আচমকা ছিলামুক্ত তীরের মতো সাঁ করে মাচানের ওপর উঠে বসল শোয়ানো মানুষটা। মশালের আলোতে তার পিঙ্গল চোখে দুটো কেমন যেন অমানুষিক দেখাচ্ছে। বুকের বাঁ দিকটা বিরাট একটা ফাঁক হয়ে ঝুলে পড়েছে। সেখান থেকে মেটে রঙের এক ডেলা মাংস ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বোধ হয়, ওটাই মানুষটার হৃৎপিণ্ড। জান্তব গলায় প্রলাপ বকে উঠল মানুষটা, খুন, খুন-খুন করে ফেলব। বর্শা দে…ওরা কে? কে?..হোঃ-হোঃ-হোঃ-ও–ও– ও তীব্র গলায় জান্তব অট্টহাসি হেসে উঠল সে।
মোরাঙের বাইরে দেওয়ালের পাশে চমকে উঠল সেঙাই। বাঁশের মাচানের ওপর উঠে বসে যে মানুষটা প্রলাপ বকছে সে খোনকে। মশালের আলোতে খোনকের কঙ্কালসার দেহটা প্রেতমূর্তির মতো দেখাচ্ছে।
খোনকে মরেনি। সেদিন সেঙাই যে বর্শার ফলা ছুঁড়ে মেরেছিল সেটা তা হলে ব্যর্থ হয়েছে!
মাথাটা টলমল করে দুলে উঠল সেঙাইর। অতল খাদে সে পড়েই যেত, তার আগেই বাঁশের দেওয়ালটা ধরে টাল সামলে নিল।
খোনকেকে লাফিয়ে উঠতে দেখে চারপাশ থেকে জোয়ান ছেলেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সরে দাঁড়াল। সকলেরই চোখেমুখে আতঙ্ক খেলে যাচ্ছে। সালুয়ালা গ্রামের তামুন্যও (চিকিৎসক) রীতিমতো ভয় পেয়েছে। বাঁশের মাচানটা থেকে উঠে সে-ও সরে দাঁড়িয়েছে বেশ একটা নিরাপদ দূরত্বে। তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুড়ো সর্দার।
কাঁপা কাঁপা গলায় সর্দার বলল, কী ব্যাপার তামুন্যু?
আনিজা! আনিজা! খারাপ আনিজাতে পেয়েছে খোনকেকে।
কী করতে হবে? কাঁপা গলাটা এবার ফিসফিস শোনাচ্ছে সর্দারের।
হু-হু, কাল রাত্তিরে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, এমনটি হবে। চটপট একটা শুয়োর বলি দিয়ে রক্ত নিয়ে আয়। টেটসে আনিজার নামে বলি দিবি।
দুটো জোয়ান ছেলে মোরাঙের দরজা দিয়ে শুয়োরের সন্ধানে ছুটে গেল পোকরি কেসুঙে। পোকরি বংশের ছেলে খোনকে। তাদের শুয়োরই উৎসর্গ করা হবে।
এখনও সমানে প্রলাপ বকে চলেছে খোনকে, খুন–খুন–খুন কর! আগুন লাগিয়ে দে। চারদিকে। হো-ও-ও-ও–
অট্টহাসির সঙ্গে মনে হল, বুকের ফাটল দিয়ে হৃৎপিণ্ডটা ছিটকে বেরিয়ে আসবে খোনকের। ভয়ানক দেখাচ্ছে তার বুকের ক্ষতটা।
প্রকাণ্ড মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আচমকা বাঁশের মাচানটার কাছে চলে এল তামুন্যু। তারপর দু’টি প্রবল থাবায় খোনকের কাধ দুটো ধরে শুইয়ে দিল। তার ওপর একটা বাদামি রঙের চ্যাপ্টা হাড়ে তিনটে ফুঁ দিয়ে বুকে ঠেকাল। চারপাশে একবার চনমন করে তাকিয়ে তামুন্যু তার মুখখানা খোনকের বুকের ওপর রাখল। এবং চুকচুক শব্দ করে ক্ষতমুখ থেকে লালাভ রক্তধারা শুষে নিল। পাহাড়ী চিকিৎসার এক এক বীভৎস পদ্ধতি, এক নারকীয় প্রক্রিয়া।
বাঁশের পাত্রে কিছুটা কেগোথেনা পাতা বাটা ছিল। খোনকের ক্ষতে তার থেকে খানিকটা তুলে মাখিয়ে দিল তামুন্যু। আর বাঁশের মাচানের ওপর নিঃসাড় হয়ে পড়ে রইল খোকে। চোখ দুটো তার অর্ধেক বুজে এসেছে। একটা অদ্ভুত অবসাদ দেহময় ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ঢিমে তালে নিশ্বাসের সঙ্গে বুকের ক্ষতমুখটা চৌফালা করে মেটে রঙের হৃৎপিণ্ডটা ঠেলে বেরিয়ে পড়তে চাইছে।
শীতের রাত্রি আরো হিমার্ত হয়ে উঠেছে। সেঙাই-এর চামড়ায় সেটা যেন সহস্র দাঁত বসাচ্ছে। যন্ত্রণায় শরীরের জোড়গুলো যেন খুলে খুলে আসতে চাইছে। তবু দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল সে।
একটু পরেই মোরাঙের দরজার দিকে কতকগুলি পে কাঠের মশাল দেখা দিল। সঙ্গে সঙ্গে চেঁচামেচি শুরু হল।
মোরাঙের এই দেওয়ালের দিকটা নিরাপদ। তবু শরীরটাকে যতখানি সঙ্কুচিত করা যায়, তাই করে দেওয়ালের গায়ে লেপটে রইল সেঙাই।
একটু পরেই একটা কাঠের পাত্রে খানিকটা তাজা রক্ত নিয়ে এল সেই জোয়ান দুটো। খানিক আগে পোকরি কেসুঙে শুয়োর বলির খবর দিতে গিয়েছিল তারা। তাদের সঙ্গে আরো কয়েকটি নানা বয়সের পুরুষও মোরাঙে চলে এসেছে।
একজন কাঠের পাত্রটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল, এই নে তামুন্যু, রক্ত এনেছি। আনিজার নামে খোকের বাপ শুয়োর বলি দিয়েছে।
মোরাঙের দরজার বাইরে হইচইটা এবার প্রবল হয়ে উঠছে।
বুড়ো সর্দার বলল, দরজার ওধারে কে ওরা?
খোনকের ছোট বোন মেহেলী আর তার মা এসেছে। বস্তি থেকে আরো কয়েকটা মেয়েও এসেছে। তারা সব জটলা করছে।
সেই জোয়ান ছেলেটা বলল, খোনকের খবর জানতে চায়।
মোরাঙে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই তারা দরজা থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। নাগা পাহাড়ের এই প্রথাকে অসম্মান করে কোনো মেয়ের মোরাঙে ঢোকার উপায় নেই। কোনোভাবেই, কোনো কারণেই এই প্রথা ভাঙা চলবে না। মোরাঙ হল অবিবাহিত জোয়ান ছেলেদের নৈতিক জীবনের পীঠভূমি। নারীর কামনা আর রিপুর তাড়না থেকে অনেক, অনেক দূরে এর নিষ্পাপ অস্তিত্ব। এর পবিত্রতা নারীদেহের আসক্তি দিয়ে কলুষিত করে তোলা রীতিমতো অপরাধ। সে অপরাধের শাস্তি নির্মম, নিষ্ঠুর। অনিবার্য মৃত্যু দিয়ে সে অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। তাই মেহেলীরা ভেতরে ঢোকেনি।
মোরাঙের বাঁশের দেওয়ালে শরীরটা হিমে অসাড় হয়ে আসছে সেঙাই-এর। তারই মধ্যে একটা নাম শুনতে পেয়েছে সে। নামটা তার সমস্ত চেতনার ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। সে নাম মেহেলী। এই মেহেলীর কামনাই তাকে শীতের হিমে দক্ষিণ পাহাড় থেকে টিজু নদীর এপারে এই সালুয়ালা গ্রামে টেনে এনেছে। ময়াল সাপ যেমন করে তার নিশ্বাসে নিশ্বাসে ছোট্ট হরিণশিশুকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যায় ঠিক তেমন করেই কি মেহেলী তাকে এই পাহাড়ে নিয়ে এসেছে?
