ধীরে ধীরে মাচানে মানুষটিকে শুইয়ে দিল মেহেলী। তারপর একটা হরিণের ছাল নিজের সারা গায়ে জড়িয়ে মানুষটির দিকে ঝুঁকে পড়ল। পাতার চাল, চারপাশে বাঁশের বেড়া আর সমস্ত দেহে হরিণের ছাল জড়ানো। সব মিলিয়ে একটা উষ্ণ আরামদায়ক পরিমণ্ডল।
মেহেলী ডাকল, দাদা, এই দাদা–
নিরুত্তর পড়ে রইল মানুষটি। একটু চুপ করে রইল মেহেলী, তারপর একখানা হাত সেই লোকটার ঠাণ্ডা শরীরে বিছিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর একটু একটু কঁকানি দিতে লাগল সে। নাঃ, জীবনের কোনো লক্ষণ, চেতনার কোনো আভাসই নেই সেই দেহে। অনেকক্ষণ আগে খোকেকে সেই খাদের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল মোরাঙের জোয়ানেরা! জা কুলি রাতের হিমে হিমে একেবারে জমাট বরফ হয়ে গিয়েছে তার দেহ। মানুষটির নাকের কাছে হাত রাখল। মেহেলী। অনেকটা পর পর গরম নিশ্বাসের ক্ষীণ এক একটা ধারা তিরতিরিয়ে পড়ছে হাতের ওপর। এই শ্বাসপতন বুঝিয়ে দিচ্ছে খোনকে বেঁচে আছে। নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। সর্বাঙ্গে ঢেউ খেলে গেল মেহেলীর। তার এই দুঃসাহস, আনিজার বিরুদ্ধে এই সক্রিয় প্রতিবাদ তবে ব্যর্থ হয়নি।
ঘরের এক কোণে মাটির পাত্রে একরাশ নিভু নিভু আগুন রয়েছে। হামাগুড়ি দিয়ে পাত্রটার কাছে চলে এল মেহেলী। ওটার ঠিক পাশেই অনেকগুলো বাঁশের চোঙা, রোহি মধুতে কানায় কানায় পূর্ণ। একটা পানপাত্র তুলে ঢকঢক করে আকণ্ঠ গিলে নিল মেহেলী। শরীরটা এবার বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। শীতার্ত ইন্দ্রিয়গুলো সক্রিয় হচ্ছে তার। এখন হিমঝরানো জা কুলির রাতটার সঙ্গে অনেকক্ষণ লড়াই করতে পারবে মেহেলী।
বাঁশের পাটাতন থেকে আগুনের আধারটা তুলে নিল সে। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে আবার সেই মানুষটির কাছে চলে এল। আগুন নিভে এসেছিল, জোরে জোরে কয়েকটা ফুঁ দিল মেহেলী। ওপরের সাদা রঙের ছাই সরে গিয়ে আগুনটা বেরিয়ে এল।
পাটাতনের একপাশে একপিণ্ড কার্পাস তুলো পড়ে ছিল। সেটা তুলে আগুনের পাত্রটার ওপর মেলে ধরল মেহেলী। পরম মমতায় গরম তুলো দিয়ে সেঁক দিতে শুরু করল সে। বার বার। অচেতন দেহে একটু একটু করে প্রাণের সাড়া জাগল যেন, তারপর থরথর করে কেঁপে উঠল সেটা।
হঠাৎই ঘটে গেল ঘটনাটা। সেঁক দিতে দিতে মেহেলীর হাতখানা মানুষটার বুকের কাছে চলে এসেছিল। কিন্তু হাতড়ে হাতড়ে সেই বুকের কোথাও বিশাল ক্ষত খুঁজে পেল না মেহেলী। তবে, তবে এ কে? এ দেহ কার? খাদের অতল অরণ্য থেকে জা কুলি মাসের এই হিমাক্ত। রাত্রিতে কার দেহ বয়ে এনেছে মেহেলী? এ তো খোনকে নয়!
আনিজা! আনিজা! খাসেম গাছের মগডালে কুমারী মেয়ের এই ছোট্ট শোওয়ার ঘর। এই ঘরে কি খোনকের বদলে কোনো প্রেতাত্মার দেহ তুলে আনল মেহেলী? আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠতে চাইল সে, কিন্তু থাবা দিয়ে কে যেন কণ্ঠনলী চেপে ধরেছে। একটা শব্দও বেরিয়ে এল না তার গলা থেকে। অপরিসীম আতঙ্কে একেবারে পাথর হয়ে গিয়েছে যেন মেহেলীর সারাটা দেহ।
প্রচণ্ড আতঙ্ক খেলে গেল দেহমনে। গাছের ওপর এই শূন্যের আশ্রয় থেকে মেহেলী পালিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু প্রাণান্ত চেষ্টাতেও বাঁশের সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে দেবার সামর্থ্যটুকুও সে হারিয়ে ফেলেছে। নিপ্রাণের মতো বসেই রইল মেহেলী।
জমাট অন্ধকার। একসময় সামনের নিঃসাড় দেহটা থেকে একটা অস্ফুট কাতরোক্তি শুনতে পেল মেহেলী, আ-উ-উ-উ–
নাঃ, আনিজা নয়। একটি জীবন্ত মানুষ রয়েছে এই ছোট্ট ঘরখানার মধ্যে। খানিকটা সাহস ফিরে এল মেহেলীর স্নায়ুগুলোতে। সাহস নয়, দুঃসাহস। আগুনের পাত্রটা মানুষটির মুখের
কাছে নিয়ে এল মেহেলী। এক অদম্য কৌতূহলে তার নিশ্বাস দ্রুততর হয়ে উঠেছে।
অগ্নিপাত্রটার ওপর ঝুঁকে বারকয়েক জোরে জোরে ফুঁ দিল মেহেলী। আর সেই রক্তাভ আগুনের আভায় মানুষটির মুখখানা দেখে চমকে উঠল সে। খোনকে নয়, এ তো টিজু নদীর ওপারের কেলুরি গ্রামের ছেলে সেঙাই। তাদের শত্রুপক্ষ। বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে রইল মেহেলী। তবে তো খাদের গভীর পাতাল থেকে শত্রুপক্ষের ছেলেকে পিঠের ওপর তুলে নিয়ে এসেছে সে! তারপর পরম মমতায় নিজের বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে।
আ-উ-উ-উ– এবার দেহটা নড়তে শুরু করেছে। আর মাঝে মাঝে অস্পষ্ট গলায়। আর্তনাদ করে উঠছে সেঙাই।
সেঙাই! তাদের শত্রুপক্ষের ছেলে। কয়েক দিন আগের একটা মোহময় বিকেল চেতনার মধ্যে দোল খেয়ে উঠল যেন মেহেলীর। সেদিন জোহেরি বংশের দুর্দান্ত যৌবনের মুখোমুখি হয়েছিল সে। একটা বর্শার ফলা তার দিকে তুলে ধরেছিল সেঙাই।
আশ্চর্য! রোজ টিজু নদী ডিঙিয়ে কী এক অদম্য আকর্ষণে ওপারের সেই নিঃশব্দ ঝরনাটার পাশে চলে যেত মেহেলী। টানডো পাখির মতো জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে স্নান করতে বড় ভালো লাগত। বিচিত্র যোগাযোগ। সেই ঝরনার পাশেই দেখা হয়েছিল সেঙাইর সঙ্গে। বর্শা তুলে ধরেছিল বটে, কিন্তু সামান্য একটু আত্মসমর্পণ করতে আর তাকে ঘা দেয়নি শত্রুপক্ষের ছেলে। পাহাড়ী জোয়ানের পিঙ্গল দু’টি চোখে বিচিত্র এক ভাষা দেখে তার যৌবন ঝঙ্কার দিয়ে উঠেছিল। সোনালি বুক, নিটাল দেহ, মসৃণ শরীর। বুকের ভেতর শিহরন খেলে গিয়েছিল তার। পাহাড়ী কুমারীর যৌবন জলপ্রপাতের মতো উদ্দাম। সেদিন সেঙাই-এর বর্শার নিচেই নিজেকে সমর্পণ করেনি মেহেলী, ভেবেছিল নিবিড় আলিঙ্গনে জোহেরি বংশের এক খ্যাপা যৌবন যদি তাকে পিষে ফেলত, তা হলে হয়তো সে চরিতার্থ হতে পারত। তার নিজেকে সমর্পণ সার্থক হয়ে উঠত। কিন্তু সেদিন সেঙাই তাকে ছুঁয়েও দেখেনি, নিঃশব্দে চলে গিয়েছিল। তারপর আরো কদিন ঝরনার ধারে সেঙাই-এর খোঁজে গিয়েছে মেহেলী। কিন্তু শত্রুপক্ষের যুবকটিকে আর দেখা যায়নি।
