সেঙাই-এর দেখাদেখি সকলে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
সেঙাই বলল, তোরা সব বস্তিতে ফিরে যা। আমি উত্তরের পাহাড়ে যাব। বস্তিতে ফিরব। কিছুক্ষণ পর।
নাচগানের কী হবে রে শয়তান? ওঙলের গলায় রীতিমতো বিরক্তি।
তোরা ব্যবস্থা কর। নাচগান শুরু হবার আগেই চলে আসব।
আর দাঁড়াল না সেঙাই। পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে মালভূমির দিকে তর তর করে নামতে লাগল। উত্তরের পাহাড়ে যেতে অনেকটা সময় লাগবে। কেন যেন তার মনে হচ্ছে, হয়তো মেহেলী এসেছে সেই ঝরনার ধারে।
হো-ও-ও-ও–ও—
পাহাড় আর বন কাঁপিয়ে বাকি সকলে গ্রামের দিকে চলে গেল।
দুলতে দুলতে নিচের মালভূমিতে নেমে এল সেঙাই। একদিকে এক নগ্ন নারীতনু। মেহেলী। আর একদিকে তার ঠাকুরদাকে হত্যা করেছে পোকরি বংশ। প্রতিহিংসা আর কামনা। মৃত্যুমুখ। বর্শা আর রমণীয় নারী–আদিম প্রাণের কাছে দু’টিই সত্য। নির্মম সত্য। ভয়ঙ্কর সত্য। এ দুয়ের মধ্যে দোল খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে সেঙাই।
একসময় নিঃশব্দ ঝরনাটার পাশে এসে দাঁড়াল সে। চারিদিকে একবার ভালো করে তাকাল। কিন্তু সেদিনের মতো আজ আর কেউ নেই এখানে। সেদিন মেহেলী ছিল। আদিম মানবীর অনাবরণ রূপ দেখতে দেখতে আবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল সেঙাই। বর্শা সে তুলে ধরেছিল সত্যি, কিন্তু তার ফলায় হত্যার কোনো ইচ্ছা হয়তো ছিল না। এক নারীর আত্মসমর্পণ, এই নিয়েই সেদিন তৃপ্ত হয়েছিল সেঙাই। কিন্তু আজ? সেদিন সে কি জানত, বর্শার ফলায় শুধু খোনকেকে শিকার করে আসেনি, সে নিজেও শিকার হয়ে গিয়েছিল। কামনার এক বর্শা দিয়ে তাকে শিকার করে গিয়েছিল মেহেলী। লোহার বর্শা দিয়ে একবার আঘাত করা যায়, দুবার আঘাত করা যায়, কিন্তু মেহেলী তার নগ্ন নারীদেহের রূপ দিয়ে, তার নির্বাক আত্মসমর্পণ দিয়ে অহরহ তার দেহমনকে আঘাত দিয়ে চলেছে। আঘাতে আঘাতে মেহেলী হয়তো বিকল করে দিয়ে গিয়েছে সেঙাই-এর অস্ফুট পাহাড়ী চেতনা।
এখানে কয়েক দিন আগে সেই আশ্চর্য বিকেলে একটা অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিল কি সেঙাই? এই পাহাড়ে, এই বনভূমিতে মেহেলী নামে কি কোনো নারীর অস্তিত্বই ছিল না?
তা হতে পারে না। মেহেলী আছে। আর সবচেয়ে যেটা নির্মম সত্য সেটা সেঙাইর স্নায়ুমণ্ডলীতে ঝড়ের মতো তাণ্ডব শুরু করে দিয়েছে এই মুহূর্তে। মেহেলীকে তার চাই। তার প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে, প্রতিটি উদগ্র রক্তকণা দিয়ে সে আস্বাদ নেবে মেহেলীর রমণীয় দেহের। একটা অবরুদ্ধ গোঙানির মতো আওয়াজ সেঙাই-এর গলা বেয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, গোঁ-ও–ও–ও–ও–
মুখখানা ভয়ানক হয়ে উঠেছে সেঙাইর। ছোট ছোট পিঙ্গল চোখ দুটো জ্বলতে শুরু করেছে।
মাঝখানে কয়েকটা দিন জা কুলি উৎসব নিয়ে মেতে ছিল তাদের ছোট্ট গ্রাম। অতিরিক্ত উল্লাসে আর রোহি মধুর তীব্র মাদক নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিল সেঙাই। উত্তর পাহাড়ের মেহেলী নামে এক পাহাড়ী যৌবনের কামনা জা কুলি উৎসবের আমোদ আর রেঙকিলানের অপমৃত্যুর নিচে হারিয়ে গিয়েছিল। আজ ফসলকাটা আবাদী জমি পোড়াতে পোড়াতে আবার নতুন করে মেহেলীর কথা মনে পড়েছে তার।
সেই প্রথম দেখার রাতেই মোরাঙ থেকে মেহেলীর সন্ধানে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল সেঙাই। হিমার্ত রাত্রি সেদিন তাকে বাধা দিয়েছে। কিন্তু আজ? আজ কোনো অসুবিধা নেই, প্রকৃতি আজ তার পক্ষে। আর মানুষের বাধা এলে বর্শার মুখে নির্মূল করে সে মেহেলী নামে এক যুবতীর কাছে পৌঁছুবে। পৌঁছুতেই হবে। আদিম পৃথিবী তার রক্তে রক্তে তুফান তুলেছে।
ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে সেঙাইর। মোটা মোটা ঠোঁট দুটো ফুলে ফুলে উঠতে শুরু করেছে। প্রচণ্ড আবেগে বুকের পেশীগুলো তরঙ্গিত হয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে আবার চনমনে চোখে তাকাল সেঙাই, যদি দেখা হয় মেহেলীর সঙ্গে। মেহেলী তো বলেছিল, সে রোজ এই নিরালা ঝরনার জলে স্নান করে যায়। এই ঝরনা তার বড় ভালো লাগে। তবে কেন সে আজ এল না? হতাশায় মনটা ভরে গেল সেঙাইর।
হঠাৎ কী ভেবে আর দাঁড়াল না সে। বর্শাটাকে হাতের থাবায় চেপে ধরে দুলতে দুলতে টিজু নদীর দিকে এগিয়ে গেল।
.
০৯.
সেদিন টিজু নদী পেরিয়ে একটা সম্বরের সন্ধানে সালুয়ালা গ্রামের সীমানায় চলে এসেছিল সেঙাই আর রেঙকিলান। আজ রেঙকিলান নেই সঙ্গে। সে একাই সালুয়ালাঙের কাছাকাছি চলে এল।
এখনও আকাশে বেলাশেষের খানিকটা ঝাপসা রং লেগে আছে। বনের ঘন ছায়ায় সালুয়ালা গ্রামের দু-একজন পাহাড়ী মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবার দেখে ফেললে আর রক্ষা থাকবে না। এখানে বন বেশি নিবিড় নয়। আশেপাশে কোনো নিরাপদ ঝোঁপও নেই। সন্ধ্যার অন্ধকার না নামা পর্যন্ত গ্রামে ঢোকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। পাহাড়ী জোয়ান সেঙাই অন্তত এটুকু বোঝে। আর যাই হোক, শত্রুদের বর্শায় হৃৎপিণ্ডটা তার চৌফালা হয়ে যাক এমন ইচ্ছা সেঙাই-এর নেই। সালয়ালা গ্রাম তার মুণ্ড নিয়ে নারকীয় উল্লাসে মেতে উঠবে, তার রক্ত দিয়ে মোরাঙের দেওয়ালে দেওয়ালে বীভৎস শিল্পকলা ফুটিয়ে তুলবে–ভাবতেও ইন্দ্রিয়গুলো অসাড় হয়ে এল তার।
চারিদিকে একবার সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকাল সেঙাই। সামনেই একটা জীমবো গাছ। ওটার বিশাল গুঁড়ির আড়াল চলে গেল সে। এখান থেকে সালুয়ালাঙ গ্রামখানা পরিষ্কার নজরে আসে। এ গ্রামে এর আগে কোনোদিনই ঢোকেনি সেঙাই।
