ঝড়ের মতো একে চিত করে ফেলে, ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে লাফিয়ে ছুটে এল সারুয়ামারু, কি রে সিজিটো, কোহিমা থেকে ফিরলি বুঝি?
হু-হু। সাহেব তোকে যেতে বলেছে।
সমানে ক্রস এঁকে চলেছে সিজিটো। খুশির গলায় সে বলল, এই দ্যাখ, সাহেব আমাকে কী দিয়েছে। গায়ে একটা বড় হরিণের ছাল জড়ানো ছিল সিজিটোর। তার তলা থেকে একটি সাদা ধবধবে জামা বার করে আনল সে। তারপর সকলের দিকে তাকিয়ে আত্মপ্রসাদের হাসি হাসল, হু-হু, তুই গেলে তুইও পেতিস।
ইতিমধ্যে নাচ আর বাজনা থেমে গিয়েছিল। বিচিত্র কৌতূহলে গ্রামের মেয়েপুরুষ, সকলে সিজিটোর চারপাশে নিবিড় হয়ে এল।
পাহাড়ী মানুষগুলোর গলায় এবার বিস্ময়টা সরবে ফেটে পড়ল, এটা কী? এটা কী?
এর আগে তারা কোনোদিন জামা দেখেনি। সভ্যতা থেকে অনেক, অনেক দূরে এই তুচ্ছ পাহাড়ী গ্রামে এই প্রথম জামার আবির্ভাব। এবার আত্মপ্রসাদের হাসিটা সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল সিজিটোর। প্রচণ্ড শব্দ করে হেসে উঠল সে, হো-ও-ও-ও, হো–ও–ও। এর নাম হল জামা। ফাদার আমাকে দিয়েছে।
এটা দিয়ে কী হয়?
কী আর হয়, গায়ে দেয়। সাদা ধবধবে জামাটা পরে দেখিয়ে দিল সিজিটো, কি রে, কেমন দেখাচ্ছে?
ভালো ভালো, খুব সুন্দর। চারপাশ থেকে পাহাড়ী মানুষগুলো হইচই করে উঠল।
দেখবি, ফাদার আমাকে আরো কত জিনিস দেবে। পায়ের পাতা পর্যন্ত প্যান্ট দেবে, কোট দেবে, আরো অনেক কিছু দেবে। সকলের মুখের ওপর দিয়ে গর্বিত দৃষ্টিটা বুলিয়ে নিয়ে গেল সিজিটো।
প্যান্ট, জামা, কোট বিচিত্র সব শব্দ, অদ্ভুত সব নাম। পাহাড়ীদের কাছে এই নামগুলো একান্তই অজানা। নির্বাক তাকিয়ে থাকে সকলে।
কথা বলছে, আর সঙ্গে সঙ্গে ক্রস এঁকে চলেছে সিজিটো-অবিরাম। আচমকা তার দৃষ্টি এসে পড়ল সারুয়ামারুর ওপর। ভয়ঙ্কর গলায় সে বলল, কি রে, তুই ক্রস করছিস না যে আমার মতো? ফাদার যে বলে দিয়েছিল।
ও-সব আমার ভালো লাগে না। আগে কখনও করিনি। বিব্রত সুরে বলল সারুয়ামারু।
তুই ভারি নিমকহারাম তো। ফাদার তোকে নিমক দিয়েছে, আরো কত কী দিয়েছে। আর তুই বেইমানি করলি! কটমট করে তাকিয়ে রইল সিজিটো।
একেবারে বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে ফেলব। নিমকহারামি করে, বেইমানি করে পাহাড়ের ইজ্জত নষ্ট করবে! হাতের মুঠিতে একটা বর্শা তুলে নিল বুড়ো খাপেগা।
হো-ও-ও-ও–
চারপাশ থেকে চিৎকার করে ওঠে মানুষগুলো। সেই প্রচণ্ড চিৎকার ছাপিয়ে সিজিটোর গলা পর্দায় পর্দায় চড়তে লাগল, বুঝলি সদ্দার, আমাদের কেলুরি বস্তির কেউ কোনোদিন কারো সঙ্গে নিমকহারামি করেনি। হুই শয়তান সারুয়ামারু করেছে। ফাদার ওকে নিমক দিয়েছে, কাপড় দিয়েছে। আর তার বদলা সম্বরের ছাল নেয়নি। শুধু সে বলেছিল, কপালে-বুকে কাঁধে আঙুল ঠেকাতে। ফাদার বলে, এর নাম ক্রস আঁকা। সেই ক্রস সারুয়ামারু শয়তানটা আঁকে না।
বর্শার ফলাটা সারুয়ামারুর বুকের কাছে ঠেকিয়ে হুমকে ওঠে বুড়ো খাপেগা, সাহেব যা বলেছিল, তাই কর। নিমক খেয়েছিস, তার কথা রাখবি না? একেবারে জানে মেরে ফেলব। শয়তানের বাচ্চা।
কলের পুতুলের মতো কপাল, বুক আর বাহুসন্ধি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ক্রস আঁকতে লাগল সারুয়ামারু। আর বীভৎস গলায় বুড়ো খাপেগা বলল, পাহাড়ী মানুষ কখনও কারো সঙ্গে বেইমানি করে না, নিমকহারামি করে না। কেউ করলে তার জান চলে যাবে বর্শার মুখে।
হো-ও-ও-ও—
আকাশের দিকে দিকে আর একবার উদ্দাম চিৎকার উঠে গেল।
শহরে গিয়েছিলি, সেই গল্প বল। যে মানুষটা তোকে জামা দিয়েছে, তার গল্প বল। চারপাশ থেকে পাহাড়ী মানুষগুলো এবার ঘিরে ধরল সিজিটোকে।
বিচিত্র মানুষ এই সিজিটো। মাঝে মাঝে কত পাহাড় ডিঙিয়ে, কত জলপ্রপাত উজিয়ে, কত মালভূমি আর উপত্যকা পাড়ি দিয়ে সে চলে যায় শহরে-মোককচঙে কি কোহিমায়। অবশ্য আরো অনেকে শহরে যায় এই গ্রাম থেকে। সারুয়ামারু যায়, বুড়ো নড্রিলো যায়। লবণের সন্ধানে অনেককেই যেতে হয়। সারুয়ামারুই সিজিটোকে প্রথম নিয়ে গিয়েছিল শহর কোহিমায়। তারপর থেকে শহর এক বিচিত্র আকর্ষণে তাকে বার বার টেনে নিয়ে গিয়েছে। এই ছোট্ট জনপদে তার তৃষিত কামনা যেন তৃপ্ত হয় না। এই নিবিড় বন, এই টিজু নদী, দক্ষিণ আর উত্তরের তরঙ্গিত উপত্যকা, মাথার ওপর অবারিত আকাশ–এ-সবের মধ্যেই একদিন জন্ম নিয়েছিল সিজিটো। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সে তার প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন। তার রক্তে রক্তে অরণ্যের আহ্বান নেই, এই ভয়াল শৈলচূড়ার প্রতি আকর্ষণ নেই। কী যে সে চাইত, তার অস্ফুট বন্য মন তার হদিস পেত না। তারপর একদিন কৈশোরের সীমা ডিঙিয়ে দুর্বার যৌবন এল দেহমনে। পাহাড়ী প্রথা অনুযায়ী বিয়ে হল সেঙাইর মায়ের সঙ্গে।
সিজিটো জানত, তার বাপ জেভেথাকে হত্যা করেছিল টিজু নদীর ওপারের সালুয়ালা গ্রামের মানুষেরা। জেভেথাঙের মুণ্ডু কেটে বিজয় গৌরবে পোকরি বংশ উৎসব করেছিল, এ সংবাদও তার অজানা নয়। তবু তার রক্তে প্রতিহিংসার জ্বালা নেই, প্রতিশোধের আগুন নেই। কেমন যেন নিরুত্তাপ মানুষ সিজিটো। বুড়ো খাপেগা অনেকবার জেভেথাঙের কাহিনি তার কাছে বলেছে। কিন্তু এতটুকু উত্তেজনার চিহ্ন নেই তার মনের কি দেহের কোথাও। কেমন একটা নিস্পৃহ ভাব, একটা শীতল নিরাসক্তি। বিরক্ত হয়ে অবশেষে গর্জন করে উঠেছে বুড়ো খাপেগা, ইজা হান্টসা সালো। এত ভীরু তুই! এই বস্তির নাম তুই ডোবাবি টিজু নদীর জলে। একেবারে মাগীরও অধম। এ বস্তির মাগীরাও বর্শা দিয়ে ফুড়ে শত্রুর মুণ্ডু আনতে পারে। তুই একটা কী!
