লিজোমুর কান্না একটু একটু করে উত্তাল হয়ে উঠতে লাগল। কান্নার দমকে তার সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে।
লিজোমুর কান্না শুনতে শুনতে একেবারে পাথর হয়ে গেল মেহেলী আর পলিঙা।
০৫. মোরাঙ মানেই গ্রামের প্রতিষ্ঠা
০৫.
এই মোরাঙ। মোরাঙ মানেই গ্রামের প্রতিষ্ঠা, গ্রামের মর্যাদা, গ্রামের কৌলীন্য।
কেলুরি গ্রামে তিনটে মোরাঙ। সেগুলোর মধ্যে এই মোরাঙটাই সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে কুলীন। সামনের দিকে অর্ধবৃত্তের আকারে বাঁশের দরজা। দরজার দুধারে প্রকাণ্ড দুটো মোষের মাথা বর্শার ফলায় গাঁথা রয়েছে। ওপরে সোনালি খড়ের নতুন চাল। চালের দু’পাশে খড়ের গুচ্ছ দুলছে। দেওয়ালে দেওয়ালে অজস্র আঁকিবুকিতে মোষের রক্তের মাঙ্গলিক চিহ্ন। পৃথিবীর আদিমতম শিল্প।
দু’পাশে হাতে তিরিশেক লম্বা পাহাড়ী বাঁশের দেওয়াল। দেওয়ালের গায়ে বর্শায় ফোঁড়া রয়েছে বাঘের মুণ্ডু, সম্বরের লেজ, মানুষের করোটি, হরিণ আর মোষের ছাল।
দরজা দিয়ে ঢুকেই বসার ঘর। তারপরেই চওড়া পথ চলে গিয়েছে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। সে পথের দুধারে সারি সারি বাঁশের মাচান। গ্রামের অবিবাহিত ছেলেদের রাত্রির বিছানা এই মাচানগুলোর ওপর পাতা হয়। মাচানগুলোর নিচে রাশি রাশি বর্শা, তীর-ধনুক, ঢাল, মেরিকেতসু। নানা আকারের, নানা নামের ভয়াল সব অস্ত্রশস্ত্র। শত্রুর বর্শা থেকে গ্রামরক্ষার সুনিপুণ আয়োজন, ত্রুটিহীন বন্দোবস্ত।
মোরাঙের বসার ঘরে একখানা বাদামি পাথরের আসনে বসে রয়েছে বুড়ো খাপেগা। তার পাশে সেঙাই, ওঙলে, পিঙলেই। সামনের দিকে গ্রামের জন-পনেরো মানুষ।
সেঙাইরা শিকারে বেরিয়েছিল সকালবেলা। নিশ্চয়ই তারা বল্লমের মাথায় পাহাড়ী জানোয়ার কুঁড়ে নিয়ে আসবে। সেই আশায় আশায় বিকেল থেকে গ্রামের লোকেরা মোরাঙে জমায়েত হতে শুরু করেছিল। কিন্তু কয়েক খণ্ড মাংসের প্রত্যাশা তাদের নির্মমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
শীতের রাত এই পাহাড়ের ওপর গহন হয়েছে, গম্ভীর হয়েছে। মাংসলোভীরা অনেকেই উঠে চলে গিয়েছে যার যার ঘরের উষ্ণ শয্যায়। কার্পাস তুলোর দড়িপাকানো লেপের তলায় স্ত্রীর বুকের উত্তাপ নিয়ে রাতটাকে মোহময় করে তোলার কামনায় অনেকে ব্যগ্র হয়ে উঠেছিল।
বাকি যারা, তাদের মাংসের চেয়েও বড় নেশা আছে। সে নেশা গল্পের নেশা। সে নেশা খাটসঙ কাঠের অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে তার চারপাশে নিবিড় হয়ে বসে আড্ডা জমাবার নেশা। আড্ডা আর গল্পের আমেজে এক অপরূপ মৌতাত খুঁজে পায় পাহাড়ী মানুষেরা। সেই মৌতাত আরেলা ফুরেলা মতো রঙদার হয়ে ওঠে দুএক চুমুক রোহী মধু পেলে।
মা গি কাঠির পাথরে চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালিয়েছে বুড়ো খাপেগা। তারপর দুটো পেন্য গাছের ডালে সেই আগুন দিয়ে মশাল তৈরি করেছে। সমস্ত মোরাঙটা আলোয় ভরে গিয়েছে। পেন্যু গাছের শাখায় স্নেহরস আছে। তাই তার আলো উগ্র নয়। সে আলো আশ্চর্য স্নিগ্ধ, আর নরম।
পেন্যু গাছের মশাল দু’টির চারপাশে বৃত্তাকারে বসেছে অনেকগুলো পাহাড়ী মানুষ। সকলের সামনেই বাঁশের চোঙায় রোহি মধু। মাঝে মাঝে তরিবত করে সেই পানপাত্রে চুক চুক করে চুমুক দিচ্ছে কেউ কেউ। মশালের এই মনোরম আলো, মাঝখানে খাটসঙের অগ্নিকুণ্ড থেকে মধুর উত্তাপ আর রোহি মধুর আস্বাদ–সব মিলিয়ে শীতের রাত্রিটা বড় উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।
একজন দুজন করে খাওয়ার পালা চুকিয়ে অবিবাহিত ছেলেরা মোরাঙে ফিরে আসতে। শুরু করেছে। বাইরে শীতের রাত্রি নির্মম হয়ে উঠেছে।
বাদামি পাথরের রাজাসন থেকে খাপেগা বলল, আজ রাতে বরফ পড়বে মনে হচ্ছে।
সকলে মাথা নেড়ে সায় দিল, হু-হু, ঠিক।
খাপেগা বলতে লাগল, আজ শিকার করে কিছুই আনলি না যে সেঙাই? মানুষগুলো এতক্ষণ মাংসের আশায় বসে ছিল। এর শোধ কিন্তু ওরা অন্যভাবে তুলবে। বিয়ের পর তোর প্রথম আওশে ভোজে একটার বদলে তিনটে সম্বর বলি দিতে হবে। একটু থামল খাপেগা। তারপর আবার শুরু করল, তোরা আজকালকার ছেলেরা হলি কী? শিকারে বেরিয়ে খালি হাতে ফিরে আসিস! থুঃ-থু-থুঃ।
অপরাধীর মতো মুখ করে সেঙাই বলল, কী করব বল। বর্শা দিয়ে কুঁড়তে পারলাম না একটা জানোয়ারও। চেষ্টা তো কম করিনি। জুতমতো একটা হরিণও যদি বাগে পেতাম! হুই শয়তান রেঙকিলানটার জন্যে যদি শিকার করা যায়! একটা ভীতু কুত্তা কোথাকার!
বুঝেছি, বুঝেছি। থুঃ থুঃ থুঃ–মাঝখানের অগ্নিকুণ্ডটার ওপর কয়েক দলা থুতু ছিটিয়ে দিল বুড়ো খাপেগা, তোদের একালের জোয়ানদের মুরোদ জানতে আর বাকি নেই। শিকারে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসিস। আমাদের কাল হলে মোরাঙে শুধু হাতে ফিরলে সদ্দারই আমাদের বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে ফেলত। তাই তো ভাবি, সেসব দিন গেল কোথায়।
স্মৃতির মধ্যে দিয়ে ধূসর অতীতের দিকে একবার তাকাল বুড়ো খাপেগা। সেই অপরূপ দুঃসাহসী জীবনের অধ্যায়। আজও সেই যৌবনের দিনগুলো পরিষ্কার দেখতে পায় খাপেগা। গভীর রাতে অতিকায় বর্শা নিয়ে শত্রুপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া। তারপর ধারাল অস্ত্রের ফলা। দিয়ে মুণ্ডু কেটে মোরাঙে নিয়ে আসা। শত্রুর রক্ত দিয়ে দেওয়ালে চিত্তির করা। নাগা পাহাড়ের সেই আশ্চর্য উত্তেজক দিনগুলি খাপেগার বুকের মধ্যে হাহাশ্বাস করে বেড়ায়। একটা বিরাট দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।
