অমন করে ওঠে না! গর্জন করে উঠল বেঙসানু। তারপরেই তার মুখ থেকে বৃষ্টির মতো কদর্য গালাগালি বেরুতে লাগল, ইজাহান্টসা সালো। নে রিহুগু–
সারুয়ামারুর ভাঁড়ারেও অফুরন্ত গালাগালি মজুদ আছে। সেও বিচিত্র মুখভঙ্গি করে সে সব একটির পর একটি ছুঁড়তে লাগল, আহে ভু টেলো…
অব্যর্থ লক্ষ্য। দুপক্ষই সমান উত্তেজিত। যারা চারপাশে জমায়েত হয়েছিল তারা সকলেই বেঙসানুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের সমবেত চিৎকার শীতের সকালটাকে কুৎসিত করে তুলেছে। যারা অত্যন্ত উৎসাহী, ঘর থেকে সাঁ করে তারা খারে বর্শা নিয়ে এসেছে। আকস্মিক একটা খণ্ডযুদ্ধের প্রস্তুতি। এর মধ্যে বিস্ময়ের কিছু নেই, হতবাক হবার কারণ নেই। পাহাড়ী গ্রামে বিন্দুমাত্র মতান্তর নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে আনে। বর্শার ফলায় ফলায় সমস্ত ঝগড়াঝাটির অবসান হয়।
উত্তেজনায় বেঙসানু উঠে দাঁড়িয়েছিল, কী সব্বনাশ, শয়তানের জন্যে আনিজার রাগ এসে পড়বে বস্তিতে। সূর্য আর উঠবে না। শীতে সবাইকে মরতে হবে। শয়তানের বাচ্চা কোহিমা মোককচঙ গিয়ে লায়েক হয়ে ফিরেছে! ওরে তোরা সব মুরগি নিয়ে আয়, সূর্যের নামে বলি দিতে হবে। সূর্যের রাগ এই বস্তির ওপরে পড়লে আর উপায় নেই।
রুদ্ধশ্বাসে কথাগুলো বলে চলেছে বুড়ি বেঙসানু। একটানা, ছেদহীন। শুধু কথার পর কথা। চেঁচাতে চেঁচাতে গলার স্বর চিরে চিরে যাচ্ছে। সাহেব অন্য কথা বলেছে! ওরে, তোরা শয়তানের বাচ্চাটাকে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে ফেল, সাবাড় কর। বস্তির সব্বনাশ হয়ে যাবে ও থাকলে।
এক অপরিসীম আতঙ্কে হঠাৎ মানুষগুলো অসাড় হয়ে গেল। হাতের থাবার মধ্যে বর্শাগুলো থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে একটা অনিবার্য সর্বনাশ এসে পড়বে। সূর্যটা হয়তো এখনই আবার নেমে যাবে কোন অদৃশ্য পাতালে। এক ফুকারে হয়তো নিবে। যাবে আলো, মুছে যাবে সমস্ত উত্তাপ। হয়তো এখনই নাগা পাহাড়ের নাভিমূল থেকে কেঁপে কেঁপে উঠবে ভূমিকম্পের তরঙ্গ। প্রচণ্ড গর্জনে এই পাহাড়, এই উপত্যকা উৎক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। তারপর খণ্ড খণ্ড হয়ে নীহারিকার মতো ছড়িয়ে পড়বে মহাশূন্যে। আলো নেই, উত্তাপ নেই, শুধু নিঃসীম অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে নিশ্চিত প্রলয়ের প্রহর গুনতে থাকবে এই পাহাড়ের জীবজগৎ। পশু, পাখি, মানুষ–কেউ বাদ যাবে না। কারো নিস্তার নেই সেই অপমৃত্যুর হাত থেকে।
মেরুদণ্ডের মধ্যে শিহরন খেলে যাচ্ছে। মজ্জার ভেতর দিয়ে হিম নামতে শুরু করেছে যেন। পাহাড়ী মানুষগুলো একেবারেই আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে।
একসময় হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল বেঙসানু, তোরা এখনও দাঁড়িয়ে আছিস? আগে সূর্যের রাগ কমা, মুরগি নিয়ে আয়। তারপর হুই শয়তানের বাচ্চার মুণ্ডু কাটবি। বস্তিতে এমন লোক থাকলে আর বেঁচে থাকতে হবে না।
প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি লেগে সমস্ত নিষ্ক্রিয়তা ঝরে গেল মানুষগুলোর। অনিবার্য অপঘাতের কবল থেকে বাঁচার একটা ক্ষীণ আভাস তারা দেখতে পেয়েছে। পলকে বর্শা নামিয়ে রেখে তীরের মতো ছুটে গেল সবাই। এই মুহূর্তে এই উপত্যকা আলোড়িত করে, যেখান থেকে হোক মুরগি সংগ্রহ করে আনতে হবে, আনতেই হবে।
জীর্ণ গলাটা ফুলিয়ে তখনও খেউড় গেয়ে চলেছে বেঙসানু। আর সেই একটানা কণ্ঠসাধনায় তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছে তার নাতি আর নাতনি, ফাসাও আর নজলি। অবিরাম সেই কণ্ঠে বাজছে, ইজাহান্টসা সালো–
আর ওপরের টিলায় দাঁড়িয়ে নিরুপায় আক্রোশে একটা খ্যাপা অজগরের মতো ফুলছে সারুয়ামারু। আচ্ছা, সময় এলে সেও দেখে নেবে।
সারুয়ামারুর অপরাধই বা কী? মাঝে মাঝে নুন আনতে অগুনতি পাহাড় আর উপত্যকা ডিঙিয়ে তাকে যেতে হয় মোককচঙ। কখনও বা কোহিমায়। সেখানে একদল বিচিত্র মানুষকে সে দেখেছে। বরফের মতো সাদা গায়ের রং। পরনে হুন্টসিঙ পাখির পালকের মতো ধবধবে পোশাক। সে পোশাক একেবারে গলা থেকে পায়ের পাতায় নেমে এসেছে। চোখের মণি কী আশ্চর্য নীল! কী মনোরম তাদের ব্যবহার! তার মতো আরো অনেক পাহাড়ী মানুষ যায় কোহিমায়। মেলুরি থেকে, টিজু নদীর ওপারের সুদূর উপত্যকা থেকে। রেঙমাপানি আর দোইয়াঙ নদীর পরপারে যে ছোট ছোট জনপদ বিক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে, সেখান থেকেও অনেক মানুষ যায় লবণের জন্য।
বিভিন্ন গ্রাম, বিভিন্ন জাতের সব নাগা। তাদের মধ্যে মনান্তর আছে, মতান্তর আছে। ঝগড়াঝাটিরও অন্ত নেই। তবু মোককচঙে কি কোহিমায় লবণের সন্ধানে যখন আসে তখন তারা খুবই শান্ত, অতিমাত্রায় সংযত।
সেই লবণের খোঁজে কোহিমায় এসে এক বিচিত্র পৃথিবীর সন্ধান পেয়েছিল সারুয়ামারু। এক অপূর্ব জীবনের আস্বাদে চমকে উঠেছিল।
বরফের মতো সাদা সব মানুষ। পরনে ধবধবে, ঢোলা আলখাল্লা। রূপকথার দেশের সংবাদ যেন নিয়ে এসেছে। তাদের পাহাড়ী ভাষা কী চমৎকার করেই না বলতে পারে! এমন একজন বরফসাদা মানুষ তাকে কাছে ডেকে নিয়েছিল। তারপর অন্তরঙ্গ গলায় বলেছে, আমি তোমার শত্রু নই। আমি তোমার আসাহোয়া (বন্ধু)। আমাকে ভয় পেও না। এই নাও।
আচমকা বরফসাদা মানুষটা সারুয়ামারুর গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে দিয়েছিল। কচি পাতার মতো রং চাদরটার। শীত ঋতুর দিন। চাদরটা উষ্ণ আমেজের মতো সারা শরীরে লেপটে গিয়েছিল সারুয়ারুমার। চাদরের উত্তাপ প্রচুর আরাম দিচ্ছিল। এমন আচ্ছাদন জীবনে কোনোদিন দেখেনি সারুয়ামারু। তার কোমরের চারপাশে একটা হরিণের ছাল জড়ানো ছিল। তার ওপর কচিপাতা-রং চাদর। ভারি মজা লেগেছিল সারুয়ামারুর।
