কোনো প্রতিবাদ করত না সিজিটো। বন-পাহাড়ের মানুষ হয়েও তার রক্তে অরণ্যের হিংসা নেই। চকিত দুটো চোখ তুলে সে উঠে যেত মোরাঙ থেকে।
মাঝে মাঝে একা একা দূরের পাহাড়ে চলে যেত সিজিটো। কোনো নিঃসঙ্গ জলপ্রপাতের কিনারে অন্যমনস্কর মতো বসে থাকত। কখনও বিশাল একটা ভেরাপাঙ গাছের মগডালে উঠে অনেক, অনেক দূরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিত। সুদূর পাহাড়ী দিগন্ত, তার ওপরে নীল আকাশ, তার পরের পৃথিবী আর দৃশ্যমান নয়। সেই অদৃশ্য জগৎ, সেই রহস্যের পৃথিবী প্রতিনিয়ত তাকে হাতছানি দিত। এক দুর্বার আকর্ষণে এই পাহাড়, দূরের ওই আকাশ ডিঙিয়ে তার বিচিত্র পাহাড়ী মন হারিয়ে যেতে চাইত। তাদের ছোট্ট জনপদ কেলুরি, পরিচিত মানুষগুলো, আরো অন্তরঙ্গ করে জানা বন, পাহাড়, উপত্যকা, বনভূমিতে শ্বাপদের সংসার, সব একেবারে অসহ্য হয়ে উঠত সিজিটোর কাছে।
একদিন আকাশের ওপারে সেই রহস্যের পৃথিবীটা দরজা খুলে দিল। সারুয়ামারুই তাকে নিয়ে গিয়েছিল কোহিমায়। পাহাড়ী শহর কোহিমা। অবাক বিস্ময়ে চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল সিজিটো। তাদের পরিচিত ছোট ছোট গ্রাম, ধান আর জোয়ারের খেত, শ্যামল মালভূমির বাইরে এমন সুন্দর সাজনো একটা জনপদ থাকতে পারে, তা কি সে জানত? এই শহরেই আর একটা জগৎ তার পাহাড়ী মনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সারুয়ামারুই পাদ্রীসাহেবের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। হুন্টসিঙ পাখির পালকের মতো ধবধবে গায়ের রং সাহেবের। চোখের মণি দুটো কী উজ্জ্বল! কী নীল!
ওই কোহিমা শহর, ওই পাদ্রীসাহেব বার বার সভ্যতা থেকে অনেক দূরের এক বিচিত্র পাহাড়ী মনকে আকর্ষণ করে আনল। অনেক গল্প শুনল সিজিটো। যীশুর কাহিনী, বাইবেলের গল্প। সেসব গল্পের প্রায় সবগুলোই সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গেল সে। অনেক জামাকাপড় উপহার পেল। লালচে রঙের পানীয় আর খাবার খেয়ে এসে তার কথা সবিস্তার গ্রামের সকলকে বলল। পাদ্রী সাহেব একটু একটু করে ক্রস আঁকতে শেখাল তাকে। সে অনেক ইতিহাস।
এই কোহিমা পেরিয়ে সে সাহেবের সঙ্গে গিয়েছিল মোককচঙ, মোককচঙ থেকৈ মাও, মাও পেরিয়ে ইম্ফল। সাহেব তাকে আশ্বাস দিয়েছে, ডিমাপুরে নিয়ে যাবে। মস্ত বড় শহর গুয়াহাটিও বাদ যাবে না। সেখান থেকে শিলং।
সুদূর স্বপ্নবৎ শহরের গল্প বলে বলে সে গ্রামের সকলকে হকচকিয়ে দেয়। এই নগণ্য পাহাড়ী গ্রাম, আর ওই ছয় আকাশ ছয় পাহাড়ের ওপারে যে বিচিত্র জগৎ ছড়িয়ে রয়েছে, এই দুইয়ের মধ্যে সিজিটো হল সেতুবন্ধ। সারুয়ামারুই তাকে প্রথম শহরে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সারুয়ামারুর দৌড় কোহিমা পর্যন্ত। সারুয়ামারুকে অনেক পেছনে ফেলে অনেক এগিয়ে গিয়েছে সিজিটো।
কয়েক দিন আগে সে কোহিমা গিয়েছিল। এই মাত্র ফিরে এসেছে। অপূর্ব এক পৃথিবীর সংবাদ সে নিশ্চয়ই নিয়ে এসেছে। নিশ্চয়ই সে সংবাদ রূপকথার মতো মনোরম। গ্রামের মানুষগুলো সিজিটোর গল্প শোনার জন্য আগ্রহে, কৌতূহলে উদগ্রীব হয়ে রয়েছে।
বুড়ো খাপেগা বলল, এবার তো কোহিমা থেকে ফিরলি। সেখানকার গল্প বল সিজিটো। সকলে শুনি।
আকাশে সন্ধ্যার ছায়া গাঢ় হয়ে আসছে। বাতাস হিমাক্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সিজিটো বলল, এখুনি রাত নামবে। চল, মোরাঙে গিয়ে বসি।
সারুয়ামারুর বউ জামাতসু এগিয়ে এল সামনে। সে বলল, আমরা মাগীরা তো মোরাঙে ঢুকতে পারব না। এখানে বসেই গল্প বল সেঙাইয়ের বাপ। আমি মশাল জ্বালিয়ে দিচ্ছি। আর হাত-পা সেঁকবার জন্যে কাঠে আগুন ধরাচ্ছি।
সিজিটোকে দেখে চোখ দুটো বিচিত্র আনন্দে ধক ধক জুলছিল জামাতসুর। সিজিটো এসেছে। রক্তকণাগুলো আগুনের বিন্দু হয়ে শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে তার।
জামাতসুর দিকে একবিন্দু হৃক্ষেপ নেই। সিজিটো সমানে বলে চলল, বুঝলি সদ্দার, তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।
বুড়ো খাপেগা এই ছায়া-ছায়া অন্ধকারে সিজিটোর মুখের দিকে তাকাল, কী কথা রে সিজিটো?
ফাদার একবার আমাদের বস্তিতে আসতে চায়। তা আমি বললাম, আমাদের সদ্দারের সঙ্গে কথাবার্তা বলে নিই। তারপর আমি খবর দিলে যাবি। আমাদের পাহাড়ী বস্তিতে না বলে কয়ে গেলে শেষে কে কোথা থেকে বর্শা হাঁকড়ে বসবে, তার কি কিছু ঠিক আছে? তোকে তো চেনে না আমাদের বস্তির লোকেরা। হয়তো তোকে শত্রু মনে করতে পারে। গম্ভীর গলায় কথাগুলো বলল সিজিটো।
কিন্তু তোর ফাদার আমাদের বস্তিতে আসবে কী করতে? বুড়ো খাপেগার কপালে অসংখ্য বলিরেখায় সংশয় ফুটে বেরুল।
বস্তির সকলকে ক্রস আঁকা শেখাবে।
আমরা তো কেউ নিমক নিইনি তোর সাহেবের কাছ থেকে। তবে আমাদের ও-সব। শেখাবে কেন? তুই আর সারুয়ামারু নিমক নিয়েছিস, আরো কত কিছু নিয়েছিস, তোরা তোদের ফাদার যা বলবে, তাই করবি। খবদ্দার নিমকহারামি করবি না। আমরা নিমক নিইনি, আমরা কেন ও-সব শিখতে যাব? বুড়ো খাপেগার ভ্র দুটো কাঁকড়া বিছের মতো কুঁচকে এল।
হো-ও-ও-ও—
পাহাড়ী মানুষগুলো চিৎকার করে উঠল।
এই থাম শয়তানের বাচ্চারা। হুঙ্কার দিয়ে উঠল বুড়ো খাপেগা। তারপর আবার সিজিটোর দিকে তাকাল, না না, এই বস্তিতে হুই সব ভিনদেশী মানুষ ঢুকতে পারবে না। আনিজার গোসা এসে পড়বে। তোরা বস্তির বাইরে গিয়ে যা খুশি করিস। কিন্তু বস্তিতে হুই সব চলবে না।
