বিচিত্র সব কাহিনী বলেছে পাদ্রী সাহেব। বিস্ময়কর সব গল্প। সেই গল্প থেকেই সারুয়ামারু জানতে পেরেছিল, সূর্য ওঠার আসল রহস্যটা কী। দিনরাত্রির নেপথ্যে কোন সত্যটা রয়েছে। একটু আগে সেই সত্য ফাঁস করতে গিয়ে রীতিমতো একটা খণ্ডযুদ্ধ আমন্ত্রণ করে এনেছে সে।
.
ইতিমধ্যে পাহাড়ী মানুষগুলো মুরগি নিয়ে এসেছে। প্রত্যেকের হাতের মুঠিতে একটা করে ধরা রয়েছে।
বেঙসানু বলল, আয় তোরা, বাড়ির সামনের দিকে আয়।
জোহেরি কেসুঙটা একটা নিচু দোচালা ঘর। সামনের দিকে খড়ের চাল অনেকটা প্রসারিত। রোদবৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য এই পদ্ধতিতে নাগাদের ঘর তৈরি করতে হয়। দু’দিকে বাঁশের দেওয়াল। সামনের দিকে গোলাকার বাঁশের দরজা। দরজার দু’পাশে লম্বা দুটো বর্শার মাথায় মোষের মুণ্ডু গেঁথে রাখা হয়েছে। ঘরের সামনের চত্বরে মোষ বলির হাড়িকাঠ। খাটসঙ গাছের কাঠ দিয়ে বানানো। পরিষ্কার বোঝা যায়, বাড়ির মালিকেরা জেসেসি ভোজ দিয়ে সমাজকে আর প্রিয়জনদের সন্তুষ্ট করতে পেরেছে।
মোষবলির হাড়িকাঠের ঠিক পাশেই গোলাকার একটা খয়েরি রঙের পাথর। এ পাথর অতি পবিত্র। এ পাথর ঘরের চারপাশ থেকে দুষ্ট প্রেতাত্মাকে হাজার পাহাড় ফারাকে নির্বাসিত করে রাখে। পাহাড়ী মানুষগুলোর তাই বিশ্বাস। এমন পাথর প্রতিটি বাড়ির সামনে সযত্নে রক্ষিত আছে।
সামনের পাথরটার কাছে এসে দাঁড়াল বুড়ি বেঙসানু। ইতিমধ্যে সমস্ত গ্রামটা এসে একেবারে মৌচাকের মতো জোহেরি কেসুঙে ভনভন করতে শুরু করেছে। প্রায় সকলেই অনাবৃত। দু-একজনের দেহে সামান্য আচ্ছাদন। তাদের নানা প্রশ্ন।
কী ব্যাপার?
কী হয়েছে?
আসলে যারা পরে এসেছে তারা কিছুই জানত না। মুরগি আনতে বলার জন্য তারা রীতিমতো চিন্তিত।
কী আবার হবে? কুৎসিত মুখভঙ্গি করে সমস্ত ঘটনাটা বলে গেল বুড়ি বেঙসানু, এবার সব যা। সূর্যের নামে মুরগি বলি দে। সূর্যকে সন্তুষ্ট কর। তা না হলে বস্তি সাবাড় হয়ে যাবে।
যারা পরে এসেছে তারা মুরগির সন্ধানে দিগ্বিদিকে দৌড়ে গেল। যারা মুরগি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে বুড়ি বেঙসানু বলল, তোরা দাঁড়িয়ে রইলি কেন? যার যার বাড়ির সামনে গিয়ে সূর্যের নামে বলি দে।
একে একে সবাই চলে গেল।
খানিকটা পর কতকগুলো নিরীহ পাখির গলা থেকে মরণকাতর চিৎকার বাতাসে ভেসে গেল। আর তাদের উষ্ণ রক্তের রং শীতের প্রভাতের লালিমার সঙ্গে মিশে যেতে থাকে। সেই সঙ্গে অনেকগুলো পাহাড়ী কণ্ঠ থেকে এক করুণ আর্তি, এক শঙ্কিত প্রার্থনা উঠে গেল আকাশের দিকে, সূর্য, তুমি এই বলি নিয়ে সন্তুষ্ট হও। এই বস্তির ওপর তোমার রাগ যেন না পড়ে।
আশ্চর্য! সারুয়ামারুও একটা মুরগি বলি দিয়েছে সূর্যের নামে। আর সকলের সঙ্গে একই প্রার্থনায় গলা মিলিয়েছে, সূর্য, তুমি এই বলি নিয়ে…
সূর্যের উদ্দেশে নিরীহ রক্তের উৎসর্গ শেষ হল।
এতক্ষণে দক্ষিণের পাহাড়চূড়া থেকে সাদা তুষারের আস্তরটা একেবারে মুছে গিয়েছে। একটু একটু করে জ্যোতির্ময় হচ্ছে সূর্য। উপত্যকায় তার উত্তাপ ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। চারপাশের পাহাড়গুলো আরো স্পষ্ট হচ্ছে। নিবিড় অরণ্য পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। অপরূপ রূপময় এই নাগা পাহাড়। মুহূর্তে মুহূর্তে তার রূপবদলের পালা। শীতের সকালের এই নাগা পাহাড়কে আশ্চর্য কমনীয় মনে হয়। তার সব নিষ্ঠুরতা রাত্রির হিমে মুছে একেবারে নির্মল হয়ে গিয়েছে যেন।
মুরগি বলি দিয়ে সকলে আবার ছুটে এসেছে বেঙসানুর কাছে। তাদের হাতে খারে বর্শার ফলা ঝলকাচ্ছে। একটু আগে একটা খণ্ডযুদ্ধের আভাস পেয়েছিল তারা। সারুয়ামারুকে বর্শায় কুঁড়ে ফেলার জন্য পাহাড়ী মানুষগুলো তুমুল শোরগোল শুরু করল। সে শোরগোল বিস্ফোরণের মতো আকাশের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
হো-ও-ও-ও-য়া-আ-আ—
হো-ও-ও-ওয়া-আ-আ—
বেঙসানু আবার নতুন উদ্যমে গালাগালি দিতে শুরু করেছে।
অফুরন্ত উৎসাহ। তার ভঁড়ারে অশ্রাব্য খিস্তির অন্ত নেই।
ওপরে জোরি কেসুঙে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারুয়ামারু। যেন নিষ্প্রাণ শিলামূর্তি। শুধু তার চোখদুটো অঙ্গারের মতো জ্বলছে। তার থাবাতেও মস্ত এক বর্শা। এই খণ্ডযুদ্ধের সম্ভাবনা তার ধমনীতেও রক্ত ফেনিয়ে তুলেছে। তার চেতনার মধ্যেও গর্জন করে উঠেছে আদিম হিংস্রতা।
সারুয়ামারুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তার বউ। নাম জামাতসু। উলঙ্গ তামাটে দেহ। শরীরের মধ্যদেশ অনেকটা স্ফীত হয়েছে। গর্ভধারণের পরিষ্কার ইঙ্গিত ছড়িয়ে রয়েছে চোখের কোলের কালো রেখায়, টসটসে স্তনচূড়ার কৃষ্ণাভায়। একটা লোহার মেরিকেতসু বাগিয়ে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সে।
সারুয়ামারু ও জামাতসু। আদিম মানব আর আদিম মানবী।
জোরি কেসুঙ থেকে মুরগির রক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে জোহেরি কেসুঙের ওপর। একটু আগে সূর্যের নামে নির্বিরোধ প্রাণীটাকে উৎসর্গ করেছিল সারুয়ামারু। সেই মুরগির রক্ত। টকটকে লাল। এখনও গোলাকার পাথরের ওপর আতামারী ফুলের মতো পড়ে রয়েছে নিহত পাখিটা।
হো-ও-ও-ও-য়া-য়া—
জোহেরি কেসুঙে শোরগোলটা আরো উদ্দাম হয়ে উঠছে।
কিছু একটা ঘটে যেত নির্ঘাত। তার আগেই ঘটল ঘটনাটা। বুড়ো খাপেগার সঙ্গে জোহেরি কেসুঙে এল সালুনারু। সালুনারু রেঙকিলানের বউ। তার পেছন পেছন এসেছে সেঙাই, ওঙলে, পিঙলেই। তাদের সঙ্গে তিনটে মোরাঙ থেকে অগুনতি অবিবাহিত জোয়ান এসে জোহেরি কেসুঙের চারপাশে গোল হয়ে ভিড় জমাল।
