তবু সংশয় ছিল পাহাড়ী মানুষ সারুয়ামারুর চোখে। শঙ্কিত দৃষ্টিতে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিল সে। হাতের মুঠোতে বর্শাটা শক্ত করে ধরা রয়েছে তার।
চারপাশে পাহাড়ী টিলায় ছোট ছোট সব বাড়ি। ঢেউটিনের চাল, প্ল্যাস্টারের দেওয়াল। পাহাড় বেয়ে বেয়ে ময়াল সাপের মতো চড়াই-উতরাই পথ। এই হল কোহিমা শহরের চেহারা। শহরটাকে মনোরম করে তোলার জন্য সর্বত্র ফুলের বাগান।
ডানদিকে লবণের বাজারে রীতিমতো হইচই শুরু হয়েছে তখন। বাঁ দিকে টিনের অসংখ্য ঘর। সেই ঘরগুলোর সামনে বাঁশের মাচা। মাচাগুলোর ওপর বসে রয়েছে অনেকগুলো বরফসাদা মানুষ। সকলেই এক-একজন নাগার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিচ্ছে। চাদর কি কাপড় জড়িয়ে জড়িয়ে দিচ্ছে তাদের গায়ে।
ইতস্তত ছড়ানো আরো কয়েকজন লোক চোখে পড়ছিল। তাদের গায়ের রং কালো। একই রঙের একই আকারের পোশাকে তাদের দেহ সাজানো রয়েছে। হাতে বিচিত্র ধরনের লাঠি (এর আগে বন্দুক দেখে নি সারুয়ামারু)। সাদা মানুষগুলো মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে কী এক দুর্বোধ্য। ভাষায় কথা বলছিল। বুঝতে পারেনি সারুয়ামারু।
প্রথমে কোনো কথা বলেনি সারুয়ামারু। সাদা মানুষটা মৃদু হেসে জিগ্যেস করেছিল, কেমন লাগছে এই চাদরটা? বেশ আরাম লাগছে তো?
হু-হু। মাথা নেড়েছিল সারুয়ামারু।
এটা তোমাকে দিলাম। খুশি?
লাল লাল অপরিষ্কার দাঁতের পাটি বার করে হেসে উঠেছিল সারুয়ামারু। ভারি খুশি হয়েছে সে।
সাদা মানুষটা আবার জিগ্যেস করেছে, নাম কী তোমার?
আমার নাম সারুয়ামারু।
কোন বস্তিতে থাকো?
কেলুরি বস্তিতে।
বাঃ বাঃ, ভালো। তোমাদের বস্তিতে আমি গেলে সবাই খুশি হবে? দু’টি চোখের নীল মণি সারুয়ামারুর মুখের ওপর স্থির করে জানতে চেয়েছিল সাদা মানুষটা।
এবার সারুয়ামারু বলেছে, আমি কিছু জানি না। আমাদের বস্তির সদ্দার আছে। বস্তিতে ঢুকতে হলে তাকে বলতে হবে। নইলে বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে দেবে।
আচ্ছা আচ্ছা, তাই বলে নেব।
কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল সাদা মানুষটা। কী একটা গভীর চিন্তায় তলিয়ে যেতে লাগল সে। তারপর ফের বলে উঠল, আমি ফাদার–বুঝলে? আমাকে ফাদার বলে ডাকবে।
সারুয়ামারু মাথা দুলিয়ে রাজি হয়েছিল।
সাদা সাহেব আবারও বলেছে, সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে তোমাদের দেশে এসেছি। অনেক, অনেক দূরে আমার দেশ।
কোহিমার পাহাড়শীর্ষ থেকে ধু ধু দিগন্তের দিকে ডান হাতের তর্জনী বাড়িয়ে দিয়েছিল সাহেব। কত দূরে তার বাড়ি? সারুয়ামারু সে দূরত্বের হদিস পায়নি। শুধু দুটো অবোধ চোখে সাহেবের তর্জনীটার দিকে তাকিয়ে ছিল। ছয় আকাশের দরজা ডিঙিয়ে সন্ধ্যার সময় সূর্যটা যে জগতে চলে যায় বিশ্রামের আশায়, হয়তো সেখান থেকে এসেছে এই বরফ-সাদা মানুষটা। বিস্মিত চোখে তাকিয়েই ছিল বন্য মানুষ সারুয়ামারু।
একসময় সাহেবই ফের বলতে শুরু করেছিল, কোহিমায় কী নিতে এসেছ?
নিমক।
নিমকের বদলে কী দেবে?
সম্বরের ছাল, টেরোন্য জানোয়ারের শিং, বাঘের ছাল।
আমি তোমাকে নিমক দেব। একেবারে মাগনা। কোনো কিছুর সঙ্গে বদল করতে হবে না।
আশাতীত খুশিতে জ্বলে উঠেছে সারুয়ামারুর পিঙ্গল চোখ দুটো। সে বলেছে, আমাদের পাহাড়ে নিমকের বড় অভাব। এক কণা নিমক নেই।
নিমক তোমাকে দেব, কিন্তু তার বদলে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।
কী কাজ? চোখেমুখে সংশয় ফুটে বেরিয়েছে সারুয়ামারুর।
কঠিন কিছু না। সব সময় কপালে, বুকে আর দুহাতের জোড়ের ওপর আঙুল ঠেকাতে হবে। বুক, কপাল আর বাহুসন্ধিতে আঙুল ঠেকিয়ে ক্রস আঁকার প্রক্রিয়াটা শিখিয়ে দিয়েছিল পাদ্রী সাহেব। বলেছিল, পারবে?
রীতিমতো উৎসাহিত হয়ে উঠেছিল সারুয়ামারু, হু-হু, খুব পারব। সঙ্গে সঙ্গে ক্রস আঁকার কাজে লেগে গিয়েছিল সে।
পাদ্রী সাহেব বলেছিল, বুক-হাতে-কপালে আঙুল ঠেকাবে আর বলবে যীশু, যীশু।
যীশু?
হ্যাঁ, যীশু। পারবে তো?
খুব পারব।
এবার হুন্টসিঙ পাখির পালকের মতো ধবধবে মুখখানার ওপর তৃপ্তির আর সাফল্যের হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল পাদ্রী সাহেবের। পাশের অন্য একটা সাদা মানুষকে ডেকে দুর্বোধ্য ভাষায় অথচ উল্লাসের সুরে কী যেন বলে উঠেছিল সে। সেদিন তা বুঝে উঠতে পারেনি সারুয়ামারু।
একসময় সম্বরের চামড়ায় নুন ঢেলে দিয়েছিল সাদা মানুষটা। অন্তরঙ্গ গলায় বলেছিল, আজ থেকে আমরা হলাম ফ্রেন্ড, মানে তোমাদের ভাষায় যাকে বলে আসাহোয়া (বন্ধু)। কেমন তো? আবার বলছি, আজ থেকে আমাকে তুমি ফাদার বলে ডাকবে।
গোলাকার কামানো মাথাটা দুলিয়ে সম্মতি দিয়েছিল সারুয়ামারু।
পাদ্রী সাহেব আরো বলেছিল, তুমি যা চাও সব পাবে। নিমক পাবে, কাপড় পাবে, জামা পাবে। তবে যা বলেছি তা করতে হবে। আর তোমাদের বস্তি থেকে সবাইকে সঙ্গে করে আনবে। সদ্দারকে নিয়ে আসবে। সকলকে কাপড় দেব, নিমক দেব।
হু-হু। জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে, ঘন ঘন ক্রস এঁকে, তারস্বরে চিৎকার করে উঠেছিল সারুয়ামারু, যীশু, যীশু।
এরপর অনেকবার কোহিমায় এসেছে সারুয়ামারু। পাহাড় আর উপত্যকা পাড়ি দিয়ে পাদ্রী সাহেবের কাছে আসতে আসতে তার মনে হয়েছে, একটা রমণীয় নেশার মতো তাকে আকর্ষণ করছে এই শহরটা। বস্তি থেকে অনেককে বহুবার কোহিমায় নিয়ে এসেছে সারুয়ামারু। এমনকি বেঙসানুর ছেলে সিজিটো পর্যন্ত তার সঙ্গে এসেছে। পাদ্রী সাহেব তাদের নিমক দিয়েছে, কাপড় দিয়েছে, চাদর দিয়েছে। আর সকলের কানে কানে এক আলোকমন্ত্র দান করেছে। তা হল যীশুর নামজপ আর ক্রস আঁকার পবিত্র পদ্ধতি।
