একসময় সেই নাচ শুরু হল সারুয়ামারুর ঘরের সামনে, অর্থাৎ জোরি কেসুঙে। সমস্ত গ্রামখানা চারপাশ থেকে এসে জমা হয়েছে সেখানে। পাথুরে মাটির ওপর চক্রাকারে বসে পড়েছে সবাই। তামাটে পাহাড়ী মানুষ। কানে পিতলের নীয়েঙ গয়না। চাপা চাপা ছোট চোখে, চ্যাপ্টা নাকে, গোলাকার কামানো মাথায় আর অনাবৃত দেহে খুশির হিল্লোল বয়ে যাচ্ছে। সারা দেহ ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে, প্রতিটি অঙ্গ দুলিয়ে দুলিয়ে উল্লাস কি ক্রোধ ফুটিয়ে তোলে এই পাহাড়ী মানুষেরা।
মেয়ে আর পুরুষ–সব পাশাপাশি বসেছে। ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে একজন আর একজনের কাঁধের ওপর হাত তুলে দিয়েছে। আর নাচের তালে তালে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। উলঙ্গ আকাশের তলায় এই বিচিত্র পাহাড়ী গ্রাম। এই আকাশের মতো, এই পাহাড়ের মতো অকপট তাদের হাসি আর শোকের প্রকাশ।
একপাশে কয়েকটা পালিত শুয়োর আর কুকুর ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছে। আর মাঝে মাঝে খুশির গলায় অস্ফুট জান্তব শব্দ করে উঠছে। তারপরেই হয়তো পাহাড়ী মানুষগুলোর গায়ে এসে গড়াগড়ি দিয়ে পড়ছে। নাচের আসরে জানোয়ার আর মানুষের কোনো প্রভেদ নেই। দুয়েরই উল্লাস প্রকাশের ধারা এক। নাচের ফাঁকে ফাঁকে হল্লা করে উঠছে পাহাড়ী মানুষগুলো, হোঃ–হোঃ—ওঃ—ওঃ–
জোরি কেসুঙের সামনে অর্ধ-গোলাকার পাথরখানার ওপর এসে বসেছে বুড়ো খাপেগা। তার পরনে আরি হু কাপড়। যারা শত্রুপক্ষের দুটো মাথা গেঁথে আনতে পারে বর্শার মুখে, তারাই এই কাপড় পরার গৌরব অর্জন করে। কাপড়খানা ঘোর রক্তবর্ণ, হাঁটুর ওপরে তার প্রান্তটা ঝুলছে। কাপড়ের ওপর চামড়ার ঢাল, বাঘের চোখ, হাতির মাথা, চিতাবাঘ, মোষ, সম্বর আর বর্শা আঁকা রয়েছে।
হো-ও-ও-ও—
বেলাশেষের আকাশের দিকে দিকে মাতাল উল্লাস উঠে যাচ্ছে।
জোয়ান ছেলেরা চারপাশে বসে বসে খুলি (এক ধরনের বাঁশি) বাজিয়ে চলেছে। আর একদিকে প্রকাণ্ড জয়টাকের মতো গোটা কয়েক মেথি কেকোয়েনঘা খুলি বসানো হয়েছে। কয়েকজন মিলে মোটা মোটা মোষের হাড় দিয়ে সেগুলো প্রচণ্ড উৎসাহে পিটিয়ে চলেছে। দ্রাম—দাম—ম–ম–
দক্ষিণ পাহাড়ের দিকে দিকে সেই গম্ভীর শব্দ তরঙ্গিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। কেলুরি গ্রামখানা যেন থরথর করে কাঁপছে সে আওয়াজে।
চারপাশে ঘন হয়ে বসেছে গ্রামের মেয়েপুরুষ। তাদের মাঝখানে রাঙা ধুলো-ভরা জায়গাটায় উদ্দাম নাচ চলছে।
একদিকে ছটি জোয়ান ছেলে, পরস্পরের কাঁধের ওপর হাত দিয়ে দাঁড়ানো যেন একটি পাহাড়ী ছন্দ। আর একপাশে ছটি যুবতী মেয়ে। জোয়ানদের মতো তারাও কাঁধে কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাঁটু পর্যন্ত তাদের বিচিত্র রঙের কাপড়ে মানুষের কঙ্কাল, মোষের মাথা আর বর্শা এবং ঢাল আঁকা রয়েছে। দু’টি দলের সকলেরই কোমরের ওপর থেকে উদেহ অনাবৃত।
যুবতীদের কানে পিতলের নীশে দুল। মণিবন্ধে হাতির দাঁতের মোটা মোটা বালা। চুলের ভঁজে ভাঁজে সম্বরের ছোট ছোট শিঙ গোঁজা। কানের পাতায় সাঙলিয়া লতার নীলাভ ফুল। ছেলেদের মাথায় মোষের শিঙের মুকুট। কানে আউ পাখির পালক গোঁজা। গলায় কড়ির মালা।
দুই দলের মাঝখানে তিনটে বাঁশের খুঁটি পোঁতা রয়েছে। সেই খুঁটিগুলোকে চক্রাকারে ঘিরে একবার দুটো দল নাচতে নাচতে মুখোমুখি হচ্ছে। পরস্পরের মাথায় মাথা ঠেকছে। তার পরেই আবার পেছন দিকে পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে পিছিয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে থামছে। মাত্র একটি মুহূর্ত। আবার সামনের দিকে ঝুঁকে ছন্দিত পা ফেলে ফেলে অন্য দলটির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পালা।
দ্রাম—ম্–ম্–ম্–
গম গম শব্দ উঠছে মেথি কেকোয়েনঘু খুলি বাদ্যযন্ত্র থেকে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়েছে বাঁশির সুর। আর সেই আবহ বাজনার সঙ্গে পা ফেলে ফেলে নাচ চলেছে। উদ্দাম নাচ, দুর্বার নাচ, অবিরাম নাচ। পায়ের আঘাতে আঘাতে রাঙা ধুলোর মেঘ উড়ছে।
পাহাড়ীদের এই নাচকে বলে ইয়াচুমি কোঘিল নাচ।
হো –ও—ও–ও—
নাচের সঙ্গে সঙ্গে চলছে উচ্চকিত কণ্ঠের হইচই।
বুড়ো খাপেগা ঘন ঘন পাকা মাথাখানা দোলাচ্ছে। হাত নেড়ে নেড়ে তারিফ করছে নাচ আর বাজনার।
জোরি কেসুঙে নাচ হচ্ছে। তাই সারুয়ামারু আর তার বউ জামাতসু বাঁশের পানপাত্রে সকলের সামনে রোহি মধু দিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
হো-ও-ও-ও–
আকাশে বিবর্ণ বেলাশেষ। দূরের পাহাড়চূড়া আবছা হয়ে আসছে। পশ্চিমের বনশীর্ষ থেকে রোদের রং মুছে গিয়েছে।
মাতাল দেহের মুদ্রাভঙ্গে নেচে চলেছে পাহাড়ী যুবতী। উদ্দাম ছন্দে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে আসছে পাহাড়ী জোয়ান। তার সঙ্গে সঙ্গে জলদ তালে বাজছে বাজনা।
খাপেগা খুবই খুশি। মাথা নাড়ছিল সে। আচমকা তার পাশে এসে দাঁড়াল সিজিটো। তার দিকে তাকিয়ে খালোগা বলল, কি রে, কী ব্যাপার? নাচ আর বাজনা বেশ জমেছে। বোস, বোস।
বিরক্ত দৃষ্টিতে আসরটার দিকে তাকিয়ে ছিল সিজিটো। আর অখণ্ড মনোযোগে বুক, কপাল। আর কাঁধের পাশে দুই বাহুসন্ধি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ক্রস আঁকছিল। সারা মুখে দাড়ি-গোঁফের লেশ নেই। একটা কঠিন ভ্রুকুটি ফুটে বেরুল সিজিটোর, এসব আমার ভাল লাগে না সদ্দার। তোর সঙ্গে আমার কথা আছে।
কী কথা? পাকা ভুরু দুটো কুঁচকে তাকাল বুড়ো খাপেগা।
একটু দাঁড়া। হুই সারুয়ামারুকে ডেকে আনি আগে।
জোরি কেসুঙের একপাশে দাঁড়িয়ে সারা দেহ বিচিত্র ভঙ্গিমায় বাঁকিয়ে চুরিয়ে এই আদিম নৃত্যকলা উপভোগ করেছিল সারুয়ামারু। সিজিটো তাকে ডাকল, এই সারুয়ামারু, ইদিকে আয়। ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টেফঙের (বাঁদর) মতো খুব যে নাচছিস!
