তা আমি কী করে জানব?
চল, দেখলে বুঝতে পারবি।
এখনই বল, নইলে ভালো লাগছে না আমার। আপোটিয়া। বিন্দু বিন্দু বিরক্তি ঝরে পড়ল ওঙলের কণ্ঠ থেকে, যা বলবি, মন সাফ করে বলবি। তা নয়, পরে জানবি! তুই যেন কেমন ধারা হয়ে যাচ্ছিস সেঙাই!
বুড়ি বেঙসানু বাইরের ঘরে বসে বেতের আখুতসা (চাল রাখার পাত্র) বুনছিল। দু’পাশ থেকে দু’টি কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো তাকে চেপে ধরেছে ফাসাও আর নজলি। তার নাতি নাতনি।
সেঙাই আর ওঙলে বাইরের ঘরে চলে এল। সেঙাইদের দেখে কল কল করে উঠল ফাসাও আর নজলি। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের ঘাড়ের ওপর।
ফাসাও বলল, দাদা, আমাকে এবার জা কুলি গেন্নার দিনে একটা খুলি (বাঁশি) দিবি?
নজলি বলল, আমাকে কিন্তু খুঙ বানিয়ে দিতে হবে। দিবি তো?
দেব দেব। এবার সরে বোস হুই দিকে।
কাঁধের ওপর থেকে ফাসাওদের ঝেড়ে ফেলল সেঙাই আর ওঙলে।
বুড়ি বেঙসানু বলল, কি রে সেঙাই, তোর পাত্তাই নেই। তোর বাপ সিজিটো শয়তানটা সেই যে কোহিমা গেছে, ঘরে ফেরার আর নাম নেই। ওরে শয়তানের বাচ্চা, ঘরে এক ফোঁটা নিমক নেই। একবার তোকে কোহিমায় যেতে হবে। নইলে নিমক ছাড়া ভাত গিলবি কী করে?
থাম, থাম ঠাকুমা। নিমক আনতে আমি পারব না। চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে বেরুল সেঙাইর, হরিণের ছাল, মোষের শিং, বাঘের দাঁত হুই সারুয়ামারুকে দিয়ে দিস। সে নিমক এনে দেবে।
না না, ওর হাতের নিমক খাব না। শয়তানের বাচ্চা সূর্যের নামে যা তা বলেছে সেদিন। বুড়ি বেঙসানু হেজে যাওয়া চুলগুলো ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলল, ওকে সেদিন বর্শা দিয়ে কুঁড়লে শান্তি হত। ও হল আস্ত শয়তানের বাচ্চা
বুড়ি বেঙসানুর মুখ থেকে শীতের এই হিমাক্ত সকালে কদর্য গালাগালি বেরিয়ে এল। গর্জন করে উঠল সেঙাই, থাম বলছি বুড়ি মাগী, নইলে গলা টিপে ধরব। আগে খেতে দে। বড় খিদে পেয়েছে।
এখনও থামেনি বুড়ি বেঙসানু। জল তালে সমানে বকবক করে চলেছে। আচমকা বাঁশের দেওয়াল থেকে একটা বর্শা টেনে বার করল সেঙাই, তারপর সমস্ত কেসুঙটাকে কাঁপিয়ে হুমকে উঠল, থামলি, থামলি! নইলে বর্শা দিয়ে তোকে আজ ফালা ফালা করব। থাম শয়তানী।
নিমেষে বুড়ি বেঙসানুর জিভের বাজনা থেমে গেল। দ্রুত শীর্ণ হাতের মুঠি থেকে অসমাপ্ত বেতের আখুতসাখানা নামিয়ে রেখে ভেতর দিকের ঘরে চলে গেল। একটু পরেই একটা কাঠের বাসনে খানিকটা ঝলসানো বুনো মোষের মাংস আর বাঁশের পানপাত্রে খানিকটা রোহি এনে নামিয়ে রাখল সেঙাইদের সামনে। তারপর অস্ফুট গলায় তর্জন করে উঠল, আপোটিয়া, আপোটিয়া (মর-মর)–
পুরোপুরি ঝলসানো নয়, কঁচা কাঁচা সেই অর্ধদগ্ধ মাংস লাল দাঁতের পাটির ফাঁকে ফেলে পরিত্রাহি চিবোতে লাগল সেঙাই আর ওঙলে। মাঝে মাঝে দু-এক চুমুক রোহি মধু গিলে রসনাকে বেশ তরিজুত করে রাখতে লাগল।
মেজাজটা এবার অনেকখানি প্রসন্ন হয়েছে। সেঙাই বলল, তোর সঙ্গে একটা কথা বলতে এলাম ঠাকুমা।
কী কথা রে টেফঙের বাচ্চা? রক্তচোখে তাকাল বুড়ি বেঙসানু।
আমি বিয়ে করব। আমার একটা বউ চাই। না হলে রাত্তিরে মোরাঙে একা একা ঘুম আসে না। বড় বড় গজদাঁতের ফাঁকে একটা মোটা হাড়কে কায়দা করতে করতে বলল সেঙাই।
ইতিমধ্যে আবার বেতের আখুতসাটা হাতের মুঠিতে তুলে নিয়েছে বুড়ি বেঙসানু, বিয়ে করবি, সে তো ভালো কথা। তোর বাপ কোহিমা থেকে আসুক। তারপর তোর শ্বশুরকে টেনেন্যু মিঙ্গেলু (কন্যাগণ) পাঠিয়ে দেব।
আমার বউ কে? শ্বশুর কে?
অনেক ছোটবেলা থেকে তোর বউ ঠিক হয়ে আছে। থেমাকেডিমা বস্তির মেয়ে লেটিনোকটাঙের সঙ্গে তোর বিয়ে হবে। ওদের বংশও বেশ বনেদি। নগুসেরি বংশ। আর তোর শ্বশুরের নাম হল সাঞ্চামবাতা। কি রে, খুশি তো? দু’টি ধূসর চোখের মণিতে কৌতুকের আলো জ্বালিয়ে তাকাল বুড়ি বেঙসানু, বউ এলে আর একা একা থাকতে হবে না। তোর বাপ কোহিমা থেকে ফিরলেই তোর বিয়ে দেব।
আচমকা এই বাইরের ঘরটা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সেঙাই, না না, হুই লেনটিনোকটাঙকে আমি বিয়ে করব না। এই বস্তিতে থেমাকেডিমা বস্তির কেউ এলে একেবারে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে মারব। খুব সাবধান।
শঙ্কার কয়েকটি রেখা ফুটল বুড়ি বেঙসানুর মুখেচোখে, লেনটিনোকটাঙকে বিয়ে করবি না তো, কাকে বিয়ে করবি?
মেহেলীকে বিয়ে করব।
মেহেলী আবার কে?
ওঙলে বলল, সালুয়ালাঙ বস্তির মেয়ে। ওদের বংশ হল পোকরি।
ধক করে একটা মশালের মতো জ্বলে উঠল বুড়ি বেঙসানু, ও, সেই নিতিৎসুদের বংশ! সেঙাই-এর ঠাকুরদাকে যারা মেরেছে তাদের মেয়ে? কি রে ওঙলে শয়তান?
হু-হু– মাথা নাড়ল ওঙলে।
দেখব কত বড় তাগদ সেঙাই-এর। হুই বংশের মেয়ে কেড়ে আনতে গিয়ে মরেছে আমার সোয়ামী। তার নাতির আবার শখ হয়েছে। নির্ঘাৎ মরবে সেঙাই রামখোটা। বুড়ি বেঙসানু তারস্বর চিৎকারে জোহেরি কেসুঙের সকালটাকে ছত্রখান করে ফেলল।
বর্শার খোঁচা লেগে যেমন করে বুনো মোষ ফুঁসে ওঠে, ঠিক তেমন করেই ফুঁসছিল সেঙাই। লাল লাল দু’পাটি দাঁত তার কড়মড় করে উঠল, তুই দেখিস বুড়ি মাগী, আমি তোর সোয়ামী । জেভেথাঙ না। আমি সেঙাই। হুই পোকরি বংশের মেহেলীকে লড়াই করে এনে আমি বিয়ে করব। হু-হু।
দৌড়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল বুড়ি বেঙসানু। চারিদিকে ঘুরে ঘুরে সে চিৎকার করতে লাগল, এই সারুয়ামারু, এই নড্রিলো, এই গ্যিহেনি, এই ইটিভেন, তোরা সব শোন। টেফঙের বাচ্চা হুই সেঙাই পোকরি বংশের মেয়ে মেহেলীকে কেড়ে এনে বিয়ে করবে। শোন তোরা, শয়তানের মদ্দানির কথাটা শোন।
