সুড়ঙ্গের মুখে কপিশ রঙের আলো এসে পড়েছে ভেতর থেকে। সমস্ত পরিবেশটা আশ্চর্য ভৌতিক। চারপাশে ছায়া কাঁপছে। খাসেম বন আর বুনো কলার পাতা দুলছে। ভীষণ ভয়। করতে লাগল পলিঙা আর মেহেলীর। তারা হয়তো পালিয়েই আসত।
আচমকা সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে একটি কর্কশ কণ্ঠ বেরিয়ে এল, কে? কে ওখানে?
আমরা পিসি। মেহেলী আর পলিঙা এসেছি। কাঁপা, ভীরু গলায় বলল পালিঙা, তোর সঙ্গে দরকার আছে।
ভেতরে আয় শয়তানের বাচ্চারা। সুড়ঙ্গের মধ্যে গলাটা এবার নরম শোনাল।
হামাগুড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গপথ ধরে ভেতরে চলে এল মেহেলী আর পলিঙা।
ভেতরটা প্রশস্ত গুহার মতো। তিন দিকে পাথরের দেওয়াল। অমসৃণ মেঝে। আর সামনের দিকে সুড়ঙ্গপথ। মেঝের এদিকে সেদিকে ইতস্তত ছড়ানো গুনু পাতা, মানুষ আর মোষের হাড়। যুচোঙ গুটসুঙ পাখির বাদামি রঙের কঙ্কাল। বাঁশের পাত্র, কাঠের মাচান। পাথরের খাঁজে খাঁজে আগুন জ্বালিয়ে এই ভয়ঙ্কর পাহাড়ী গুহায় খানিকটা উত্তাপ সৃষ্টি করেছে ডাইনি নাকপোলিবা।
এক পাশে একটা পাথরের ওপর বসে ছিল নাকপোলিবা। কাছাকাছি একটা পেন্যু কাঠের মশাল জ্বলছে। স্তিমিত, অথচ স্নিগ্ধ আলোতে রহস্যময় হয়ে উঠেছে গুহাটা। সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছে নাকপোলিবার নগ্ন দেহে, ছড়িয়ে পড়েছে কুঞ্চিত মুখের ভাঁজে ভাঁজে, একমাথা রুক্ষ চুলে। সাপের জিভের মতো লিকলিক করছে জটিল চুলগুলো।
নাকপোলিবার বয়স যে কত, তার হিসেব আশেপাশের তিনটে পাহাড়ের এতগুলি গ্রামের প্রাচীনতম মানুষটাও জানে না। সকলেই তাদের ঠাকুরদা কি ঠাকুমার কাছে তার গল্প শুনেছে।
গালের মাংস ঝুলে পড়েছে নাকপোলিবার, কোমরটা বেঁকে গিয়েছে ধনুকের মতো। কিছুক্ষণ দপদপে চোখে মেহেলী আর পলিঙার দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর দাঁতহীন কালচে মাড়ি বার করে বলল, নির্ঘাত তোরা পিরিতের ওষুধ নিতে এসেছিস?
হু-হু। মেহেলী আর পলিঙা মাথা ঝাঁকাল।
হিসহিস করে উঠল নাকপোলিবা, পুরুষমানুষ বশ করতে পারিস না তো কী পাহাড়ী মাগী হয়েছিস? মরদ মজাতে ওষুধ লাগে! ইজা রামখো।
একটা নিরাপদ ব্যবধান রেখে বসেছে মেহেলী আর পলিঙা। করুণ মুখে মেহেলী বলল, কী করব? আজ যে প্রথম দেখলাম। হুই কেলুরি বস্তির ছেলে সেঙাই, ওকে আমার চাই। আমাকে ওষুধ দে তুই।
কেলুরি বস্তির ছেলে সেঙাই আর তুই কোন বস্তির?
আমি সালুয়ালাঙের মেহেলী।
তোদের দুবস্তিতে তো খুব ঝগড়া। খিক—খিক—খিক–বিচিত্র গলায় হেসে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা। তার হাসি এই পাহাড়ী গুহায় অত্যন্ত ভয়ানক শোনাল।
পিরিত তো করলি শত্রুদের জোয়ানের সঙ্গে। তা রোজ দেখা হবে তো? বাদামি একটি করোটিতে হাত বুলোতে বুলোতে বলল ডাইনি নাকপোলিবা। তার চোখ দুটো ধিকিধিকি জ্বলছে।
মেহেলী তাকাল পলিঙার দিকে। মেহেলীর চোখের ইঙ্গিতটুকু বুঝল পলিঙা। সে বলল, যাতে মেহেলীর সঙ্গে সেঙাইর রোজ দেখা হয় সেই ব্যবস্থাটা করে দে। সেই জন্যেই তো এলাম তোর কাছে।
আমার ওষুধে এমনি কাজ হবে না। আমি যে ওষুধ দেব, সেঙাইর গায়ে তা যদি ছোঁয়াতে পারিস, তবেই বশ হবে। তাকে আটক করে আমার কাছে আসবি। বুঝেছিস? রুক্ষ চুলের গোছা দোলাতে দোলাতে সামনের দিকে চলে এল বুড়ি ডাইনি নাকপোলিবা। তারপর হাতখানা মেহেলীর গালের ওপর বিছিয়ে দিল, কি লো পাহাড়ী জোয়ানী, মনটা বড় জ্বালা-পোড়া করছে? আচ্ছা আচ্ছা, আগে তো সেঙাইকে আটক কর, তারপর এমন ওষুধ দেব, তোর গায়ে একেবারে জোঁকের মতো সেঁটে থাকবে সে। আর একটা কথা, ওষুধের দাম আনবি চারটে বর্শা আর দুখুদি (আড়াই সেরের মতো) ধান। খিক–খিক ফের–সেই বিচিত্র হাসিতে এই নিভৃত গুহাটিকে ভয়ঙ্কর করে তুলল ডাইনি নাকপোলিবা।
খানিক পর সালুয়ালা গ্রামে এসে পড়ল মেহেলী আর পলিঙা। দূর থেকেই মোরাঙের চারপাশের উদ্দাম সোরগোল শোনা যাচ্ছে।
আকাশ থেকে শীতরাত্রির ঘন অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে নিচের অরণ্যে। মেহেলী ভীরু গলায় বলল, কী ব্যাপার লো পলিঙা?
কি জানি, বুঝতে পারছি না।
দ্রুত পা চালিয়ে খোখিকেসারি কেসুঙের কাছাকাছি চলে এল দুজনে। তখন ঘর থেকে একটা মশাল নিয়ে বেরিয়ে আসছে লিজোমু।
মেহেলী বলল, এই লিজোমু, কী হয়েছে লো? এত হল্লা হচ্ছে কেন মোরাঙে?
খোনকেকে বর্শা দিয়ে ফুঁড়েছে। দাদাকে ছুঁড়েছে কে? গলাটা কেঁপে উঠল মেহেলীর।
কে আবার? নির্ঘাত হুই কেলুর বস্তির লোক–যাদের সঙ্গে তোর এত পিরিত। মশালের আলোতে পাহাড়ী মেয়ে লিজোমুর চোখ দুটো জ্বলে উঠল।
শিউরে উঠল মেহেলী, বলিস কী! কে বললে কেলুরি বস্তির লোকেরা দাদাকে ছুঁড়েছে?
তীক্ষ্ণ চোখে মেহেলীর দিকে তাকিয়ে ফুঁসে উঠল লিজোমু, কে আবার বলবে রে শয়তানের বাচ্চা, সদ্দার বলেছে। এ কাজ নির্ঘাত হুই কেলুরি বস্তির রামখোদের। আহে ভু টেলো। দ্যাখ গিয়ে, মোরাঙের ওপাশে বসে আমাদের বস্তির জোয়ানেরা:বর্শা শানাচ্ছে।
কেন?
সদ্দার হুকুম দিয়েছে কেলুরি বস্তির শয়তানগুলোকে বাগে পেলে সাবাড় করতে। হু-হু–
কোনো কথা বলল না মেহেলী। তার পাশে নিরুত্তর দাঁড়িয়ে রইল পলিঙা।
একটু পরেই ডুকরে উঠল লিজোমু, আপোটিয়া! হু-হু, এবার আমার কী হবে? খোনকে যদি হুই বর্শার খোঁচায় সাবাড় হয়ে যায়, তা হলে আমি কোথায় পিরিতের জন্যে মরদ পাব? তুই তো কেলুরি বস্তির সেঙাইকে বাগিয়ে নিলি মেহেলী–
