দড়ির লেপের ভেতর শরীরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে গেল সেঙাইর। এখনও ঘুম আসছে না দুচোখের পাতা ভাসিয়ে দিয়ে। শুধু তন্দ্রার মতো লাগছে। আর সেই তন্দ্রা অপরূপ হল একটি নগ্ন নারীতনুর রূপে। সে তন্দ্রা মধুর হল আজ বিকেলের সেই নিঃশব্দ ঝরনার পাশে অনাবৃত এক আদিম সৌন্দর্যের স্বপ্নে। সে স্বপ্নের নাম–মেহেলী। সালুয়ালা গ্রামের মেয়ে সে; তাদের শত্রুপক্ষ। রোজ এ পারের ঝরনার জলে তার কমনীয় শরীর স্নিগ্ধ করে যায় মেয়েটা।
একবার পাশ ফিরল সেঙাই। বাঁশের মাচানটা মচমচ করে ওঠে। তারপর লেপের মধ্য থেকে কচ্ছপের মত মাথাটা বাড়িয়ে দিল সে। বাঁশের দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে হিমের রেখা ঘন হয়ে ঢুকছে। আগুনের কুণ্ডগুলো নিভু নিভু। তার স্তিমিত আলোতে বর্শা-গাঁথা মোষের মুণ্ড আর বাঘের মাথাগুলো রহস্যময় মনে হয়। এক ভৌতিক আতঙ্কে চেতনাটা আচ্ছন্ন হয়ে আসে। এর চেয়ে লেপের মধ্যে উষ্ণ অন্ধকারটুকু অনেক বেশি নিরাপদ, অনেক বেশি আরামের। এই অন্ধকারে স্নায়ুতে একটি নগ্ন নারীতনুর স্বপ্নকে সঞ্চারিত করা যায়। তন্দ্রাটা উপভোগ করে তোলা সম্ভব হয়। অতএব মাথার ওপর দিয়ে লেপটাকে আবার টেনে দিল সেঙাই।
মেহেলী! মেহলেী! মেহেলী! ঘুম আসছে না সেঙাইর। শত্রুপক্ষের মেয়ে সে। সালুয়ালাঙের মেয়ে সে। পোকরি বংশের মেয়ে সে। বন্য রক্ত কেমন যেন উদ্বেল হয়ে ওঠে সেঙাই-এর ধমনীতে। এই পোকরি বংশই তার ঠাকুরদার মাথা কেটে নিয়ে গিয়েছে, তারপর বর্শায় গেঁথে ওদের মোরাঙের সামনে ঝুলিয়ে রেখেছে। সেই বংশের মেয়ে মেহলী। তবু কত তফাত, কত ব্যতিক্রম। এর সঙ্গে যেন নিঃসন্দেহে মিতালি পাতানো চলে। মেহেলীর সঙ্গে বর্শার মুখে মুখে কথা বলতে মন সায় দেয় না। নির্জন ঝরনার পাশে তাকে সহচরী হিসেবে পেতে মন ব্যগ্র হয়ে ওঠে।
আঠারো বছরের যৌবনে অনেক অনাবৃত কুমীরদেহ দেখেছে সেঙাই। অহরহ দেখছে। কিন্তু তার পাহাড়ী মনে এমন দোলা আর লাগেনি। এমন মাতালামি আর জাগেনি।
কঠিন পাথরের ওপর শিলালিপি পড়েছে। সে শিলালিপি মেহেলী। অক্ষয় তার দাগ। গভীর তার রেখা। স্মৃতির মধ্যে, চেতনার মধ্যে, তন্দ্রার মধ্যে মেহেলীর উজ্জ্বল দেহ, সোনালি স্তনচূড়া, নিটোল নিতম্ব, মসৃণ উরু চমক দিয়ে দিয়ে উঠছে সেঙাই-এর। এই বিছানাটা মৃত ময়ালের শীতল আলিঙ্গনের মতো মনে হচ্ছে। বুকের ভেতর নিবিড় করে পেতে ইচ্ছা করছে মেহেলীকে।
হঠাৎ শরীরে তীব্র মোচড় দিয়ে বাঁশের মাচানের ওপর উঠে বসল সেঙাই। তারপর দড়ির লেপটা গায়ে জড়িয়ে অতিকায় একটা বর্শা টেনে নিল মোরাঙের দেওয়াল থেকে। এই মুহূর্তে সালুয়ালাঙ গাঁ থেকে সে কি মেহেলীকে ছিনিয়ে নিয়ে আসতে পারে না তার বিছানায়? পারে
এই হিমাক্ত বিছানাকে রমণীয় নারীদেহের উত্তাপে মধুর করে তুলতে?
হ্যাঁ। এই বর্শার মুখে সব বাধা, সব প্রতিরোধ চুরমার করে মেহেলীকে সে নিয়ে আসবে। মোরাঙের দরজার দিকে ছুটে গেল সেঙাই। বাঁশের দরজাটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে নিষ্ঠুর আঘাতের মতো আছড়ে পড়ল পাহাড়ী শীতের বাতাস। সঙ্গে সঙ্গে পাল্লাটা বন্ধ করে দিল সে। মুখের ওপর থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো বরফ মুছে নিল সে হাতের পাতা দিয়ে।
বাইরের পাহাড়চূড়ায় বরফ পড়তে শুরু করেছে। কোনো উপায় নেই বেরুবার। বুকের মধ্যে, প্রতিটি রক্তকণার মধ্যে কামনার যে আগুন জ্বলছে, তা দিয়ে নাগা পাহাড়ের শীতরাত্রির হিমকে পরাজিত করে পথ করে নেওয়া যাবে না। আজকের রাতটা সেঙাইর বিপক্ষে। সালুয়ালাঙ আজ আকাশের মতো সুদূর। আর একটি সন্ধ্যাতারার মতো মেহেলী ধরাছোঁয়ার অনেক, অনেক বাইরে। আজকের রাত্রিতে মেহেলীর স্বপ্ন নিয়ে একটি আগ্নেয় কামনার মধ্যে। একটু একটু করে দগ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ই নেই সেঙাই-এর।
খ্যাপা একটা বাঘের মতো নিরুপায় ক্রোধে ফুলে ফুলে উঠল সেঙাই। তারপর বর্শাটাকে একদিকে ছুঁড়ে ফেলে বাঁশের মাচানটার দিকে পা বাড়িয়ে দিল।
অনেক কাল আগে পোকরি বংশের মেয়ে নিতিৎসুর জন্য কি তারই মতো তার ঠাকুরদা জেভেথাঙের বুকে এমনি আগুন জ্বলেছিল? চেতনার মধ্যে এমনই মাতামাতি শুরু হয়েছিল?
মাচানের ওপর শুয়ে শুয়ে সেঙাই ভাবতে থাকে, যে পাহাড়ী যুবতী তার আঠারো বছরের যৌবনকে এমন অস্থির করে তুলেছে, তার চোখ থেকে রাত্রির ঘুম ছিনিয়ে নিয়েছে, তাকে পেতে হবে। পেতেই হবে।
অস্ফুট মন, অপরিণত ভাবনা। পেশীময় সবল দেহে চিন্তাগুলি শ্লথ গতিতে ক্রিয়া করে। তবু মেহেলীর ভাবনা উল্কাবেগে ক্রিয়া করছে সেঙাইর মনে। আঠারো বছরের বন্য যৌবনের কাছে রাশি রাশি খাদ্য আর নারীদেহের মতো অমোঘ সত্য আর কী আছে?
ঘুম আসছে না। বাইরের উপত্যকায় গুড়ো গুড়ো বরফ ঝরছে আর মোরাঙের মাচানে তুলোর দড়ির লেপ, খড়ের বিছানা আর আগুনের কুণ্ড রয়েছে। একটি নিটোল ঘুমের এত উপকরণ থাকা সত্ত্বেও আজ রাতে সেঙাইর ঘুম আসবে না।
.
০৬.
পাহাড়ী গ্রামটা একটু একটু করে জেগে উঠছে। অনেক উঁচুতে দক্ষিণ পাহাড়ের শীর্ষে। এখনও শুভ্র তুষারের একটা প্রলেপ পড়ে রয়েছে। তার ওপর কুয়াশা ভেঙে ভেঙে সোনালি সূর্যের দু-একটা জ্যোতির্ময় রেখা এসে পড়েছে। চারিদিকে শুধু মালভূমি আর উপত্যকা, আর তরঙ্গিত পাহাড়ের চড়াই-উতরাই। দিগন্ত ঘিরে সাদা কুয়াশার ঘন স্তর স্থির হয়ে রয়েছে। অপরূপ এই নাগা পাহাড়। অদৃশ্য ঢেউয়ের মতো বয়ে যাচ্ছে বাতাস। সে বাতাসে শীতের হিম মিশে ভয়ানক হয়ে উঠেছে। শরীরের অনাবৃত চামড়ার ওপর কেটে কেটে বসে পাহাড়ী শীতের দাঁত। মেরুদণ্ডের মধ্য দিয়ে অসহ্য তুষারধারা নামতে শুরু করে যেন। হৃৎপিণ্ডের ভেতর। সঞ্চারিত হয়ে যায় একটা তীব্র কনকনানি।
