সেদিনের বিকেল ঘিরে তার বন্য কামনার কথা থাক। একটা হিসাব কিছুতেই মিলছে না মেহেলীর। এই অতল খাদের মধ্যে কী করে এসে পড়ল সেঙাই? টিজু নদী ডিঙিয়ে সালুয়ালাঙ গ্রামের খাদে কিসের সন্ধানে এসেছিল সে?
আ-উ-উ-উ–আর্তনাদটা এবার বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
চকিত হয়ে উঠল মেহেলী। হামাগুড়ি দিয়ে রোহি মধু-ভরা একটা বাঁশের পানপাত্র নিয়ে এল। হাতিয়ে হাতিয়ে সেঙাই-এর মুখখানা খুঁজে বার করল। ঠোঁট দুটো দৃঢ়বদ্ধ। ডান হাতের আঙুল দিয়ে সেঙাই-এর মুখটা ফাঁক করে দিল মেহেলী। তারপর বাঁশের পানপাত্র থেকে ফোঁটা ফোঁটা রোহি মধু ঢেলে দিতে লাগল জিভে। প্রথমে চেটে চেটে সেই উষ্ণ পানীয়ের আস্বাদ নিতে লাগল সেঙাই। পরে ঢকঢক করে গিলে পানপাত্রটা শূন্য করে দিল।
মেহেলী ডাকল, এই সেঙাই, এই—
সাড়া নেই। শরীর আবার নিথর হয়ে গিয়েছে। নিরুত্তর পড়ে রইল সেঙাই।
এবার দুহাত দিয়ে আঁকানি দিল মেহেলী। তবু জবাব নেই সেঙাই-এর তরফ থেকে। তেমনই চুপচাপ পড়ে রয়েছে সে।
সমস্ত দেহের রক্তকণাগুলো সরীসৃপের মতো কিলবিল করতে শুরু করেছে মেহেলীর। একটি কঠিনপেশী জোয়ান ছেলে, এই শীতের রাত্রি, সেই জোয়ান ছেলেটিকে আগুনের তাপে উষ্ণ করে তুলেছে সে, রোহি মধুর মৌতাত দিয়ে তার স্নায়ুগুলোকে উত্তেজিত করে তুলতে চেয়েছে। কিন্তু এ কী হল? সেঙাই-এর হিমার্ত দেহের শুশ্রূষা করতে করতে এক বিচিত্র সম্ভাবনা শিরায় শিরায় বিদ্যুতের মতো খেলে গিয়েছে তার। এই কুমারীগৃহ দু’টি পাহাড়ী যৌবনকে নিয়ে সার্থক হয়ে উঠতে পারে। এই নিঃসঙ্গতা মনোরম হয়ে উঠতে পারে। মেহেলী ভুলে গিয়েছে খোকের কথা। তার রক্তে রক্তে আদিম অরণ্য ডাক দিয়েছে।
খ্যাপা বাঘিনীর মতো সেঙাই-এর পাশে বসে ফুলতে লাগল মেহেলী। এই শীতের হিমে আচমকাই যদি শত্রুপক্ষের পুরুষ তার কাছে এসে পড়েছে, কেন সে তার কুমারী জীবনের বাসনাকে অতৃপ্ত রেখে দেবে? বুকের ভেতর মেহেলীর ফুসফুসটা ফুঁসে ফুঁসে উঠছে। প্রচণ্ড উত্তেজনায় কেঁপে উঠছে সারা দেহ।
আচমকা সেঙাই-এর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মেহেলী। দু’টি হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল তার দেহটা। মেহেলীর ধারাল নখ কেটে কেটে বসে গেল সেঙাই-এর বুকে পিঠে গলায় ঘাড়ে।
ময়াল সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে কয়েকটা উত্তপ্ত নিশ্বাস পড়ল সেঙাই-এর বুকে। মেহেলী চাপা গলায় গর্জন করে উঠল, এই সেঙাই, এই
নিথর পড়ে রয়েছে সেঙাই। একবার শুধু অপরিসীম ক্লান্ত গলায় আর্তনাদ করে উঠল সে, আ-উ-উ-উ–
হিস হিস করে উঠল মেহেলী, আমি তোকে খাদ থেকে তুলে আনলাম। আর আমার কথাটা শুনতে পাচ্ছিস না শয়তানের বাচ্চা!
মেহেলীর আলিঙ্গন তীব্র হল, তারপর তীব্রতর। তার শাণিত নখ আর দাঁতগুলো ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল সেঙাই-এর দেহ।
আ-উ-উ-উ–
সমস্ত শরীর শিথিল হয়ে গিয়েছে সেঙাই-এর। পাহাড়ী যুবতী মেহেলী তার দেহের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে, তার মনের সমস্ত কামনার আগুন দিয়ে, তার বন্য উত্তেজনা দিয়ে আর ধারাল নখ-দাঁতের আঘাত দিয়েও সেঙাইকে মাতিয়ে তুলতে পারল না।
জা কুলি মাসের একটা উত্তেজক রাত মেহেলীর কাছে ব্যর্থ হয়ে গেল। একসময় পাহাড়ের ওপর আলোর অস্পষ্ট আভাস দেখা দিল। ঘন কুয়াশা ভেদ করে সেই আলো এসে পড়েছে খাসেম গাছের এই ছোট্ট ঘরখানায়।
সেঙাই-এর বুকের পাশে সারা রাত শুয়ে ছিল মেহেলী। এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলল। প্রথম ভোরের এই অস্পষ্ট আলোতে সেঙাই-এর দিকে তাকিয়ে একটা তীব্র চমক খেলে গেল তার চেতনায়। কী ভয়ানক, কী বীভৎস দেখাচ্ছে সেঙাইকে।
একটু পর আস্তে আস্তে বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেম গেল মেহেলী।
.
১২.
দক্ষিণ পাহাড় থেকে এখন কুয়াশা সরে গিয়েছে। উত্তর পাহাড়ের ঘন সবুজ উপত্যকা রোদের আলোতে ঝলমল করছে। কাল রাতে আকাশ থেকে যে অজস্র তুষারকণা ঝরেছিল, সূর্যের উত্তাপে টলটলে জলবিন্দু হয়ে ঘাস বা গাছের পাতায় সেগুলো ঝলমল করছে।
এদিকে পাহাড়ের চড়াইতে এই ছোট্ট পাহাড়ী গ্রাম সালুয়ালাঙ জেগে উঠেছে। কেসুঙে কেসুঙে নানা মানুষের চেঁচামেচিতে, আউ পাখির চিৎকারে, কুকুর আর মোরগগুলোর অবিশ্রান্ত ডাকাডাকিতে উদ্দাম পাহাড়ী জীবনের পরিচয়।
খাসেম গাছের মগডালে একটি নিঃসঙ্গ কুমারী মেয়ের বিছানা। তার ওপর একটু একটু করে চোখ মেলল সেঙাই। পিঙ্গল চোখ এখন লাল। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারছে না সে। অপরিসীম ক্লান্তিতে চোখ দুটো আপনা থেকেই বুজে আসছে। প্রচণ্ড নেশার পর পেশীগুলো যেমন শিথিল হয়ে আসে, ঠিক তেমনই এক অবসাদে দেহের গ্রন্থিগুলো যেন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে।
কিছুক্ষণ নির্জীবের মতো পড়ে রইল সেঙাই। তারপর আবার চোখ মেলল। চোখ মেলল, কিন্তু কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছে না। তার দৃষ্টির সামনে চারিদিক ঝাপসা ঝাপসা। উপত্যকায় ওই রোদের রং, দক্ষিণ পাহাড়ের সারা গায়ে ওই নিবিড় বন-সব এক তরল ছায়ালোকের আড়ালে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। মাথার রগগুলো ঝনঝন করে ছিঁড়ে পড়ছে সেঙাইর, মজ্জায় মজ্জায় তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা চমক দিয়ে যাচ্ছে।
আরো অনেকটা সময় পার হয়ে গেল।
এবার চারিদিকে একবার চোখ দুটো ঘুরিয়ে আনল সেঙাই। মাটি থেকে অনেক উঁচুতে এই ঘর। নিচে বাঁশের পাটাতন, একপাশে গোটা কয়েক রোহি মধু-ভরা বাঁশের পাত্র, স্থূপাকার কার্পাস তুলোর পাঁজ, হরিণ আর মোষের কঁচা ছাল থেকে উগ্র দুর্গন্ধ–এ ছাড়া ঘরের মধ্যে আর কিছু নেই। অন্য কাউকেও এখানে দেখা যাচ্ছে না।
