বুড়ি বেঙসানুর গল্প শুরু হল, অনেক কাল আগে, সে কত বছর আগের ব্যাপার তা বলতে পারব না। তবে তখন খুব গরম ছিল। এত গরম যে মানুষেরা একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। সূর্য উঠলেই সারা গায়ে জ্বলুনি ধরে, গাছপালা পুড়ে যায়। পাহাড়ের মানুষেরা বলাবলি করলে, নাঃ, এত গরমে একেবারে মরেই যাব। সূর্য আর না উঠলেই বাঁচোয়া। মনের কথা মনে রাখাই ভালো। মুখ ফসকে বেরিয়ে এলেই বিপদ। কিছু লোকজন সে কথা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললে। আর যায় কোথায়? সূর্য ঠিক ঠিক শুনে ফেলেছে।
কিছু সময়ের বিরতি। একমুঠো কাঁচা তামাকপাতা মুখে পুরে বুড়ি বেঙসানু আবার শুরু করল, প্রথম প্রথম যেন এসব কথা শোনেনি, এমন ভাব দেখালে সূর্য। শেষে মানুষের মুখে মুখে এক কথা বার বার শুনতে শুনতে তার ধৈর্য আর রইল না। তার ভারি গোসা হল। হবার তো কথাই। পাহাড়ী মানুষগুলোকে তা জানিস, একটা কথা পেলে তা নিয়ে ছেলেবুড়োর দিনরাত খালি বকর বকর। যাক সে কথা। তারপর হল কি, একদিন সুর্য তো ছয় পাহাড়ের নিচে ডুবে গেল। তার পরদিন সে আর ওঠে না। চারিদিকে অন্ধকার আর অন্ধকার। শীতে মানুষ মরার উপক্রম। সূর্য হল পুরুষ মানুষ, তার তেজ না থাকলে চলে! চাঁদ ওঠে বটে, কিন্তু সে হল মাগী। তার গরম নেই। পাহাড়ের মানুষ যখন শীতে কাঠ হয়ে গেল, তখন সবার টনক নড়ল। জানিস তো, ছটা আকাশ আছে। সেই ছটা আকাশ পেরিয়ে সূর্য ওধারে কোথায় যেন চলে গেছে। অগত্যা সাধ্যসাধনা শুরু হল। মানুষেরা সূর্যকে আনার জন্যে তোক পাঠালে। সূর্য তার কথা শুনল না। জানোয়াররা পাঠাল তাদের রাজা বাঘকে। সূর্যের রাগ তাতেও পড়ল না। পাখির রাজ্য থেকে গেল সবচেয়ে সুন্দর খুগু পাখি। তবুও মন ভিজল না সূর্যের।
এদিকে পাহাড়ের মানুষগুলো শীতে প্রায় সাবাড় হয়ে এসেছে। কোনো উপায় নেই। তখন এক বুড়ো হুন্টসিঙ পাখি বুদ্ধি বাতলে দিল। সে বললে, সূর্য মুরগিকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তোমরা সব তাকে গিয়ে ধর। সে তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে।
বেঙসানুর চারপাশের ছেলেময়েরা চোখ বড় বড় করে শুনছে। সকলের চোখেমুখে বিস্ময়ের, ভয়ের, কৌতূহলের সাতরঙা রামধনু খেলে খেলে যাচ্ছে।
বুড়ি বেঙসানু খকখক করে কেশে উঠল একবার। তারপর বিরাট শ্বাস টেনে নিল ফুসফুসের মধ্যে। তারও পর আবার আরম্ভ করল, মুরগি অনেক টালবাহানা করে তো রাজি হল। সে বললে, তাকে লাল রঙের মুকুট দিতে হবে। মানুষ, পাখি আর জানোয়ার সব ফাঁপরে পড়েছে। তাই কী আর করে! মুকুট দিতে হল। সেই থেকে মুরগির মাথায় লাল টুপি হয়েছে। যাক, যা বলছিলাম। রাতারাতি ছয় পাহাড় আর ছয় আকাশ ডিঙিয়ে তো সূর্যের বাড়ি এল মুরগি। একেবারে সেই পাতালে। মাঝ পথে ভামবিড়ালের আস্তানা। তাই ভয়ে ভয়ে, চুপিচুপি পার হতে হয়েছে এতটা পথ।
মুরগি সূর্যের হাতে পায়ে ধরে অনেক অনুনয় করলে। কিন্তু সে বড় গোঁয়ার। শত হলেও পুরুষ মানুষ তো। তার মানে লেগেছে। মুরগি বললে, রোজ ছটা আকাশের দরজা ডিঙিয়ে তোমাকে আমাদের পাহাড়ে যেতে হয়। তুমি যখন আসবে, আর এক একটা দরজা পার হবে, সঙ্গে সঙ্গে আমি চিৎকার করে পাহাড়ের লোকজনকে জানিয়ে দেব। সে চিৎকার শুনে তারা তোমায় পুজো করবে। তাহলে খুশি তো? সূর্য তাতেও রাজি নয়।
অগত্যা মুরগিকে পাহাড়ে ফিরতে হবে। কিন্তু পথে সেই ভামবিড়ালের আস্তানা। বড় ভয় করতে লাগল তার। সে বললে, তুমি তো আমার কোনো অনুরোধই রাখলে না সূর্য। কিন্তু একটা কথা তোমাকে রাখতে হবে। আমি এখন পাহাড়ে ফিরে যাব। ছয় আকাশ আর ছয় পাহাড়ের দরজা ডিঙিয়ে আমাকে যেতে হবে। মাঝখানে এক ভামবিড়ালের আস্তানা আছে। সে আমাকে পেলে মেরে ফেলবে। আমার বড় ভয় করছে। সূর্য বললে, আমাকে কী করতে হবে, বল। মুরগি বললে, যখন ভামবিড়ালটা আমার দিকে তেড়ে আসবে, সঙ্গে সঙ্গে আমি ডেকে উঠব। আর তুমি আমাকে বাঁচাতে যাবে। সূর্য বললে, তাই হবে।
মুরগি সূর্যের সেই পাতালবাড়ি থেকে রওনা দিলে। পথে আসতে আসতে এক খাসা বুদ্ধি খেলে গেল তার মাথায়। আকাশের একটা দরজা ডিঙিয়ে সে মিছিমিছি চেঁচিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সূর্য এসে হাজির। মুরগি বললে, তুমি এখানে দাঁড়াও। তোমাকে দেখে ভামবিড়ালটা পালিয়ে গেল। আমি যাই এবার।
এমন করে আকাশের ছটা দরজায় দাঁড়িয়ে ছবার চেঁচিয়ে উঠল মুরগি। সঙ্গে সঙ্গে সূর্যও তার প্রতিজ্ঞামত এসে হাজির। একসময় পাহাড়ের লোকেরা দেখলে ছয় আকাশ ডিঙিয়ে সূর্য এসে উঠেছে পাহাড়ের ওপর। আলোয় ভরে গিয়েছে চারিদিক। শীত পালিয়েছে। সেই থেকে আজও সেই মুরগিটা আকাশে ছবার করে ডেকে ওঠে। ছয় আকাশের দরজায় দাঁড়িয়ে ছবার ডাকে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমরা শুনি। তারপর এ পাহাড়ে সূর্য আসে। বুঝেছিস এবার? বুড়ি বেঙসানুর গল্প শেষ হল।
দূর, সাহেবরা তো অন্য কথা বলে। ওপরের জোরি কেসুঙ থেকে বলে ওঠে সারুয়ামারু। বছর পঁচিশেক বয়স। বছরখানেক আগে বিয়ে করে উঁচু টিলার ওপর নতুন ঘর তুলেছে। সেই ঘরের মধ্য থেকে কথাগুলো যেন ছুঁড়ে মারল সে।
ঘোলাটে চোখদুটো ধক করে জ্বলে উঠল বুড়ি বেঙসানুর, কী, কী বললি?
কী আর বলব। কাঁচা তামাক খাস কিনা, নেশার ঘোরে কী যে বলিস, তার ঠিক নেই। সাহেবরা বলে অমন করে সূর্য ওঠে না। শান্ত গলায় বলল সারুয়ামারু।
