আশেপাশের কেসুঙ থেকে অর্ধ-উলঙ্গ মেয়েপুরুষের মিছিল নেমে এল জোহেরি কেসুঙে। বুড়ি বেঙসানুর চারপাশে অনেকগুলো কৌতূহলী কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কি লো, কী হল আবার? সেঙাইর বিয়ে? বেশ তো।
বিয়ের ভোজে সম্বরের মাংস খাওয়াতে হবে কিন্তু।
ওরে শয়তানের বাচ্চারা, ওরে টেফঙের বাচ্চারা, ভোেজ গিলতে এসেছিস? ভাগ, ভাগ। ইজাহান্টসা সালো। বুড়ি বেঙসানু একটানা চিৎকার করে চলল, ভোজ খাবে সব! খাবি খাবি, হুই সেঙাইর মাংস দিয়ে ভোজ খাবি। ওর ঠাকুরদা নিতিৎসুর জন্যে মরেছে। ও আবার যাবে মেহেলীকে আনতে। হুই পোকরি বংশের মাগী! ঠিক মরবে শয়তানটা। তখন ওর মাংস দিয়ে ওর বিয়ের ভোজ খাস।
আচমকা বাইরের ঘর থেকে একটা বর্শা উল্কাবেগে বেরিয়ে এল। আর এসে গেথে গেল বুড়ি বেঙসানুর কোমরের ওপর। আর্তনাদ করে পাথরের ওপর লুটিয়ে পড়ল সে। খানিকটা লাল টকটকে রক্ত ফিনকি দিয়ে কেসুঙটাকে ভিজিয়ে দিল।
বাইরের ঘরে একটি উত্তেজিত কণ্ঠস্বর গর্জন করে চলল সমানে। সেঙাই চেঁচাচ্ছে, দেখিস বুড়ি শয়তানী, হুই মেহেলীকে আমি বিয়ে করতে পারি কিনা। আমি জেভেথাঙের মতো মাগী না, কুত্তা না। দেখিস–
.
০৮.
শীতের মাঝামাঝি জা কুলি উৎসব শেষ হল ছোট্ট পাহাড়ী গ্রাম কেলুরিতে। এই মাসটাকে পাহাড়ী মানুষেরা বলে জা কুলি সু।
শীতের প্রথম দিকে জমিগুলোকে রিক্ত করে ফসল উঠেছিল। সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে নিচের দিকে নেমে গিয়েছে আবাদের খেত। নীরস পাথরের ওপর যেখানেই একটু মাটি রয়েছে সেখান থেকেই ফসলেরা লক্ষ শিকড় বিস্তার করে প্রাণরস শুষে নেয়। শীতের প্রথম দিকে শস্য উঠে যাবার পর খেতগুলো অনাবৃত আকাশের নিচে পড়ে পড়ে রোদ পোহায়। সূর্যের উত্তাপে সোনালি খড় শুকিয়ে বারুদের মতো হয়ে থাকে। জোয়ারের শস্যহীন গোড়াগুলো তীক্ষ্ণধার হয়ে যায়। জমির ফাটলের মুখ থেকে লকলকিয়ে ওঠে পাহাড়ী ঘাসের অঙ্কুর। উঁকি দেয় বুনো লতার আশ্চর্য সবুজ মাথা।
প্রথম শীতের ফসলবতী জমি মাঘের এই হিমাক্ত দুপুরে অদ্ভুত রকমের হতশ্রী। দিকে দিকে তার শ্মশান-শয্যা যেন বিকীর্ণ হয়ে রয়েছে।
দক্ষিণ পাহাড়ের এই উপত্যকা অনেকটা সমতল। জমিগুলো বিশাল একটা ঢেউ-এর মতো দোল খেয়ে খেয়ে দূরের মালভূমিতে গিয়ে মিশেছে।
সামনের ঘন বন ছুঁড়ে ফসলের খেতে এসে দাঁড়াল অনেকগুলো মানুষ। নারী আর পুরুষ, দুই-ই রয়েছে তাদের মধ্যে। কেউ কেউ একেবারেই উলঙ্গ, আর কারো দেহে খুব অল্প আচ্ছাদন।
সামনের দিকে রয়েছে সেঙাই, ওঙলে, পিঙলেই, এমনি আরো কয়েকজন। সকলের মুঠিতে পেন্য কাঠের জ্বলন্ত মশাল। কেউ কেউ বর্শাও নিয়ে এসেছে। এদিকে সেদিকে ঘুরছে পোষা শুয়োর। গোটাকয়েক বিচিত্র রঙের শিকারি কুকুরও এসেছে সেঙাইদের সঙ্গে।
শীতের আকাশ থেকে নরম রোদ নেমে এসেছে। উপত্যকার ওপর দুপুরটা যেন রোহি মধুর নেশার মতো ঝিম মেরে আছে।
সেঙাই বলল, জা কুলির পরবে এবার তেমন আনন্দ হল না।
সকলেই মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিল।
কানের লতিতে চাকার মতো একজোড়া পেতলের এসে দুল নেড়ে একটি মেয়ে বলল, হু-হু, এবার রেঙকিলানটা নেই। বড় ফুর্তিবাজ ছেলে ছিল সে।
সকলেই সমস্বরে সায় দিল, হু-হু, ঠিক কথা। তির্যক চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ছিল সেঙাই, কি লো হেজালি, রেঙকিলানের জন্যে দেখি পরান উথলপাথল করছে। তলায় তলায়। পিরিত জমিয়েছিলি নাকি?
হেজালি ফোঁস করে উঠল, আমার অমন মরদের দরকার নেই। একটা মাগী তো ছিল রেঙকিলানের। ঘরে যার বউ ছিল, আমি কেন তার সঙ্গে পিরিত করতে যাব? ওই সব মাগী চাখা মরদে আমার চলবে না। আমার টাটকা জোয়ান নাগর চাই।
টাটকা জোয়ান নাগর তোর জন্যে একেবারে আকাশ থেকে লাফিয়ে নামবে! কুৎসিত ভঙ্গি করে বলল সেঙাই।
হেজালি ফণা তুলল যেন, একটা মানুষ ছিল, তার কথা বলেছি। সে তোর আমার, সকলের ছিল লাগোয়া (খেতের সঙ্গী)। ফের হুই পিরিতের কথা যদি বলবি, বর্শা দিয়ে তোর মুখখানা এফোঁড় ওফোঁড় করে দেব।
কী বললি? হুমকে উঠল সেঙাই।
এবার কোনো উত্তর দিল না হেজালি।
পিঙলেই বলল, থাম তোরা। এদিকে মশাল যে নিবে গেল। আয়, খেতে ফসলের গোড়া পুড়িয়ে সাফ করতে হবে। তারপর জোয়ারের দানা পুঁততে হবে। খামোখা ঝগড়া করছিস কেন?
সকলে খেতের মধ্যে নেমে এল। তারপর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কুকুরগুলো স্বাধীন আনন্দে উপত্যকার ওপর ছোটাছুটি করে বেড়াতে লাগল। ফসল কেটে নেবার পর ধানের যে গোড়াগুলো রয়েছে তার মধ্যে মুখ গুঁজে খুঁজে শুয়োরগুলো দু-এক কণা শস্যের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরতে শুরু করেছে।
বাঁশের টুকরো পুঁতে জমির সীমানা ঠিক করা রয়েছে। যে যার সীমানায় নেমে গিয়েছে। যাদের মশাল নিবে গিয়েছিল তারা আবার সঙ্গীদের মশাল থেকে নতুন করে আগুন ধরিয়ে নিয়েছে।
হো-ও-ও-ও–ও–
খুনোর (আবাদী জমি) দিকে দিকে আগুন জ্বলে উঠল। ধান আর জোয়ারের শস্যহীন অংশগুলো শুকিয়ে শুকিয়ে উন্মুখ হয়ে ছিল। মশালের ছোঁয়ায় সেগুলো দাবানল হয়ে জ্বলে উঠল। ফসলের খেতে মধ্যশীতের এই দুপুরে চিতাশয্যা রচিত হল।
হো-ও-ও-ও–ও–
আকাশের দিকে দিকে উঠে যাচ্ছে পাহাড়ী জোয়ান-জোয়ানীর উল্লসিত শোরগোল। উঠে যাচ্ছে লিকলিকে আগুনের শিখা আর রাশি রাশি ধোঁয়া।
হো-ও-ও-ও–ও—
