কিছুক্ষণ চুপচাপ। একসময় খাপেগাই বলতে শুরু করল, মোরাঙের দেওয়ালে কী ঝুলিয়ে রেখেছিস তোরা?
সকলে সমস্বরে বলল, কেন, মোষের মাথা, সম্বরের ছাল, বাঘের মুণ্ডু–
ওয়াক থুঃ-থুঃ-থুঃ–অগ্নিকুণ্ডটার দিকে আবার একদলা থুতু ছুঁড়ে দিল খাপেগা। ঘৃণায় তার জীর্ণ মুখখানা কুঁচকে গিয়েছে। এই মুহূর্তে খাপেগাকে ভারি কদর্য দেখাচ্ছে। অতীতের জন্য ব্যগ্র মমতা আর বর্তমান কালকে অক্ষম ঘৃণা–এই দুইয়ের মাঝে খাপেগা অসহায় নিরালম্বের মতো ঝুলছে। বিস্বাদ গলায় সে বলল, জানিস, আগে আমরা জানোয়ার শিকারে যেতাম না। মানুষ শিকারে যেতাম। তারপর সেই মানুষের মুণ্ডু এই মোরাঙের দেওয়ালে দেওয়ালে বর্শায় গেঁথে রাখতাম। আজ যেখানে তোরা মোষের মুণ্ডু রাখিস, সেখানে আমরা রাখতাম শত্রুর মুণ্ডু।
আজ আমিও মানুষ শিকার করেছি। উত্তেজিত ভঙ্গিতে ঘোষণা করল সেঙাই।
হতেই পারে না। অসম্ভব। হু-হু, তোরা করবি মানুষ শিকার! আরে থুঃ-থু-থুঃ–আবার থুতু ছিটাল খাপেগা, এ আমি বিশ্বাসই করি না।
অতীতের সেই গৌরবময় বীরত্বের সঙ্গে বর্তমান পাল্লা দিচ্ছে। এ অসম্ভব। অসম্ভবই নয় শুধু, একেবারেই অবাস্তব। বুড়ো খাপেগার মুখখানা ভয়ানক হয়ে উঠল। তার নিশ্বাস দ্রুত তালে বইছে। ঘোলাটে চোখের ওপর মশালের আলো প্রতিফলিত হয়ে হিংস্র দেখাচ্ছে। মনে হল, খাপেগা এখন হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। বার বার মাথা দুলিয়ে সে বলল, অসম্ভব,
অসম্ভব। এ হতে পারে না।
ইতিমধ্যে রাতের খাওয়া চুকিয়ে সব অবিবাহিত ছেলে মোরাঙে ফিরে এসেছে। তারা এবার আগুনের কুণ্ডটার চারপাশে শোরগোল করে উঠল। এতগুলি জোয়ান গলার সম্মিলিত প্রতিবাদে মোরাঙ উচ্চকিত হয়ে ওঠে, কেন অসম্ভব শুনি।
আচমকা সেই চিৎকারকে থামিয়ে দিয়ে গর্জন করে উঠল সেঙাই, আমার কথাটা আগে শোন সদ্দার। তারপর কথা বলিস।
হু-হু, তোর কথা বল। অনেকগুলো জোয়ান সমস্বরে সায় দিল।
অনিচ্ছার সুরে খাপেগা বলল, বল শুনি।
সেঙাই বলতে শুরু করল, আজ দুপুরে একটা সম্বরের তল্লাশে সালুয়ালাঙ বস্তিতে চলে গিয়েছিলাম। সেখানে বর্শা নিয়ে পোকরি বংশের খোনকেকে ফুঁড়ে এসেছি…।
শিকারে যাওয়ার পর সমস্ত ঘটনা বলে গেল সেঙাই। এমনকি তার কাহিনি থেকে মেহেলীও বাদ গেল না।
মোরাঙ কাঁপিয়ে উল্লসিত শব্দ করে উঠল জোয়ান ছেলেরা, হু-হু, অনেকদিন পর জোহেরি বংশের অপমানের শোধ তুলতে পেরেছি।
হো-ও-ও-ও–ও–শীতের রাত চমকে ওঠে। নাগা পাহাড়ের হৃৎপিণ্ড বুঝি শিউরে উঠতে থাকে সে চিৎকারে। ।
একসময় উল্লাসের রেশ ঝিমিয়ে এল।
এতক্ষণ বাদামি পাথরের ওপর বসে বসে একালের জোয়ান ছেলেদের ভাবগতিক লক্ষ করছিল বুড়ো খাপেগা। মস্ত একটা গুটসুঙ পাখির মতো গলা বাড়িয়ে সেঙাইর কথা শুনছিল
সে। এবার বলল, শত্রুকে মারলি তো বুঝলাম। কিন্তু খোনকের মাথা কোথায়?
মাথা আনতে পারি নি। সালুয়ালাঙের অতগুলো মানুষ। মাথা আনতে গেলে মাথা রেখে আসতে হত। ধীরে ধীরে বলল সেঙাই।
এ গল্প আমি বিশ্বাস করি না রে টেফঙের বাচ্চা। আশ্চর্য হিমাক্ত শোনাল খাপেগার কণ্ঠ। এত শীতল সে-স্বর যে জোয়ান ছেলেরা এক নিমেষে একেবারে মিইয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য।
বিব্রত গলায় সেঙাই বলল, বিশ্বাস না হয় রেঙকিলানকে জিগ্যেস করিস। রেঙকিলান আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।
কোথায় রেঙকিলান? চারিদিকে তাকাতে লাগল বুড়ো খাপেগা।
তার বউর সঙ্গে পাহাড় থেকে বস্তিতে ফিরে এসেছে। সে মোরাঙে আসেনি। খাপেগার পাশ থেকে বলে উঠল ওঙলে।
খাপেগা বলল, বেশ তো, কালকেই জিগ্যেস করব রেঙকিলানকে। অনেক রাত্তির হয়েছে। এখন বোধহয় মাঝরাত পার হয়ে গেছে। যা শয়তানেরা, শুয়ে পড়।
হাতের থাবায় এক মুঠো কাঁচা তামাকপাতা ছিল। সরাসরি মুখের মধ্যে চালান করে উঠে দাঁড়াল খাপেগা। তারপর ফিসফিস করে বলল, এ ব্যাপারটা নিয়ে বেশি চেঁচামেচি করিস না। সায়েবরা আজকাল এদিকে ঘোরাফেরা করছে। সেদিন নাকি সেনুকাঙ বস্তি থেকে মানুষ মারার
জন্যে দুজনকে ধরে নিয়ে গেছে। ওদের কাছে কী সব অস্তর আছে, দূর থেকে তাক করে মানুষ। মারতে পারে। দিনকাল কী যে পড়ল! হতাশায় বিরাট দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল খাপেগার।
অনেকগুলো গোঁয়ার মাথা খাড়া হয়ে উঠল অগ্নিকুণ্ডটার চারপাশে, হুই সব এ গাঁয়ে চলবে, সিধে কথা। আমাদের বস্তিতে সায়েব ঢুকতে দেব না। হু-হু, এদিকে এলে মোরাঙে মাথা রেখে যেতে হবে তাদের।
একজন সরস টিপ্পনী কাটল, কি গো সদ্দার, আমাদের ভীতু বল। এইবার? ভয়টা কাকে ধরেছে শুনি?
মোরাঙ কাঁপিয়ে অনেকগুলো জোয়ানের গলা থেকে অট্টহাসি উঠে আসে।
সাঁ করে ঘুরে দাঁড়াল বুড়ো খাপেগা, ভয় পেয়েছে কে–আমি? কক্ষনো না। খালি সায়েবদের কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছিলাম রে টেফঙের বাচ্চারা।
ভারি আপোশ হচ্ছে। অসতর্ক মুহূর্তে কথাটা বেরিয়ে এসে অতীতের পরাজয়কে যেন চিহ্নিত করে গিয়েছে। নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল খাপেগা।
সারি সারি বাঁশের মাচানে অনেকগুলো বিছানা। একটু পর দড়ির লেপের নিচে মধুর উত্তাপে ডুবে গেল জোয়ানেরা। একটি নিটোল, পরিতৃপ্ত ঘুমের ভেতর রাতটুকু কাটিয়ে দেবার সংকল্পে সকলে নিঝুম হয়ে গিয়েছে।
বাঁশের মাচানের তলায় খাটসঙ কাঠের অগ্নিকুণ্ডগুলো এখন নির্জীব হয়ে এসেছে। বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে শীতরাত্রির হিম সাদা ধোঁয়ার আকারে অবিরাম ঢুকছে। আজ নির্ঘাত বরফ পড়বে বাইরের উপত্যকায়।
