বলে কী সালুনারু! বিশ্বাসঘাতকতা করছে না তো কান দুটো! রেজু আনিজার কাছে এ তো কদর্য অপরাধ। জঘন্য পাপাঁচরণ। দেহমন অশুচি করে শিকারে গিয়ে যে অন্যায় করেছে। রেঙকিলান, তাতে সমস্ত নাগা পাহাড় রেজুর ক্রোধাগ্নিতে ছারখার হয়ে যাবে না? খাপেগা তাকাল বুড়ি বেঙসানুর দিকে। বুড়ি বেঙসানু নির্নিমেষে সালুনারুর দিকেই তাকিয়ে ছিল। হয়তো ভাবছিল কোত্থেকে পাহাড়ী মেয়ে সালুনারু এতখানি দুঃসাহস সঞ্চয় করল! রেজু আনিজা তার স্বামীকে খাদের মধ্যে ফেলে দিয়ে পাপের শাস্তি দিয়েছে। পাহাড়ের টিলায় টিলায় ঘা খেতে খেতে অতলে গিয়ে তিলে তিলে মরেছে রেঙকিলান। তবু সালুনারু এতখানি তেজ পেল কোত্থেকে?
সালুনারুর গলায় নীল শিরাগুলি ফুলে ফুলে উঠছে। পিঙ্গল চোখ দু’টি ধকধক করছে। আর সমানে গালাগাল দিয়ে চলেছে সে।
আচমকা সেঙাই-এর হাত থেকে বর্শাটা কেড়ে নিল বুড়ো খাপেগা। তারপর বিদ্যুৎ ঝিলিকের মতো আকাশের দিকে উঠে গেল তার হাতখানা। গলাটা চাপা হুঙ্কারে গমগম করে উঠল, এই শয়তানী বস্তিতে থাকলে বস্তি জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। ওর রক্ত দিয়েই রেজু আনিজার রাগ কমাব।
বর্শাটা আকাশের দিকেই রয়ে গেল। বুড়ো খাপেগা সেটা ছোঁড়ার আগেই পাশের খাসেম ঝোপে লাফিয়ে পড়ল সালুনারু। সেখান থেকে দূরন্ত গতিতে একটি উলঙ্গ নারীদেহ উপত্যকার ঘন বনে অদৃশ্য হয়ে গেল।
চিৎকার করে উঠল বুড়ি বেঙসানু, ধর সেঙাই, শয়তানীকে ধর। বর্শা দিয়ে ফোড়। সাবাড় করে ফেল।
নিশ্চল শিলামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে সেঙাই। একেবারেই নিস্পন্দ সে। এতটুকু চাঞ্চল্য নেই তার সারা দেহে। নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাকিয়েই আছে উপত্যকার দিকে। ওই। দিকেই ঘন বনের মধ্যে সালুনারুর নগ্ন দেহটা মিলিয়ে গিয়েছে।
বর্শাটা নামিয়ে বুড়ো খাপেগা হুমকে ওঠে, আচ্ছা মাগী, একবার বস্তিতে এসে দেখিস, টুকরো টুকরো করে কাটব।
খাপেগার ঘোলাটে চোখ দু’টি দপদপ জ্বলতে লাগল।
.
০৭.
আর কয়েকদিন পরেই জা কুলি উৎসব শুরু হবে পাহাড়ী জনপদগুলোতে। তারই প্রস্তুতি চলছে কেলুরি গ্রামে। গানবাজনা হবে, মোষ বলি দিয়ে সারা গ্রামের লোক ভোজ খাবে। খুশিতে, হুল্লোড়ে, রোহি মধুর মৌতাতে, নাচগানের মধুর নেশায় পাহাড়ী মানুষগুলো মাতাল হয়ে যাবে। জা কুলি উৎসবের দিনরাত্রি, প্রতিটি মুহূর্ত এই পাহাড় ঝুঁদ হয়ে থাকবে।
কাল রাতে উত্তরের পাহাড়চূড়া ঘিরে বরফ পড়েছিল। ঘন সবুজ চক্ররেখার ওপর তুষারের সাদা একটা স্তর এখনও স্থির হয়ে রয়েছে। তার ওপর এসে পড়েছে সোনালি রোদ।
মোরাঙের বাঁশের মাচানে শুয়ে শুয়ে উত্তরের পাহাড়চূড়া দেখতে দেখতে সেঙাই-এর মনে আমেজ ঘন হয়। জা কুলি মাসে এখন অখণ্ড অবসর। শুয়ে শুয়ে মধুর আলস্যে দিনগুলো এই পাহাড়ী জনপদের ওপর দিয়ে খুশির মিছিল হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে।
উত্তর পাহাড়ের বরফ দেখতে দেখতে মেহেলীর কথা মনে পড়ে সেঙাই-এর। বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যায়। দ্রুত বাঁশের মাচানের ওপর উঠে বসল সেঙাই। মেহেলী তার বন্য পাহাড়ী মনকে দিনরাত উথলপাথল করছে, তার আধফোঁটা চেতনাকে অস্থির করে দিচ্ছে। বার বার।
ইতিমধ্যে পাশের মাচান থেকে উঠে এসেছে ওঙলে। সারা গায়ে দড়ির লেপ জড়ানো। ওঙলে বলল, কিরে সেঙাই, কী করছিস?
মেহেলীর কথা ভাবছি। সালুয়ালাঙের হুই ছুঁড়িটার জন্যে মনটা কেমন জানি করে।
এর আগেই ওঙলেকে মেহেলীর কথা বলেছে সেঙাই।
হু-হু–বুঝতে পেরেছি। ওঙলের মুখখানা গম্ভীর হল, পিরিতে পড়েছিস। কিন্তু মোরাঙে বসে এসব কথা বলা ঠিক নয়। সদ্দারের কানে গেলে মুশকিলে পড়ব।
ঠিক বলেছিস, কিন্তু হুই শয়তানীর জন্যে মনটা বেসামাল হয়ে গেছে। কী করা যায় বল তো? একটা বুদ্ধি বাতলে দে। আরো দু-তিন দিন গেলাম হুই ঝরনাটার কাছে, কিন্তু ছুঁড়িটা আজকাল আর আসে না। মন ভীষণ খারাপ হয়ে রয়েছে ওঙলে। গলাটা ব্যাজার শোনায় সেঙাই-এর।
চল, এখন বাইরে চল। বাঁশ কাটতে যাব নদীর কিনারে। আর কদিন পরেই জা কুলির গেন্না শুরু হবে। খুলি (বাঁশি) বানানো দরকার।
বাঁশের মাচান থেকে নিচে নামল সেঙাই। দড়ির লেপটা সারা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে মোরাঙের বাইরে চলে এল।
সূর্যটা পুবের পাহাড়ের ওপর আরো স্পষ্ট হয়েছে। তার সোনালি আলোতে এখন কমলা রঙের আভাস দেখা দিয়েছে। দূরের কেসুঙে কেসুঙে, পাথরের চত্বরে বসে মেয়েরা লেপ বুনছে, জঙগুপি কাপড়ে রং দিচ্ছে, কেউ কেউ হরিণের ছাল ছাড়াচ্ছে ছুরি দিয়ে।
ইতিমধ্যে আরো কয়েকটি জোয়ান ছেলে বেরিয়ে এসেছে মোরাঙ থেকে। তাদের মধ্যে একজন বলল, কি রে সেঙাই, কোথায় যাচ্ছিস?
একটু ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করে আসি।
যা। আমরা নদীর কিনারে বাঁশ কাটতে যাচ্ছি। খুলি (বাঁশি) আর খুঙ (দোতারার মতো বাদ্যযন্ত্র বানাতে হবে। আর তো মোটে কয়েকটা দিন, তার পরেই জা কুলির গেন্না শুরু হবে।
তোরা যা। আমি আর ওঙলে একটু পরে যাচ্ছি। সেঙাই বলল।
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
হইহই করতে করতে টিজু নদীর দিকে চলে গেল জোয়ান ছেলেরা। তাদের মুঠিতে বর্শা রয়েছে, ঝকঝকে দা রয়েছে, তীরধনুক রয়েছে।
জোহেরি কেসুঙের দিকে আসতে আসতে ওঙলে বলল, কী ব্যাপার রে সেঙাই? ঘরে যাচ্ছিস যে!
হু-হু। গোলাকার কামানো মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে হাসল সেঙাই। লাল লাল অপরিষ্কার দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল তার, বল তো ওঙলে, কী জন্যে এলাম?
