নামা নিরাপদ হবে না। ওই বর্শার ফলাগুলো তা হলে চৌফালা করে ফেলবে তাকে। আগে রাত্রি নামুক, তারপর দেখা যাবে। অন্ধকারের আড়াল ছাড়া এখান থেকে পালানো কোনোমতেই সম্ভব নয়। চারপাশে মৃত্যু ওত পেতে রয়েছে। ভাবতেও সেঙাই-এর মেরুদণ্ড বেয়ে হিমধারা নামতে শুরু করল।
বাঁশের মাচানের ওপর ফের শুয়ে পড়ে সেঙাই।
.
অনেকক্ষণ পর দূর থেকে মোষ বলির বাজনা ভেসে আসে। মেথিকেকোয়েনঘা খুলির গম্ভীর শব্দ উপত্যকার ওপর দিয়ে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দ্রাম-ম-ম-ম-ম। সেই সঙ্গে খুঙের ভয়ঙ্কর আওয়াজ। বাজনার শব্দে নেশা ধরে গেল সেঙাই-এর। বন্দি শ্বাপদের মতো গর্জন করে উঠতে চাইল সে। কিন্তু না, অচেনা গ্রামের মানুষগুলো একবার টের পেলে রক্ষে নেই। অতএব, বুকের মধ্যে নিরুপায় গর্জনটাকে স্তব্ধ করে দিতে হল।
এখন দুপুর। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘরের মধ্যে আটকে থাকতে হবে তাকে। অসহায় আক্রোশে ফুলতে লাগল সেঙাই।
আচমকা বাঁশের সিঁড়িতে শব্দ হল। আর সেই শব্দটা এই ঘরের দিকে উঠে আসছে। চমকে উঠল সেঙাই, তারপর দ্রুত নিচের ফোকরটার কাছে চলে এল।
বাঁশের সিঁড়িটা সরাসরি পাটাতন ছুঁড়ে ওপরে উঠে এসেছে। সেটা বেয়ে বেয়ে ঘরের মধ্যে চলে এল মেহেলী।
পায়ের শব্দে চমকে উঠেছিল সেঙাই। মেহেলীকে দেখে অপার বিস্ময়ে চোখ দুটো ভরে গেল তার। নির্নিমেষে তাকিয়ে রইল সে।
