হিম অসহ্য হয়ে উঠেছে। তার দাঁতে দাঁতে শরীরটা যেন ফালা ফালা হয়ে যাবে, মনে হল সেঙাই-এর। এত কাছাকাছি মেহেলী, তবু সামনে যাবার উপায় নেই। ওপাশে গেলেই একটা বর্শার ফলা পাঁজরাটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলবে। এ একেবারে নিশ্চিত। সেঙাইর মনে। হচ্ছে, মেহেলীর যে সুন্দর নগ্ন শরীরের আকর্ষণে টিজু নদী ডিঙিয়ে এপারে এসেছে সে শরীর যেন কোনো মেয়ের নয়। সেটা একটা সোনালি সাপ, যার স্পর্শে নির্ঘাত মৃত্যু।
শরীরের ডান দিকটা ধরে গিয়েছে সেঙাইর। সেদিকে কোনো সাড় নেই, বোধ নেই। কী করবে ঠিক করে উঠতে পারছে না সে।
হঠাৎই মোরাঙের মধ্যে ঘটে গেল ঘটনাটা। আর চমকে উঠল সে।
বাঁশের মাচানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তামুন্য (চিকিৎসক), তার মুঠিতে একটা কাঠের পাত্র। সেই পাত্রে টকটকে তাজা অনেকটা রক্ত। একটু আগেই শুয়োর বলি দিয়ে নিয়ে এসেছিল সেই জোয়ান ছেলে দুটো।
এতক্ষণ বাঁশের মাচানে নিঝুম শুয়ে ছিল খোনকে। আর একটু একটু করে তার চারপাশে ঘন হয়ে আসছিল বুড়ো সর্দার আর মোরাঙের জোয়ান ছেলেরা।
তামুনুর মুখে আত্মপ্রসাদের হাসি ফুটে বেরিয়েছে। রাক্ষসের মতো বিকট শব্দ করে হেসে উঠল সে, হোঃ-ও–ও–ও-, হোঃ-ও–ও–ও-, হোঃ-ও–ও–ও-, দেখলি তো সদ্দার, আনিজার–
তার কথা মাঝপথেই থমকে গেল। ফের মাচানের ওপর উঠে বসেছে খোনকে। মৃত্যুযন্ত্রণায় তার মুখখানা ভয়ানক হয়ে উঠেছে। ছোট ছোট চাপা চোখের ভেতর থেকে পিঙ্গল মণি দুটো ঠিকরে আসছে। আর বুকের সেই বিশাল ফাটলে মেটে রঙের হৃৎপিণ্ডটা নিশ্বাসের সঙ্গে।
অনেকখানি বেরিয়ে এসেছে। অস্বাভাবিক গলায় প্রলাপ বকে উঠল খোকে, খুন-খুন হোঃ হোঃ–আমার বর্শা দে—
আনিজা! হু-হু, সহজে আনিজার রাগ পড়বে না। একটা শুয়োরে চলবে না তার। খোকেকে সে চাইছে। খোনকে এই মোরাঙে থাকলে বস্তিতে মড়ক ধরে যাবে। শিগগির ওকে খাদে ফেলে দে সদ্দার। বাঁশের মাচানের পাশ থেকে সরে গেল তামুন্যু। খোনকে সম্বন্ধে শেষ রায় দিয়ে বিশাল মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে অন্য একটা মাচানে গিয়ে বসল।
জোয়ান ছেলেরা চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
বুড়ো সর্দার বলল, এই যাসিমু, এই ফিরাঙ, তোরা খোকেকে ধরে পেছনের খাদে ফেলে দিয়ে আয়।
মোরাঙের দেওয়ালের পাশে একটা অসাড় দেহে শিহরন খেলে গেল। স্নায়ুগুলো ধনুকের ছিলার মতো টান টান হয়ে উঠল। এখনই খোকেকে নিয়ে জোয়ান ছেলেরা এদিকে আসবে। তারপর ছুঁড়ে ফেলে দেবে খাদের অতলে। কঠিন পাথরের ঘা লেগে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে খোকের দেহ। কিন্তু এ সব ভাবছে না সেঙাই। তার চিন্তা, এখানে এসে তাকে দেখলে জোয়ান ছেলেরা দাঁতাল শুয়োরের মতো ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলবে। সামনের দিকে যাওয়া অসম্ভব। মোরাঙের দরজার কাছে মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেহেলীরা। শত্রুপক্ষের কুমারী যৌবনকে বিন্দুমাত্র ভরসা নেই।
ইতিমধ্যে মোরাঙের ভেতর জোয়ান ছেলেরা খোকেকে কাঁধের ওপর তুলে নিয়েছে। আর ভাবতে পারছে না সেঙাই। অসাড় দেহটাকে কোনোক্রমে টানতে টানতে পাহাড়ের গা বেয়ে খাদের দিকে অনেকটা নেমে গেল সে। চেতনাটা কেমন অসাড় হয়ে আসছে। কিছুই বুঝতে পারছে না সেঙাই। হাতের থাবা দিয়ে পাথরের একটা চাই ধরে আশ্রয় নিয়েছিল। একটু একটু করে থাবাটা শিথিল হয়ে আসছে। পিঠের ওপর, মুখের ওপর কুচি কুচি বরফ জমছে। প্রায় অচেতন দেহটাও যেন চিনচিন করে উঠছে। ভয়ানক একটা অনুভূতি চেতনা আর নিশ্চেতনার মধ্যে দোল খেয়ে যাচ্ছে।
আচমকা ওপর থেকে একটা বিশাল গুরুভার কিছু আছড়ে পড়ল পাশের পাথরের ওপর। ঝপাং করে শব্দ উঠল। সেই সঙ্গে একটা তীব্র আর্তনাদ। আ-উ-উ-উ-। নির্ঘাত খোনকে। পরক্ষণে একেবারেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল অন্ধকার পাহাড়ী খাদটা। শুধু নিবিড় অরণ্যের মধ্য দিয়ে পাক খেতে খেতে একটা মানবদেহ নিচের দিকে নেমে যেতে লাগল।
আর কিছুই শুনতে পেল না সেঙাই। শুধু অস্পষ্টভাবে বুঝতে পারল, তার হাতের মুঠি আরো শিথিল হয়ে আসছে। আর পাথরের অবলম্বনটা একেবারে খসে গিয়েছে। কিন্তু হাত বাড়িয়ে আর একটা কিছু ধরার মতো শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে। সীমাহীন শূন্যতায় তার দেহটা ছিটকে পড়ল। কোথাও কোনো আশ্রয় নেই। চারপাশে অথই অন্ধকার হা হা গ্রাস মেলে রয়েছে। একটু আগে খোনকের দেহটা অতল খাদের দিকে নেমে গিয়েছিল। হয়তো তারই প্রেতাত্মা লম্বা একখানা হাত বাড়িয়ে সেঙাইকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে।
কোথায় মুছে গেল মেহেলী, কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল টিলায় উপত্যকায় মালভূমি আর চড়াই-উতরাইতে দোল-খাওয়া এই নাগা পাহাড়। সেঙাইর সব সাধ, কামনা আর বাসনা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। কিছুই ভাবতে পারছে না সেঙাই। অস্ফুট বোধ, অপরিণত বন্য মন। সেই বোধ আর মন এখন একেবারেই ক্রিয়া করছে না। তবু সেঙাইর মনে হল, দেহটা তার আশ্চর্য হালকা হয়ে গিয়েছে। শিরায় স্নায়ুতে, ধমনী আর ইন্দ্রিয়ে, বোধ আর বুদ্ধিতে যে প্রাণ বহমান, সে প্রাণ একটু একটু করে স্তব্ধ হয়ে আসছে।
নিরাশ্রয় শূন্যতায় পাক খেতে খেতে খাদের অতলে নামতে লাগল সেঙাই।
১০. ফসলহীন আগাছা পুড়িয়ে
১০.
বিকেলের শুরুতে খেতে খেতে ফসলহীন আগাছা পুড়িয়ে উত্তর পাহাড়ে চলে গিয়েছিল সেঙাই। আর ওঙলেরা ফিরে এসেছিল তাদের ছোট্ট গ্রামটিতে। সকলে মিলে ঠিক করেছিল নাচগানের মাতাল ঘূর্ণিতে আর উল্লাসে আজকের বাকি দিনটা জমিয়ে তুলবে।
