বুড়ো খাপেগা বলল, এখানে তোরা কেউ রেঙকিলানকে দেখেছিস?
না। অনেকে একসঙ্গে বলে উঠল।
সেঙাই বলল, কী তাজ্জবের ব্যাপার, কাল বাইরের পাহাড় থেকে সালুনারুই তো তাকে ডেকে নিয়ে গেল।
আমি! সালুনারুর গলায় বিস্ময় চমক দিয়ে উঠল। সেই সঙ্গে মিশে রয়েছে এক ধরনের বিচিত্র ভয়ের অনুভূতি, আমি তো কাল সারাদিন ঘর থেকে বার হইনি। আমি আবার কখন গেলাম বাইরের পাহাড়ে!
নির্ঘাত তুই। আমরা তিনজনই তোর গলা শুনেছি। হুঙ্কার দিয়ে ওঠে সেঙাই।
ওঙলে বলল, কাল সন্ধের সময় যখন শিকার থেকে আমরা ফিরছিলাম, তখন হুই দক্ষিণের পাহাড়ে আসতে রেঙকিলানকে ডাকল সালুনারু। পিঙলেই, সেঙাই আর আমি সে ডাক শুনেছি। এর মধ্যে কোনো ভুল নেই।
পিঙলেই বলল, কাল রেঙকিলানের কী যেন হয়েছিল। চাল কি রোহি মধু কিছুই খায়নি। এমন যে সম্বরের মাংস, তাও ছোঁয়নি। আমরাই সব খেয়ে ফেলেছিলাম। আর কী জন্যে জানি খুব ভয় পেয়েছিল সে।
বুড়ো খাপেগা চোখের ওপর ঝুলে-আসা ভ্র দুটোকে টেনে তোলার চেষ্টা করল। তার সন্ত্রস্ত গলায় বলল, এ তো বড় তাজ্জবের ব্যাপার। কেলুরি বস্তি থেকে একটা আস্ত মানুষ একেবারে লোপাট হয়ে যাবে রাতারাতি! আমার মনে হচ্ছে, এ কাজ নির্ঘাত হুই সালুয়ালাঙ বস্তির শয়তানদের। তাই যদি হয়, ওদের ছাড়া হবে না। ঘোলাটে চোখ দুটো জ্বলে উঠতে চাইল খাপেগার। ভাঙাচোরা দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠল।
ওঙলে বলল, তা হতে পারে। কাল দুপুরে সেঙাই ওদের খোনকেকে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে এসেছিল। রেঙকিলানকে মেরে হয়তো তার শোধ তুলেছে।
আচমকা বুড়ো খাপেগা চিৎকার করে ওঠে। একটা দমকা বাতাসের আঘাতে সে যেন ফিরে গেল অনেকগুলো বছরের নেপথ্যে, তার যৌবনকালের বেপরোয়া দিনগুলোতে। তার চিৎকার এই কেলুরি গ্রামটাকে তটস্থ করে তুলল, হো–ও–ও-আ-আ–
হো-ও-ও-ও-য়া-আ-আ–
জোয়ান ছেলেদের গলায় গলায় খাপেগার চিৎকার তীব্র প্রতিধ্বনি তুলল। এমনকি সারুয়ামারুও সে চিৎকারে নিজের গলা মিলিয়েছে। দলপতির এই আদিম আহ্বানে সব পাহাড়ী মানুষই এক, অভিন্ন। এখানে কোনো বিভেদ নেই, মতান্তর নেই। একই হত্যার প্রতিজ্ঞা দিয়ে সকলে গ্রথিত।
আকাশ ফাটিয়ে গর্জে উঠল খাপেগা, সালুয়ালাঙ বস্তির তিনটে মাথা চাই। এই জোয়ানের বাচ্চারা, তিনদিনের মধ্যে আমাদের বস্তির তিনটে মোরাঙে ওদের তিনটে মাথা ঝোলাতেই হবে।
হো-ও-ও-ও-য়া-আ-আ—
এই নগণ্য পাহাড়ী জনপদ থেকে অজস্র কণ্ঠের হুঙ্কার টিজু নদীর দিকে ধেয়ে গেল।
একটু আগে সারুয়ামারুকে বর্শা দিয়ে গাঁথবার জন্য সকলে উত্তেজিত হয়ে ছিল। এই মুহূর্তে নতুন প্রসঙ্গ এসেছে। নতুন সংগ্রামের নির্দেশ এসেছে সর্দারের কাছ থেকে। সারুয়ামারুর কথা ভুলে গিয়েছে সকলে। এমনকি স্বয়ং সারুয়ামারু পর্যন্ত। জোরি কেসুঙ থেকে এবার সে নির্দ্বিধায় নেমে এসেছে নিচে, জোহেরি কেসুঙের পাষাণ চত্বরে। সকলের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দিয়েছে সে। এমন একটা ভয়াল মুহূর্তে সেও সবার সঙ্গে একাকার। একই শপথের কঠিন বন্ধনে বাঁধা।
এতক্ষণ বুড়ি বেঙসানু একপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। একটি কথাও বলেনি। হঠাৎ ভয়ার্ত শব্দ করে উঠল সে, আনিজা! রেজু আনিজা! রাত্তিরে অমন নাম ধরে ডেকে পাহাড়ের খাদে ফেলে দেয় মানুষকে।
আনিজা! চকিত হয়ে সকলে তাকাল বেঙসানুর দিকে।
বুড়ি বেঙসানু। অনেক বছরের অভিজ্ঞতা তার বলিরেখার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রয়েছে। সুপ্রাচীন একটা খাসেম গাছের মতো সে। তার রুক্ষ চুলে বহু ঝড়তুফানের স্বাক্ষর, তার শিরা স্নায়ু-অস্থি-মজ্জায় অনেক কাহিনী, অনেক ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে।
বুড়ি বেঙসানু ফের বলল, যা শুনলুম, তাতে মনে হচ্ছে সালুয়ালাঙের শত্তুরদের কাজ নয়। ছ, এ নির্ঘাত আনিজার কাজ।
আনিজা!
আনিজা!
এতক্ষণ সালুয়ালাঙ গ্রামখানা থেকে তিনটে মাথা কেটে আনার জন্য যারা তুমুল চিৎকার জুড়ে দিয়েছিল, ওই একটি নামের মাহাত্ম্যে তারা একেবারে কুঁকড়ে গিয়েছে। সকলের মুখেচোখে পাণ্ডুর ছায়া নেমে এসেছে। জীবন্ত পাহাড়ী মানুষগুলো মৃত্যুকে অনুভব করছে যেন। এক মারাত্মক শিহরন যেন রক্তের কণায় কণায় সঞ্চারিত হয়ে যাচ্ছে তাদের। আনিজা!
বুড়ো খাপেগা বুড়ি বেঙসানুর কাছাকাছি অনেকটা সরে এসেছে। ফিসফিস করে সে বলল, তা হলে কী করা যায়? তুই কী করতে বলিস বেঙসানু?
তোরা একবার বাইরের পাহাড়টা দেখে আয়। এখন দিনের বেলা, আনিজার ভয় নেই। যদি পেয়ে যাস, তবে মড়াটাকে দেখে আসবি। খবদ্দার হুঁবি না কেউ। ভালো করে খুঁজবি যা।
নীরবে সকলের ভাবগতিক লক্ষ করছিল সালুনারু। উৎকর্ণ হয়ে এতগুলো মানুষের কথা সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে যেন শুষে নিচ্ছিল। আচমকা পাহাড়ী জনপদের এই নিভৃত খাজে জোহেরি কেসুঙকে কাঁপিয়ে কাঁপয়ে আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল সে।
.
কিছুক্ষণ পর দক্ষিণ পাহাড়ের খাড়া উতরাই-এর কাছে এসে পড়েছে কেলুরি গ্রামের মানুষগুলো। অনেক নিচে গভীর খাদ। পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে, গাছপালা আর ঝোঁপঝাড়ের জটিল জাল বুনে বুনে সেই খাদের দিকে নেমে গিয়েছে উদ্দাম অরণ্য। ভয়াল অন্ধকার স্তব্ধ হয়ে রয়েছে সেখানে।
উতরাই-এর মাথায় দাঁড়িয়ে সেঙাই বলল, কাল এই দিকেই দৌড়ে এসেছিল রেঙকিলান। রাত্রিবেলা এখান থেকেই একটা গলার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম আমরা। রেঙকিলান বলেছিল, সালুনারু ডাকছে।
