প্রায় নিরেট অন্ধকার। ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে যে রক্তাভ আলো রয়েছে তার রেশ এতদূর এসে পৌঁছুতে পারেনি। আন্দাজে আন্দাজে, হাতড়ে হাতড়ে শেষ পর্যন্ত সেই নরদেহটির কাছে উঠে এল মেহেলী। এমনকি তার হাতখানা পর্যন্ত ছুঁতে পারা যাচ্ছে। বিশাল গাছ বেয়ে এই। মগডালে উঠতে হাঁপ ধরে গিয়েছিল মেহেলীর। দ্রুত তালে কয়েকটা নিশ্বাস পড়ল ঘন ঘন। ফুসফুস ভরে বারকয়েক বাতাস টেনে নেবার পর নিজের শরীর থেকে দড়ির লেপখানা খুলে ফেলল মেহেলী। তারপর অসাড় নরদেহটির আগাগোড়া নিবিড় করে জড়িয়ে দিল।
অনাবৃত দেহ। শীতের রাত চারিদিক থেকে নির্মমভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেহেলীর ওপর। মনে হল, দাঁতে দাঁতে, নখে নখে এই হিমঝরা রাত্রি ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ফেলবে তাকে। আর অপেক্ষা করা চলবে না। প্রতিটি মুহূর্তে এই রাত তাকে একটু একটু করে গ্রাস করছে।
গাছের মাথা থেকে সেই নিশ্চেতন নরদেহটিকে পিঠের ওপর তুলে নিল মেহেলী। ভারী সবল দেহ। মেরুদণ্ডটা বেঁকে যাবার উপক্রম হল তার। দড়ির লেপের দু’টি প্রান্ত দিয়ে নিজের পেটের সঙ্গে নরদেহটিকে বেঁধে নিল মেহেলী। পাহাড়কন্যা সে। পাথরের মতো কঠিন তার দেহের পেশী। ধীরে ধীরে সতর্কভাবে পা ফেলে ফেলে সরু ডাল থেকে মোটা শাখায়, তারপর বিশাল গুঁড়ি বেয়ে বেয়ে নামতে লাগল মেহেলী।
নিচে নেমে মানুষটাকে নামিয়ে বারকয়েক জোরে জোরে শ্বাস টানল সে। তারপর ঠাণ্ডা নরদেহটিকে আবার পিঠের ওপর তুলে নিল। এবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বেয়ে খাড়া চড়াইর দিকে উঠতে লাগল সে। পিঠের ওপর অচেতন মানুষটির দেহভারে ধনুকের মতো বেঁকে গিয়েছে মেহেলী। মেরুদণ্ডটা টনটন করছে, যেন দেহ থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাবে সেটা। দুহাত দিয়ে সামনের লতাপাতার বাধা সরিয়ে এগুতে লাগল মেহেলী।
হঠাৎ ডান পাখানা পিছলে গেল মেহেলীর। ছিটকে একটা পাহাড়ী গর্তের মধ্যে পড়ে গেল সে। কোমরের ওপর প্রচণ্ড চোট লেগেছে। মনে হচ্ছে, শরীরের নিচের দিকটা ছিঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। জা কুলি রাত্রির এই চোটের কারণে মজ্জায় মজ্জায় তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা চমক দিয়ে যাচ্ছে তার। তীব্র গলায় আর্তনাদ করে উঠল মেহেলী, আ-উ-উ-উ–
কয়েক মুহূর্ত পর আবার খাড়া হয়ে উঠল মেহেলী। ইতিমধ্যে নরদেহটিকে পিঠ থেকে কাঁধের ওপর তুলে নিয়েছে সে।
নিস্তব্ধ আর নির্জন চড়াই। কাঁধে একটি অচেতন মনুষ্যদেহ ছাড়া আর কোথাও কোনো প্রাণের সাড়া নেই। এই মুহূর্তে কোনো হিংসে শ্বাপদের চোখে খানিকটা নীল আগুন দেখতে পেলেও আশ্বস্ত হতে পারত মেহেলী। কিন্তু এই ভয়াল শীতের রাতে কোনো আরণ্যক প্রাণীর সান্নিধ্য পাওয়া যাবে না কোথাও।
একসময় খাদের অতল থেকে ওপরে উঠে এল মেহেলী। একবার মোরাঙের পাশে দাঁড়িয়ে চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। নাঃ, ভয়ের কারণ নেই। মোরাঙের জোয়ান ছেলেরা দড়ির লেপের নিচে স্বপ্নের মনোরম জাল বুনে চলেছে এখন। সেই জালের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি মাত্র মুখ। সে মুখ তাদের লগোয়া লেনদের (প্রেমিকাদের) মুখ।
একবার নিচের দিকে তাকাল মেহেলী। তারপর ফিসফিস গলায় ডাকল, লিজোমু, এই লিজোমু–
কোনো উত্তর নেই।
ফের ডাকল মেহেলী, এই লিজোমু–
খাদের ওপরে এই মোরাঙের কিনারে লিজোমু নামে কোনো নারীর গলা থেকে এবারও উত্তর এল না। নিশ্চয়ই সে এই অসহ্য শীতরাত্রির হিম সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে গিয়ে দড়ির লেপের উষ্ণ আরামে এতক্ষণে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়েছে।
আচমকা মোরাঙের মধ্যে মৃদু কলরব শোনা গেল। জেনুর (মধ্যরাত্রি) আগে গ্রামে গ্রামে নাগারা একবার জেগে ওঠে। নাগা পাহাড়ে এ একটা প্রচলিত রীতি।
আর দাঁড়াল না মেহেলী। মোরাঙের কিনার থেকে দ্রুত পাশের টিলার দিকে উঠে গেল সে। এই রাত্রিবেলায় সর্দার তার পিঠে খোনকের দেহটি দেখতে পেলে উপায় থাকবে না। নিদারুণ আতঙ্কে পায়ের পেশীতে পেশীতে দুর্বার বেগ নেমে এল। জা কুলির এই হিমা রাতেও গল গল করে ঘাম ছুটতে শুরু করেছে মেহেলীর।
এক এক করে নগুরি কেসুঙ, কাতারি কেসুঙ, নিপুরি কেসুঙ, পেরিয়ে গ্রামের প্রান্তে চলে এল মেহেলী। চারপাশে ঘন কুয়াশার পর্দা নেমে এসেছে। নানা কেসুঙের ঘরগুলোতে অস্পষ্ট আলো দেখা যায়। মাঝরাতে পাহাড়ী প্রথা অনুযায়ী সমস্ত সালুয়ালাঙ গ্রামখানা ঘুমের অতল স্তর থেকে জেগে উঠেছে। সামান্য কয়েকটি মুহূর্ত। মুঠি মুঠি কাঁচা তামাকপাতা চিবিয়ে কি বাঁশের পানপাত্রে কয়েক চুমুক রোহি মধু খেয়ে স্নায়ুগুলোকে চাঙ্গা করে তুলবে পাহাড়ী মানুষগুলো। তারপর আবার দড়ির লেপের তলায় মসৃণ একখানা ঘুমের মধ্যে ডুবে যাবে।
কখন যে বিশাল খাসেম গাছটার তলায় এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল ছিল না মেহেলীর। এখন আর অস্বস্তি নেই। অন্তত সূর্য ওঠার আগে পর্যন্ত সে নিশ্চিন্ত। সকালের আলোতে পাহাড়ী মানুষগুলির হিংস্র চোখ খুলবার আগেই সে খোনকেকে লুকিয়ে ফেলতে পারবে।
একটু পর বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে গাছের ওপর উঠে এল মেহেলী। কাঁধে সেই আচেতন নরদেহ। গাছের ডালে ছোট্ট একখানি ঘর। বাঁশের দেওয়ালে লতার বাঁধন আর মাথায় আতামারী পাতার চাল। এই ঘরখানা মেহেলীর। রাতে এখানেই তার নিঃসঙ্গ বিছানা পাতা হয়। কুমারী মেয়ের একক শয্যা পুরুষের কামনা থেকে অনেক, অনেক উঁচুতে যেন উঠে এসেছে।
