বুড়ো খাপেগা বলল, তাই তো, এক কাজ কর। হুই খাদের মধ্যে তারা সবাই খুঁজতে শুরু কর। নিশ্চয়ই আশেপাশে কোথায়ও পড়ে আছে রেঙকিলান।
গ্রাম থেকে শুধু পুরুষরাই এসেছিল। সকলের হাতের থাবায় বিরাট বিরাট বর্শা। সেগুলোর ওপর শীতের সকালের রোদ এসে পড়েছে। ঝিকমিকিয়ে উঠছে ফলাগুলো। পুবের পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়ে মালভূমি আর উপত্যকার মধ্য দিয়ে দোল খেতে খেতে সোনালি রোদের ঢল নেমে গিয়েছে পশ্চিম পাহাড়ে। সেখান থেকে আছাড় খেয়ে পড়েছে উত্তর আর দক্ষিণের শৈলশিরে।
কী হবে বল তো সদ্দার?
ও সদ্দার, বড় ভয় করছে।
পাথরপেশী জোয়ান। পাহাড়ের চড়াই-উতরাই থেকে, উদ্দাম জলপ্রপাত থেকে, মালভূমি আর উপত্যকার দিগদিগন্ত থেকে তারা স্বাস্থ্য আহরণ করেছে। এই নিবিড় অরণ্য তাদের দুর্বার সাহস দিয়েছে। চিতার গর্জন থেকে, ডোরাদার বাঘের হুঙ্কার থেকে, ময়াল সাপের ক্রুর দৃষ্টি থেকে তারা পলে পলে সংগ্রামের অধিকার অর্জন করেছে। সর্দারের একটিমাত্র নির্দেশে তারা ছিঁড়ে আনতে পারে শত্রুর মুণ্ডু। বর্শা দিয়ে গেঁথে আনতে পারে দাঁতাল শুয়োরের পালকে। ভিন পাহাড়ের মানুষের হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে আঁজলা আঁজলা রক্ত হিংস্র উল্লাসে ছিটিয়ে দিতে পারে মোরাঙে। সেই রক্ত দিয়ে আঁকতে পারে আদিম পৃথিবীর শিল্পলেখা।
সেই সব জোয়ান পুরুষ, সেই সব পাহাড়ী মানুষ। এই মুহূর্তে তারা ভয় পেয়েছে। শঙ্কাতুর কণ্ঠগুলো তাদের ফিসফিস করছে অস্বাভাবিক আতঙ্কে, কী হবে সর্দার!
এমনকি কেলুরি গ্রামের প্রাচীন মানুষ খাপেগা পর্যন্ত ভয় পেয়েছে। সে বলল, আগে তো রেঙকিলানকে খুঁজে বার কর, তারপর বোঝা যাবে।
জোয়ান পুরুষগুলো দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল। গাছের ডাল ধরে ঝুলতে ঝুলতে অনেকে নেমে গেল গভীর খাদের মধ্যে। আর চড়াইটার মাথায় দাঁড়িয়ে রইল বুড়ো খাপেগা আর সেঙাই।
অনেকটা সময় কেটে গেল। উপত্যকার ওপর রোদের নরম সোনালি রং একটু একটু করে বদলে যেতে লাগল। এখন বনভূমির দিকে দিকে সবুজ আগুনের মতো সেটা লেলিহান হয়ে জ্বলতে শুরু করেছে।
একসময় অতল খাদ থেকে সারুয়ামারুর গলা ভেসে এল। দু’দিকের পাহাড়ে সে স্বর প্রতিধ্বনিত হতে হতে উঠে আসছে ওপরে, সদ্দার, পেয়েছি। এই তো এইখানে রেঙকিলান, একেবারে মরে কাঠ হয়ে আছে।
হো-ও-ও-ও—
গাছ বেয়ে বেয়ে নিচে নামতে লাগল জোয়ান ছেলেরা।
পাহাড়ী উতরাই-এর মাথা থেকে চিৎকার করে উঠল বুড়ো খাপেগা, খাবার, কেউ মড়া ঘূবি না।
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সেঙাই। তার দিকে তাকিয়ে খাপেগা বলল, একবার বস্তিতে যা। তোর ঠাকুমা আর সালুনারুকে এক্ষুনি এখানে নিয়ে আসবি। বেঙসানু অনেক কিছু জানে। সে যা বলবে তাই করব। শিগগির যা।
কিছুক্ষণ পর সালুনারু আর বুড়ি বেঙসানুকে সঙ্গে নিয়ে উতরাইয়ে চলে এল সেঙাই। দুজনেই অনাবৃত। রোদ আরো চড়ে উঠছে। প্রকৃতি তাদের উত্তাপ দিচ্ছে। কৃত্রিম আবরণের আর প্রয়োজন নেই।
বুড়ো খাপেগা বলল, রেঙকিলান হুই খাদের মধ্যে মরে পড়ে রয়েছে। এবার কী করতে হবে বেঙসানু?
এ ঠিক আনিজার কাজ। আমি আগেই বলেছিলাম। আমার ছোটবেলায় এই কেলুরি বস্তিতে যখন বউ হয়ে এলাম তখন তিনটে জোয়ানকে রেনজু আনিজা এমন করে সাবাড় করেছিল। হু-হু। বছর খানেক আগে নগুসেরি বংশের বুড়ো হিবুটাক রেঞ্জু আনিজার ডাকে মরেছিল। তোদের মনে নেই? এবার মরল রেঙকিলান। কেন যে আনিজার গোসা হল আমাদের বস্তির ওপর! একটু থামল বেঙসানু। অনেকটা চড়াই-উতরাই উজিয়ে এসেছে সে। শুকনো স্তনের তলায় বুকখানা দ্রুততালে উঠছে, নামছে। ঘন ঘন কয়েকটা নিশ্বাস ফেলে বেঙসানু আবার বলল, রেঞ্জু আনিজা রাত্তিরবেলা মানুষের নাম ধরে ডাকে, তারপর খাদের মধ্যে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়।
আড়ষ্ট চোখে তাকিয়ে ছিল সালুনারু। কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছে না সে, কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। চেতনা তার নিথর হয়ে গিয়েছে। ঠোঁট দু’টি থরথর করে কাঁপছে।
বুড়ি বেঙসানু বলতে লাগল, নিশ্চয়ই কিছু অন্যায় করেছিল রেঙকিলান। না হলে রেনজু আনিজার রাগ কেন তার ওপর পড়বে! কী করেছিল? কি লো সালুনারু, তুই জানিস?
বুকের ভেতরটা ধুকধুক করে উঠল সালুনারুর। আচমকা সে বলে ফেলল, কাল শিকারে যাবার আগে রাত্তিরে সে মোরাঙে শুতে যায়নি। আমার কাছেই শুয়েছিল। সকালে সেই কাপড়েই শিকারে চলে গেছে।
হা-আ-আ-আ–
জীর্ণ বুকখানার ওপর প্রচণ্ড একটা চাপড় মেরে আর্তনাদ করে উঠল বুড়ি বেঙসানু, কী সব্বনাশ! তুই মাগী এই বস্তিটাকে শেষ করবি। তোর জন্যে আমরা সব সাবাড় হয়ে যাব। মাগী, জানিস না, শিকারে যাওয়ার আগে সোয়ামীর সঙ্গে শুতে নেই? মাগীর ফুর্তি কত! হা-আ-আ-আ—
সদ্দার, ও সদ্দার–অতল খাদ থেকে জটিল বনের মধ্যে দিয়ে ধাক্কা খেতে খেতে ওপরের দিকে উঠে এল শব্দগুলো। খাদের তলা থেকে সারুয়ামারুরা ডাকাডাকি করছে।
দাঁড়া শয়তানের বাচ্চারা। গর্জে উঠল খাপেগা।
খিস্তির কৌটোর ঢাকনা খুলে গিয়েছে বুড়ি বেঙসানুর। বিধ্বস্ত দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠেছে তার। ঘোলাটে চোখ দুটো থেকে দু’টি অগ্নিপিণ্ড যেন ছিটকে আসতে চাইছে সালুনারুর দিকে। সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে বুড়ি বেঙসানু, ইজা হান্টসা সালো। মাগী শয়তানী!
এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল সালুনারু। এবার সে ফোঁস করে উঠল, বুড়ি মাগী, চুপ কর। ইজা রামখো! মরেছে, আমার সোয়ামী মরেছে। তোদের কী?
