আচমকা কে যেন বলে উঠল, রাত্তির হল, এখনও তো সেঙাই ফিরল না উত্তরের পাহাড় থেকে। ওর কী হল সদ্দার?
নাচ আর বাজনার তুমুল উল্লাসের মধ্যে সেঙাইর কথা খেয়াল ছিল না কারো। তার ওপর কোহিমা থেকে ফিরেছে সিজিটো। সঙ্গে নিয়ে এসেছে অফুরন্ত গল্পের ভাণ্ডার। সুদূর অজানা শহরের গল্প, বরফসাদা সাহেবদের গল্প। সেসবের ভেতর মগ্ন হয়ে গিয়েছিল ছোট্ট পাহাড়ী গ্রাম কেলুরির মানুষগুলো।
আচমকা সবাই চকিত হয়ে উঠল। তাই তো, সেঙাই নেই এই নাচ বাজনার আসরে, এই বিশাল আকাশের নিচে গল্পকথার উল্লসিত কলরবের মধ্যে।
বুড়ো খাপেগা বলল, উত্তর পাহাড়ে কখন গেল সে?
ওঙলে বলল, আমরা সকলে খুনোতে (আবাদী জমি) গিয়েছিলাম দুপুরে। আগাছায় আগুন দিয়ে ফিরবার পথে সেঙই গেল উত্তর পাহাড়ে। সে বলল, তোরা গিয়ে নাচ গান শুরু কর। আমি এখুনি আসছি। তখন বিকেল হয়েছে। গান বাজনার মধ্যে ওর কথা আর খেয়াল ছিল না। তাই তো, এখন কী করব সদ্দার?
কী সর্বনাশ! হুই দিকটা ভালো নয়। টিজু নদী পেরিয়ে হুই সালুয়ালাঙ বস্তির শয়তানেরা মাঝে মাঝে এপারে আসে। ওরা হল আমাদের শত্রু। শিগগির তোরা মশাল নিয়ে একবার যা। দ্যাখ কী হল?
সিজিটো বলল, যেতে হবে না। সেঙাই ঠিক এসে পড়বে।
আকাশ থেকে শীতের রাত এই নাগা পাহাড়ের ওপর গাঢ় অন্ধকার ঢালছে। নিবিড় অন্ধকার। কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই।
দাঁতমুখ খিঁচিয়ে সিজিটোর দিকে তাকাল বুড়ো খাপেগা, তুই চুপ কর। সায়েবদের গা চাট গিয়ে।
আচ্ছা আচ্ছা। আমি ঘরে যাই তবে। সামনের দিকে পা বাড়িয়ে দিল সিজিটো।
একসময় গোটাকয়েক মশাল জ্বলে উঠল। তারপর সেই মশালগুলো তীরের ফলার মতো সাঁ সাঁ করে নেমে গেল উপত্যকার দিকে।
হো-ও-ও-ও—
একটা ভয়ঙ্কর পাহাড়ী ঝড় উত্তর পাহাড়ের দিকে ধেয়ে চলল।
.
১১.
সালুয়ালা গ্রামের ওপর জা কুলি মাসের রাত্রি এখন নিথর হয়ে আছে। কেসুঙে কেসুঙে পাহাড়ী মানুষগুলো অসাড়ে ঘুমুচ্ছে। অন্ধকারের সঙ্গে গুঁড়ো গুড়ো বরফের কণা ঝরছে আকাশ থেকে। মোরাঙের মধ্যে পেন্যু কাঠের মশাল এখন নিভে গিয়েছে। অগ্নিকুণ্ড থেকে এতটুকু রক্তাভাসও বেরিয়ে আসছে না বাইরে।
হিমার্ত বাতাস মাঝে মাঝে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে বনশীর্ষে। এই তুষারঝরা রাতে শুধুই কনকনে বাতাস আর নিবিড় অন্ধকার। পাহাড়ী গ্রামটা শীত ঋতুর ভয়াল রাতের থাবা থেকে পালিয়ে দড়ির লেপের নিচে ডুব দিয়েছে। একটা নিটোল আর মসৃণ ঘুমের অতল স্তরে তলিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।
কোথাও শব্দ নেই। নিস্তব্ধ জনপদ। এমনকি শুয়োর আর কুকুরগুলো পর্যন্ত একটু উত্তাপের জন্য পাহাড়ের খাঁজে ঢুকে গিয়েছে। কুণ্ডলী পাকিয়ে হিমাক্ত পাথরের ওপর স্থির হয়ে পড়ে রয়েছে পোষা মোষের দল।
এই সময় অনেক দূরের পোকরি কেসুঙ থেকে একটা মশালের আলো মোরাঙের দিকে। এগিয়ে আসতে লাগল। ক্ষীণ একটু আলোকবিন্দু। চারপাশের জমাট অন্ধকারকে সামান্য সরিয়ে আবছা পথ করে নিতে পেরেছে। মশাল ঘিরে ঝাপসা আলোর বৃত্ত। আর সেই বৃত্ত ঘিরে গুড়ো গুড়ো বরফের কণা উড়ছে।
একটু একটু করে মশালের আলোটা মোরাঙের পেছনে এসে দাঁড়াল। পাশে অতল খাদ। বনের বাঁধনে জটিল হয়ে পাহাড় খাড়া নিচের দিকে নেমে গিয়েছে। মশালের নিস্তেজ আলো খাদের গভীরে পৌঁছুতে পারেনি। চারপাশ থেকে গাঢ় কুয়াশা আলোকবিন্দুটির শ্বাসনলী চেপে ধরেছে যেন। আলো বেশিদুর ছড়িয়ে পড়তে পারছে না।
মশালের দু’পাশে দু’টি নারীমূর্তি। জানু থেকে মাথার ওপর পর্যন্ত দড়ির লেপ দিয়ে জড়ানো। তাদের ভৌতিক ছায়া এসে পড়েছে মোরাঙের দেওয়ালে। ছায়া দুটো কাঁপছে।
মোরাঙের দিকে দুজনে চনমনে চোখে তাকাল। তারপর একজন ভীরু গলায় বলল, খুব সাবধান মেহেলী, ওরা জানতে পারলে একেবারে টুকরো টুকরো করে কাটবে। আমার কিন্তু বড্ড ভয় করছে।
ভয় করলে কেসুঙে ফিরে যা লিজোমু। তুই আমার দাদাকে না পিরিত করতিস! তুই না দাদার পিরিতের মাগী ছিলি! তোর মতো মেয়েকে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে মোরাঙে ঝুলিয়ে রাখা দরকার। মেহেলীর চোখ দুটো অন্ধকারেও জ্বলে উঠল।
আশ্চর্য! লিজোমু খেপে উঠল না। শুধু ফিসফিস গলায় বলল, খোকেকে খাদে ফেলে দিয়েছে সদ্দার। সে কি আর বেঁচে আছে?
খাদে ফেলার সময় একপাশে দাঁড়িয়ে আমি দেখেছি। এই ঘন বন। এর মধ্যেই হয়তো কোথাও আটকে আছে দাদা। তুই একটু দাঁড়া, আমি নিচে নেমে দেখে আসি। এখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবি। খবদ্দার, মোরাঙের ওরা যেন টের না পায়। শেষ দিকে গলাটা কেঁপে কেঁপে উঠল মেহেলীর, তুই দেখিস, দাদা মরেনি। ও ঠিক আবার বেঁচে উঠবে। যদ্দিন সেরে না ওঠে, ওকে লুকিয়ে রাখতে হবে গাছের ওপরের ঘরে।
মোরাঙটার দিকে শঙ্কিত চোখে একবার তাকাল লিজোমু, আমার কিন্তু বুক কাঁপছে মেহেলী। আনিজার ভয়ে সদ্দার খোকেকে হুই খাদে ফেলে দিয়েছে। খোকেকে তুলে আনলে যদি আনিজার রাগ এসে পড়ে!
আতঙ্কে হঠাৎ মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে গেল মেহেলীর। তাই তো, এ ব্যাপারটা সে একবারও ভেবে দেখেনি। আনিজা! ওই একটি নামে ধমনীর ওপর রক্ত উথলপাথল হয়ে ওঠে। চেতনা কেমন যেন অসাড় হয়ে যায়। একবার টোক গিলল মেহেলী। পাহাড়কন্যা সে, হাতের মুঠিতে একটা বর্শা ধরা থাকলে শত্রুর হৃৎপিণ্ড এফেঁড় ওফোড় করে দিতে পারে। প্রয়োজন হলে মেরিকেৎসুর একটি আঘাতে গুড়ো গুঁড়ো করে দিতে পারে বুনো বাঘের মাথা। কিন্তু এই আনিজা নামটির মুখোমুখি হয়ে মেহেলী আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর কোত্থেকে সারা ধমনী মাতিয়ে মাতিয়ে রক্তের উচ্ছ্বাস খেলে গেল। একটা বিচিত্র দুঃসাহস কোত্থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সব দ্বিধা ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সব ভীরুতা মুছে গেল পাহাড়ী মেয়ের চেতনা থেকে।
