কেলুরি গ্রাম জাগছে। শীতের রাতের সুখনিদ্রার পর সোনালি প্রভাতের ডাক এসেছে। কোখাইরা জেগেছে। যাসেমুদের ঘরে ঘরে ঘুম ভাঙার প্রাথমিক প্রস্তুতি। এর মধ্যেই রোদের প্রার্থনায় ঘরের পেছনে বৃত্তাকার পাথরখানার ওপর এসে বসেছে ফানুসা, ওয়াটেপা। শরীরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করে জড়িয়ে নিয়েছে কার্পাস তুলোর দড়ির লেপ।
এলোমেলো ছড়ানো ঘর। নিচু নিচু। সেগুলোর মাথায় নতুন খড়ের চাল। চারপাশে চেরা বাঁশের দেওয়ালে সাঙলিয়া লতা আর বেতের ছিলার কঠিন বাঁধন। বৃষ্টির ছাট থেকে ঘর বাঁচাবার জন্য চালাটাকে সামনের দিকে প্রসারিত করে রাখা হয়েছে।
পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে, ওপরে-নিচে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সব ঘর। ঘন অরণ্য ধ্বংস করে। টঘুটুঘোটাঙ ফুলের মতো ফুটে উঠেছে এই নগণ্য পাহাড়ী জনপদ, বন্য মানুষের এই সামান্য উপনিবেশ। গ্রামটি যেন এক টুকরো আদিম কাব্য।
বাড়িগুলোর কোনো প্রত্যক্ষ সীমানা নেই–খেয়াল খুশিমতো যেখানে সেখানে গড়ে উঠেছে।
চারপাশে আবাদের জমি সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে নিচে নেমে গিয়েছে। মাসখানেক আগে ফসল তুলে গোলাঘরে জমা করেছে পাহাড়ীরা। ফসলের জমি তাই এখন রিক্ত, হতশ্রী। শুধু এদিকে সেদিকে এখনও ছড়িয়ে রয়েছে কিছু রাহমু ফল, কিছু পাহাড়ী শসা আর প্রচুর টেরিসা ফল। শীতের মরশুমেও পাহাড়ের প্রাণরস শুষে শুষে উদ্দাম হয়ে উঠেছে বনকলার ঝাড়।
জোহেরি বংশের বাড়িটা পাহাড়ের একটা বড় খাঁজের মধ্যে। গ্রামের মানুষেরা এই বাড়িটাকে বলে জোহেরি কেসুঙ। জোহেরি কেসুঙের ঠিক ওপরেই বিরাট একখানা কপিশ পাথরের চাঙড়। বাঁ দিকে ডালপালাওলা একটা বড় খাসেম গাছ আকাশের দিকে মাথা তুলে দিয়েছে। জোহেরি বংশের বন্য রুচি ফুটে রয়েছে চারপাশের টঘুটুঘোটাঙ আর নানা রঙের আখুশু ফুলে ফুলে। জোহেরি কেসুঙের ওপরে পাহাড়ের উঁচু টিলায় টিলায় জোরি, নিপুরি আর সোচরি বংশের বাড়ি। আর কেলুরি গ্রামের তিন প্রান্তে রয়েছে তিনটে মোরাঙ। ত্রিকোণ গ্রাম–তাই তিনটি কোণে মোরাঙ বসিয়ে গ্রামরক্ষার পাকাপাকি আয়োজন করে রেখেছে কেলুরি গ্রামের মানুষেরা।
কিছুদিন আগে নগদা সু মাসে এদের সবচেয়ে বড় উৎসব নগদা শেষ হয়েছে। সেই উৎসবের ক্লান্তি আর উল্লাসের রেশ এখনও গ্রামখানার স্নায়ুতে স্নায়ুতে জড়িয়ে রয়েছে। আপাতত ফসল তোলার তাগাদা নেই, বীজদানা বোনার ব্যস্ততা নেই। এখন অফুরন্ত অবসর। মধুর আলস্যে দিনগুলো ঢিমে তালে গড়িয়ে গড়িয়ে বয়ে চলেছে এই পাহাড়ী জনপদের ওপর দিয়ে।
অন্য সব বাড়ির মতো জোহেরি কেসুঙেরও ঘুম ভেঙেছে। পেছনে অর্ধবৃত্তাকার পাথরের বেদি। বাইরের দরজা দিয়ে সেই বেদির ওপর এসে বসল বুড়ি বেঙসানু। অনেক বয়স হয়েছে তার। মুখের কুঞ্চন-রেখায় অনিবার্য বার্ধক্য ফুটে বেরিয়েছে। মাথার চুলগুলো শুকনো তামাক পাতার মতো হেজে গিয়েছে। চোখের ওপর পাকা ভ্র দুটো ঝুলে পড়েছে। কানে চাকার মতো বড় বড় পিতলের গয়না; কানের মাঝখান থেকে কেটে নিচে এসে ঝুলছে। হাঁটু পর্যন্ত ময়লা কোন মেনী কাপড়। সারা গায়ে দড়ির লেপ জড়ানো। দুহাতের কবজিতে হরিণের হাড়ের বালা। সমস্ত শরীর থেকে উগ্র আর ভ্যাপসা দুর্গন্ধ উঠে এসে শীতের বাতাসে সঞ্চারিত হয়ে যাচ্ছে।
বেঙসানুর পাশে এসে বসেছে বছর ছয়েকের একটি ছেলে আর বছর তিনেকের একটি মেয়ে। ফাসাও আর নজলি। তার দুই নাতি-নাতনি। বেঙসানু ছেলেমেয়ে দু’টিকে কোলের ভেতর টেনে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল।
ফাসাও বলল, ঠাকুমা, বড় শীত করছে।
হু-হু, আজ বড় শীত। দাঁড়া, এখুনি রোদ উঠবে।
পাহাড়ের চূড়া ঘিরে যে সাদা কুয়াশার স্তর এতক্ষণ গাঢ় হয়ে ছিল, রোদের অবিরাম রাঘাতে এখন তা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ পাহাড়ের শীর্ষে বরফের যে সাদা স্তরটা জমাট বেঁধেছিল, এবার তা একটু একটু করে মুছে যেতে শুরু করেছে। নিবিড় বনের সবুজ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।
এতক্ষণ অবিরাম বকর বকর করছিল ফাসাও। কথার পর কথা। সঙ্গতি নেই, একটার সঙ্গে আর একটার সম্বন্ধ নেই। সব এলোমেলো, পারম্পর্যহীন।
শুকনো পাতার মতো ধুসর মাথাটা শুধু নাড়ছিল বুড়ি বেঙসানু। আর মাঝে মাঝে হাতের তালু থেকে কাঁচা তামাক পাকিয়ে জিভের নিচে গুঁজে গুঁজে দিচ্ছিল।
আচমকা ফাসাও বলল, আচ্ছা ঠাকুমা, সূর্য ওঠে কেন?
হু-হু, বল দিকি ঠাকুমা। জোহেরি কেসুঙের চারপাশে আরো কয়েকটি কৌতূহলী কণ্ঠ শোনা গেল।
ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারিদিকে একবার তাকাল বুড়ি বেঙসানু। গ্রামের কয়েকটি ছেলেমেয়ে এর মধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। তারা বেঙসানুর চারপাশে এসে নিবিড় হয়ে বসল।
হু-হু, বল দিকি। বাঁ দিকের পাহাড়ের খাঁজে নিয়ানোদের বাড়ি। সেখান থেকেও দু-একটি গলা বেশ সরব হয়ে উঠেছে।
শীতের সকাল। পাহাড়ী দিগন্ত ঘিরে বিলীয়মান কুয়াশার প্রলেপ। শীতার্ত বাতাস। গালগল্পের মজা দিয়ে, অলস কথার মৌতাত মেখে শীতের সকালটাকে রমণীর করে ভোলার ইচ্ছা সকলের চোখেমুখে, হু-হু, বল দিকি বুড়ি।
আরম্ভ কর সেঙাই-এর ঠাকুমা। কলের গলায় সমান আগ্রহ, সমান তাগাদা, সমান ব্যগ্রতা।
আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল বুড়ি বেঙসানু, শোন তবে, সে এক কেচ্ছা। আমি শুনেছি আমার মায়ের কাছে। মা শুনেছে তার ঠাকুরদার কাছে। একটু থামল বেঙসানু। তারপর সকলের মুখের ওপর দিয়ে ঘোলাটে দৃষ্টিটাকে চক্রাকারে পাক দিয়ে আনল। তারও পর যেমন করে মন্ত্র দান করা হয়, ঠিক তেমনই গম্ভীর হয়ে এল তার কণ্ঠস্বর, মন দিয়ে শোন সবাই–
