মেহেলী বলল, দাদা নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। এই বনের মধ্যে একটু একটু করে পচে মরবে সে! তুই কি তাই চাস লিজোমু? দেখি না, যদি বাঁচাতে পারি–
কিন্তু আনিজার রাগ? আর সদ্দার জানতে পারলে–বাকিটুকু আর শেষ করতে পারল না লিজোমু। অজানা আশঙ্কায় গলাটা আপনা থেকেই বুজে এল তার।
যা হবার হবে। আমার অত ভয় নেই। আনিজার রাগ হলেও মরব আর সদ্দার জানতে পারলেও বাঁচব না। তুই ওপরে দাঁড়া লিজোমু। আমি খাদে নামছি।
মশালটা বাঁ হাতের থাবায় চেপে ধরে খাড়াই পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে খাদের দিকে নেমে গেল মেহেলী। আর একটা প্রেমূর্তির মতো মোরাঙের পাশে, তুষারঝরা আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে রইল লিজোমু।
পাহাড়ী অরণ্য। গহন আর নীরন্ধ্র। মশালটা নিয়ে সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে নামছে মেহেলী। গাছের ফাঁক দিয়ে, ঝোঁপের পাশ দিয়ে পথ করে করে এগুতে হচ্ছে। দুটো চোখের দৃষ্টিকে মশালের আলোর চেয়েও তীক্ষ্ণতর করে একটি মানবদেহের সন্ধানে চারিদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফেলছে সে। খোনকের দেহের এতটুকু চিহ্ন কোথাও দেখতে পেলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তারপর দু’টি হাত দিয়ে জাপটে ধরে তুলে নিয়ে আসবে। মেহেলীর স্থির বিশ্বাস, খোনকের দেহটা খাদের অতলে গড়িয়ে যায়নি। এই বনের কোথাও, নিশ্চয়ই কোনো শিকড়ে কি গাছের ডালে, কি ঝোঁপের মাথায় আটকে আছে।
হিমঝরা এই বনের মধ্যে শ্বাপদের চিহ্নমাত্র নেই। গুহার সঙ্কীর্ণ বিস্তারের মধ্যে নিজেদের শরীর গুঁজে দিয়ে একটু উত্তাপ সৃষ্টি করছে তারা। বাঘ, চিতা কি বুনো মোষ জা কুলি মাসের এই প্রখর শীতের দাপটে তাদের সহজ বিচরণের রাজ্য থেকে পালিয়ে গিয়েছে।
জানুর তলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত অনাবৃত। শীতের রাত শরীরের সেই অংশটুকুর ওপর কেটে কেটে বসছে। পা দুটো যেন পক্ষাঘাতের তাড়নায় অসাড় হয়ে আসতে শুরু করেছে মেহেলীর।
সামনের জীবো গাছটাকে কঠিন বাঁধনে জড়িয়ে ধরেছে একটা কালো রঙের লতা। আচমকা মেহেলীর মশাল কেমন করে যেন সেই লতায় গিয়ে লাগল। সাঁ করে লতাটা সোজা। হয়ে গেল, তারপরেই কালো বিদ্যুতের মতো পাশের একটা ঝোঁপের ওপর আছড়ে পড়ে অদৃশ্য হল। লতা নয়, একটা পাহাড়ী অজগরের বাচ্চা।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল মেহেলী। কিছুক্ষণ পর সতর্কভাবে আবার নিচের দিকে পা চালিয়ে দিল সে।
জা কুলি মাসের রাত্রি ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে! অসহ্য শীতে আঙুলের ডগাগুলো চিনচিন করতে শুরু করেছে। চামড়া চৌচির করে ফিনকি দিয়ে যেন এখুনি রক্ত বেরিয়ে আসবে।
অসহায় চোখে চারিদিকে একবার তাকাল মেহেলী। কোথাও খোকের চিহ্নমাত্র নেই। যেদিকে তাকানো যাক, নিবিড় বন আর গাঢ় অন্ধকার হা হা গ্রাস মেলে রয়েছে। পাহাড়ী মেয়ে মেহেলীর বুকের মধ্যে ভয়ের শিহরন খেলে গেল। সমস্ত দেহটা শিরশির করে উঠল তার।
পাশেই কোনো একটা গুহা থেকে এই অতল খাদ কাঁপিয়ে গর্জন করে উঠল একটা খ্যাপা বাঘ। সেই গর্জনের প্রতিধ্বনি দু’পাশের পাহাড়ে আছাড়ি পিছাড়ি খেতে খেতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কোথায় কোন বনচূড়া থেকে প্রেতকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল এক ঝাক টানডেলা পাখি। পাখি নয়, যেন আনিজার কান্না। বাইরেই কেবল হিম ঝরছে না, অপরিসীম ভয়ে সারা দেহের রক্ত গুড়ো গুঁড়ো বরফ হয়ে ধমনীর ওপর আছাড় খেতে লাগল মেহেলীর। একসময় প্রায় অসাড় শরীর নিয়ে পাহাড়ের একটা খাঁজের মধ্যে বসে পড়ল সে। তার হাতের থাবা থেকে মশালটা ছিটকে পড়ল ঘাসের ওপর।
শুকনো ঘাস। জা কুলি রাত্রির হিমে ভিজে গিয়েছিল। তবে পেন্যু কাঠের মশালের শিখা লেগে জ্বলে উঠল। শীতে আড়ষ্ট দু’টি হাত আর দু’টি পা সেই আগুনের দিকে বাড়িয়ে দিল মেহেলী।
সারা দেহের পেশীতে পেশীতে চেতনা ছিল না তার। একটু একটু করে আগুনের উত্তাপে রক্ত সঞ্চালন শুরু হল। জা কুলির রাত্রির হিমঝরা শীতে আগুনের শিখাটুকুতে মধুর আরাম রয়েছে।
সেই আগুন একটু পরেই নিস্তেজ হয়ে এল। ঊর্ধ্বমুখ শিখা ক্ষীণ হল। আগুনের অল্প অল্প আভা রয়েছে শুধু। আচমকা সেই ক্ষীণ রক্তাভায় সামনের দিকে তাকাতেই সারা দেহে কেমন চমক খেলে গেল মেহেলীর। স্নায়ুগুলো ঝঙ্কার দিয়ে উঠল। সামনের ভেরাপাঙ গাছের ঝাঁকড়া মাথায় একটা মানুষের দেহ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে তার হাত বাইরে বেরিয়ে এসেছে। নিশ্চয়ই খোনকে।
পাহাড়ী ঘাসের আগুন নিভে আসছে। বিষণ্ণ রক্তাভা মুছে যেতে শুরু করেছে। হঠাৎ রক্তে প্রখর উত্তেজনা ঝা ঝা করতে শুরু করল মেহেলীর। জা কুলি রাত্রির হিমে শরীরটা অসাড় হয়ে এসেছিল। সে কথা ভুলে গেল মেহেলী। বিদ্যুতের স্পর্শে যেন লাফিয়ে উঠল সে। তারপর পে কাঠের মশালটা ঘাসের আগুনে গুঁজে দিল। কিন্তু নিভন্ত আগুনে মশাল জ্বলে উঠল না।
একপাশে মশালটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেহেলী। তারপর নিরুপায় চোখে একবার এদিকে সেদিকে তাকিয়ে নিল। কিন্তু জা কুলি মাসের এই তুষারঝরা রাত্রি বড় নির্মম, ভীষণ নিষ্ঠুর। এতটুকু আগুন, এতটুকু উত্তাপের আভাসকে টুটি টিপে ধরার জন্য চারিদিকে ওত পেতে রয়েছে সেটা।
নাঃ, মূর্তির মতো এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। যেমন করেই হোক, খোনকের কাছে এখুনি পৌঁছুতে হবে মেহেলীকে। পাহাড়ী ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে সামান্য আগুন থেকে যে আলোটুকু বেরুচ্ছে সেটুকু ভরসা করেই মেহেলীর দেহমনে প্রেরণার উচ্ছ্বাস খেলে গেল। সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে সামনের ভেরাপাঙ গাছটার তলায় এসে দাঁড়াল মেহেলী।
