ক্রমশ কোলাহলটা তীব্র হয়ে উঠছে।
হঠাৎ কে যেন গেয়ে উঠল :
আনা এচাঙচো লোচো
সেনা হামবঙ ইসোনিল
সঙ্গে সঙ্গে উপত্যকার দিকে দিকে তার প্রতিধ্বনি হতে লাগল। অজস্র কণ্ঠে সুর জেগে উঠল। আর সেই ছন্দিত আর সুরেলা সঙ্গীত বাতাসে দোল খেতে খেতে উপত্যকার ওপর দিয়ে মালভূমির দিকে চলে গেল। তারপর সেখান থেকে হালকা আমেজের মতো দক্ষিণ পাহাড়ের চূড়ায় ভেসে গেল।
আনা এচাঙচা লোচো,
রেচিঙ হামবঙ ইসোনিল।
আনা এচাঙচো লোচো,
ইজেম হামবঙ ইসোনিল।
ফসলের জমিটা এখন কালো হয়ে গিয়েছে। ধান আর জোয়ারের শস্যহীন অংশগুলোর ছাই বাতাসে উড়ে উড়ে বেড়াতে শুরু করেছে। শীতের এই দুপুর, এই রোদ, পাহাড়ী জমিতে এই আগুনের উৎসব, আর এই গান–সব মিলিয়ে এক বিচিত্র আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে এই উপত্যকায়।
একসময় গান থামল। আগুন নিভল। ঝকঝকে রোদ ম্লান হল। আবাদী জমির দিকে দিকে ক্ষতের মতো ফুটে বেরুল কালো কালো চিহ্ন। আজকের মতো কাজ শেষ হল।
খেত থেকে উঠে সকলে আবার বনের প্রান্তে এসে দাঁড়াল। সকলের মুখে কণা কণা ঘাম ফুটে বেরিয়েছে। দু-একজন প্রতিবেশী একটি গ্রামের নাগাদের দেখাদেখি সারা গায়ে উল্কি এঁকেছিল। বুক-পেট, হাত-পিঠ, কপাল-গাল শরীরের প্রতিটি অংশে আদিম কারুকলা ফুটিয়ে তুলতে বিন্দুমাত্র কসুর করেনি। নানারকম ছবি। নরমুণ্ড, বুনো মোষের মাথা, হাতির দাঁত। মনের আনন্দে শিল্পী তার তুলি বুলিয়ে গিয়েছে। সেই উল্কিগুলোর ওপর দর দর করে ঘাম। নেমে আসছে।
কে একজন বলল, আসছে মাসে ফসল পাহারার জন্যে মাঠে মাঠে থে (জমির ঘর) তৈরি করতে হবে। তারপর ঝুম আবাদের জন্যে জঙ্গল পোড়াতে হবে। এবার খালি কাজ আর কাজ। একেবারে সেই নগদা উৎসব পর্যন্ত আর জিরোবার ফাঁক নেই।
ওঙলে বলল, কাজ তো জনমভোর আছেই। যেতে দে ও-সব কথা। বস্তিতে ফিরবি তো। সব? আজ নাচগানের একটা ব্যবস্থা করলে মন্দ হয় না, কী বলিস সেঙাই?
উৎসাহিত হয়ে উঠল সেঙাই, খুব ভালো হবে। চল বস্তিতে। জোরি কেসুঙে নাচগান হবে আজ। রাজি তো? কি রে সারুয়ামারু, তোর বাড়ির উঠোনে?
সারুয়ামারু ভারি ফুর্তিবাজ। খুশির গলায় সায় দিল সে, নিশ্চয়ই।
হো-ও-ও-ও–ও-সবাই হই হই করে উঠল।
ওঙলে বলল, তোর বাড়ির উঠোনে নাচগান হবে। রোহি মধু আর শুয়োরের মাংস খাওয়াতে হবে কিন্তু।
নিশ্চয়ই খাওয়াব।
হো-ও-ও-ও–
উপত্যকার চাষের জমি থেকে নিবিড় বনের মধ্যে ঢুকল সবাই। নাচগান, তার সঙ্গে বাঁশের পানপাত্র ভরে রোহি মধু আর শুয়োরের মাংস। সকলে হল্লা শুরু করে দিয়েছে। তাদের চিৎকারে সন্ত্রস্ত হয়ে উড়ে যাচ্ছে গুটসুঙ পাখির ঝাঁক। আখুশু ঝোঁপের ফাঁকে ফাঁকে হরিণের শিঙ আর ময়ালের মাথা চকিতে দেখা দিয়েই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। খারিমা পতঙ্গের দল আতঙ্কে ঠকঠক শব্দ করছে।
পৃথিবীর প্রাণশক্তির আদিম সুশ্যাম প্রকাশ এই নিবিড় অরণ্যে। সেই প্রাণশক্তি এই নাগা পাহাড়ে দুর্দম, দুর্বার। যেখানে একটুকু ফাঁক পেয়েছে সেখানেই এক জৈব প্রেরণায় মাথা তুলেছে শ্যামাভ অঙ্কুর। সেই অঙ্কুরই একটু একটু করে শাখা বিস্তার করেছে, পাতার জিভ দিয়ে রোদবৃষ্টির আসব শুষে শুষে একদিন বনস্পতি হয়ে উঠেছে। তারপর নাগা পাহাড়ের ধমনীর ওপর গুরুভার অস্বস্তির মতো চেপে বসেছে। তার তলায় বিছিয়েছে হিমছায়া। সে ছায়ায় হিংস্র শাপদের অবাধ লীলাভূমি এই ভীষণ অরণ্য। তাদের ওপর প্রভুত্বের অধিকারে এসেছে মানুষ। ভয়ঙ্কর আর এক প্রাণশক্তির প্রকাশ। অতিকায় কুড়ালের ফলায় অরণ্য সংহার করে বানিয়েছে জনপদ। বর্শার মুখে মুখে হিংস্র জন্তুদের নির্মূল করে তার অধিকারের সীমানা প্রসারিত করে চলেছে। দূরে দূরে ছোট ছোট গ্রাম নজরে আসে। নিচু নিচু ঘর, খড়ের চাল, বাঁশের দেওয়াল। মোটা মোটা খাটসঙ গাছের ডালেও অনেক ঘর। এই বন থেকে যতটুকু সুবিধা পাওয়া যায়, সবটুকু আদায় করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি মানুষেরা। মাঝে মাঝে বাঘনখের আঁচড়ের মতো ফালি ফালি পথ। অবিরাম চলতে চলতে পথগুলো আপনা থেকেই তৈরি হয়েছে। এদের পেছনে কোনো সতর্ক অধ্যবসায়ের ইতিহাস নেই।
বনবাদাড় ডলে মুচড়ে দুলতে দুলতে এগিয়ে চলেছে পাহাড়ী মানুষগুলো। চড়াই বেয়ে ওপরের দিকে উঠছে তারা। হাতের মুঠিতে বর্শার ফলাগুলো দোল খেয়ে চলেছে।
হো-ও-ও-ও–ও–
আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল সেঙাই। তার দৃষ্টিটা গিয়ে পড়েছে উত্তর পাহাড়ের চড়াইয়ের দিকে। বিকালের শেষ রোদ ঢলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সেখানে। হঠাৎ কয়েক দিন আগের একটা বিকেল স্মৃতিতে ফুটে উঠল। সেদিন শিকারে বেরিয়েছিল সে আর রেঙকিলান। সেদিন ওই উত্তর পাহাড়ের এক নিঝুম ঝরনার পাশে এক নগ্ন নারীতনুর রেখায় রেখায় এক অনাস্বাদিত পৃথিবীর আমন্ত্রণ সে পেয়েছিল। টিজু নদী পার হয়ে পোকরি বংশের মেয়ে মেহেলী এসেছিল এপারের ঝরনার জলে ধারাস্নানে। মেহেলী পোকরি বংশের মেয়ে, তাদের শত্রুপক্ষ। তার ঠাকুরদা জেভেথাঙের মুণ্ডু ওরা ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছিল অনেক কাল আগে। বুড়ো খাপেগা মোরাঙে বসে সে গল্প তার কাছে বলেছে। কিন্তু মেহেলী! বিকেলের মায়াবী আলোতে নিঃশব্দ ঝরনার পাশে এক নগ্ন নারীতনু। আদিম মানবী। সেঙাই-এর রক্তে রক্তে কেমন একটা বিভ্রান্তি চমক দিয়ে উঠল। সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলীতে কামনা বর্শামুখের মতো ঝিলিক দিল।
