পোকরি বংশের গ্রাম। তাদের শত্রুপক্ষের আস্তানা। মনে মনে কথাগুলো একবার ভেবে নিল সেঙাই। কিন্তু আজ প্রতিহিংসার কারণে এ গ্রামে আসেনি সেঙাই। আর এক আদিম প্রবৃত্তির ডাকে এসেছে। সে প্রবৃত্তির বাস্তব প্রকাশ একটি নারীদেহে। তার নাম মেহেলী।
চারিদিক ভালো করে দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে ঝাকড়া জীমবো গাছটার মগডালে উঠে গেল সেঙাই। সন্ধে পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করতে হবে।
একসময় পশ্চিম আকাশ থেকে বিবর্ণ বেলাশেষ মুছে গেল। প্রথমে ছায়া ছায়া, পরে গাঢ় অন্ধকার নেমে এল নাগা পাহাড়ে। এবার জীমবো গাছটা থেকে নিচে নেমে এল সেঙাই। সতর্ক পা ফেলে ফেলে স্নায়ুগুলিকে ধনুকের ছিলার মতো প্রখর করে সালুয়ালা গ্রামের প্রান্তে এসে দাঁড়াল।
এধারেই সালুয়ালা গ্রামের বিশাল মোরাঙ। গাঢ় অন্ধকারে বিশেষ কিছুই নজরে আসছে না। আবছা অতিকায় একটা প্রেতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে মোরাঙটা।
পাহাড়ের নিচু একটা খাঁজ থেকে ওপরে উঠে এল সেঙাই। সঙ্গে সঙ্গে মোরাঙের বাঁ পাশে একটা মশাল নজরে পড়ল। মশালের শিখাটা এদিকেই এগিয়ে আসছে। বুকের মধ্যে এক ঝলক রক্ত যেন ছলাত করে আছড়ে পড়ল সেঙাই-এর। লাফিয়ে আবার পাহাড়ের খাঁজে নেমে গেল সে। তারপর নিশ্বাসরুদ্ধ করে মড়ার মতো পড়ে রইল।
মশালের শিখাটা ঠিক ওপরের টিলাটা ধরে এগিয়ে যেতে লাগল। একবার মাথা তুলল সেঙাই। চোখে পড়ল, খুব কাছে দড়ির লেপ জড়ানো এক নারীমূর্তি। চকিতে তার মুখখানা দেখে চমকে উঠল সে-সালুনারু। রেঙকিনের বউ তবে কি টিজু নদী ডিঙিয়ে সালুয়ালা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে।
রেঙকিলানের মৃতদেহটা যেদিন দক্ষিণ পাহাড়ের অতল খাদে সারুয়ামারু খুঁজে পেয়েছিল, ঠিক সেদিনই বেয়াদপির জন্য আর রেজু আনিজার নামে অপরাধের কারণে খাপেগা তার দিকে বর্শা তুলে ধরেছিল। ঘন বনের মধ্যে লাফিয়ে পড়ে সেদিন প্রাণ বাঁচিয়েছিল সালুনারু। তারপর থেকে কেলুরি গ্রামে আর তাকে কেউ দেখেনি।
সালুনারু আর তার হাতের মশালটা একসময় দূরের কেসুঙগুলোর দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে হিম ঝরতে শুরু করেছে। সকালে এবং দুপুরে বাঁশের পানপাত্র পূর্ণ করে বার সাতেক রোহি মধু খেয়েছিল সেঙাই। অত্যন্ত উষ্ণ পানীয়। তবু শরীরের জোড়ে জোড়ে কাঁপুনি ধরে গিয়েছে। দাঁতে দাঁতে হি-হি বাজনা শুরু হয়েছে। এ গ্রামেরই একটা পোষা শুয়োর কখন যেন গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। জন্তুটার কাঁটাভরা কর্কশ জিভ। সেই জিভ দিয়ে পিঠের ওপরটা চেটে চেটে দিচ্ছে সেঙাই-এর। বর্শার তীক্ষ্ণ ফলা দিয়ে শুয়োরটার পাজরে একটা খোঁচা দিল সেঙাই। কাতর শব্দ করে প্রাণীটা ছুটে পালাল। আর থাবার মধ্যে ভয়াল বর্শাটা চেপে ধরে ওপরের টিলায় উঠে এল সে।
মোরাঙের ঠিক মুখোমুখি একটা বড় ভেরাপাঙ গাছ। তার আড়ালে দেহটাকে যতদূর সম্ভব গুটিয়ে নিয়ে দাঁড়াল সেঙাই। মোরাঙের ভেতর থেকে পে কাঠের মশালের আলো এসে পড়েছে বাইরে। শীতার্ত রাত্রির অন্ধকার বিদীর্ণ করে সে আলো রহস্যময় হয়ে উঠেছে। মোরাঙের দরজার ঠিক ওপরেই বিশাল এক বর্শার মাথায় একটা নরমুণ্ড। আবছা আলো অন্ধকারে বীভৎস দেখাচ্ছে। মুণ্ডটার মাংস ঝরে গিয়েছে, হনু আর কণ্ঠার হাড়ের ওপর আর গলার কাছে কিছু কিছু মাংসের অবশেষ কালো হয়ে ঝুলছে এখনও! চোখের কোটরে মণিদুটো নেই; শুধু বিরাট দুই গর্তে হিমাক্ত রাত্রির অন্ধকার জমা হয়ে রয়েছে।
এই নরমুণ্ড সালুয়ালা গ্রামের বীরত্বের স্মারক। তার পৌরুষের ঘোষণা। শত্রুর মুণ্ড কেটে এনে সালুয়ালাঙ গ্রাম বর্শার ফলায় গেঁথে আকাশের দিকে তুলে ধরেছে, তুলে ধরেছে বিজয়গৌরবে, গর্বিত ঔদ্ধত্যে।
পেশীগুলো আচমকা ঝনঝন করে বেজে উঠল আদিম মানুষ সেঙাইর। হাতের বর্শাটা থাবা থেকে পড়ে গেল পাথরের টিলায়। টং করে একটা ধাতব শব্দ উঠল। এই নরমুণ্ড কি তবে তার ঠাকুরদার? বহুকাল আগে টিজু নদীর খরধারায় পোকরি বংশের বর্শা যাকে নির্মম আঘাতে হত্যা করেছিল? রক্তস্রোতে বিদ্যুৎ বয়ে চলল সেঙাই-এর।
একটা ভয়ঙ্কর মুহূর্ত। তারপরেই বর্শাটা তুলে নিয়ে এক পা, দু পা করে মোরাঙের পাশে এসে দাঁড়াল সেঙাই। এ দিকটা অনেকখানি নিরাপদ। নিচে খাড়া পাহাড়ের ঢাল অতল খাদে নেমে গিয়েছে। চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার। শুধু মোরাঙ থেকে বাঁশের দেওয়াল ভেদ করে অগ্নিকুণ্ডের আভা বেরিয়ে আসছে। দেওয়ালের পাশে ওত পেতে দাঁড়াল সেঙাই। তারপর পলকহীন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
মোরাঙের ভেতরটা এবার পরিষ্কার নজরে আসছে। বাঁশের মাচানের ওপর শুয়ে রয়েছে একটি শীর্ণ শরীর। তার চারপাশে অনেকগুলো মানুষ ভিড় করে রয়েছে।
একটা বুড়ো বাঁশের মাচানের মানুষটার ওপর ঝুঁকে পড়ল। অস্পষ্ট আলোয় দেখা যায়, তার কানে পেতলের বিরাট নীয়েঙ গয়না। গলায় ময়াল সাপের হাড়ের মালা। কপালের ওপর তিনটি গাঢ় রক্তের রেখা। গালে অসংখ্য কুঞ্চন। এই গ্রামের সর্দার সে।
বুড়ো মানুষটা চাপা গলায় বলল, কি তামুন্যু (চিকিৎসক), কী মনে হচ্ছে? হু-হু, আমার কিন্তু ভালো ঠেকছে না।
মাচানের আর এক পাশে একটি মানুষ বসে ছিল। সারা দেহ অনাবৃত। বুকের ওপর অসংখ্য উল্কি। গলার চারপাশে মানুষের করোটির মালা। হাতে একখণ্ড বাদামি রঙের হাড়। গম্ভীর গলায় সে বলল, উঁহু, আমারও ভালো ঠেকছে না সদ্দার। ঘায়ে পোকা ধরে গিয়েছে। এই দ্যাখ, কেগোথেনা পাতা বেটে লাগিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না।
