বিকেলের রং ঝাপসা হয়ে আসছে। আর একটু পরেই শীতের সন্ধ্যা নামবে এই পাহাড়ে। এবার উঠতে হবে। টিজু নদীর ওপারে তারই জন্য অপেক্ষা করছে পলিঙা আর লিজোমু।
টানডেনলা পাখির মতো আরো কিছুক্ষণ ছিটিয়ে ছিটিয়ে সারা শরীরে জল মাখল মেহেলী। তারপর পাথরের ওপর থেকে লাল লঙের কুমারী কাপড়টা তুলে কোমর থেকে জানু পর্যন্ত ঝুলিয়ে দিল। তারও পর ঝোঁপের কিনার দিয়ে নাচের ভঙ্গিতে টিজু নদীর দিকে পা চালিয়ে দিল।
নদী পেরিয়ে বাঁ দিকের বিশাল উপত্যকায় পলিঙাদের সঙ্গে মুখোমুখি হল মেহেলী। পলিঙা আর লিজোমু পাহাড়ী অরণ্য থেকে অজস্র টঘুটুঘোটাঙ ফুল তুলে এনেছে। আতামারী লতায় বুনে বুনে সেই ফুল দিয়ে ঘাগরা বানিয়ে পরেছে। কানে, চুলে খুশিমতো সেই বাহারি ফুল গুঁজে খুঁজে নিজেদের রূপবতী করে তুলেছে।
পলিঙা বলল, কি লো মেহেলী, তোর চান হল?
হল তো।
রোজ রোজ হুই কেলুরি বস্তির ঝরনায় চান করতে যাস। কী মজা আছে সেখানে? কাউকে লগোয়া পন্য (প্রেমিক) পেয়েছিস নাকি? তেরছা চোখে তাকাল লিজোমু।
মিটিমিটি হাসল মেহেলী, দুচোখের পিঙ্গল মণিতে খুশির আলো জ্বলছে। প্রথমে কিছু বলল সে। একেবারে নিরুত্তর রইল।
হাসলে চলবে না মেহেলী। ওপারে তুই মনটা হারিয়ে ফেলেছিস, মনে হচ্ছে। কিন্তু । সাবধান, ওরা এ বস্তির শত্রুপক্ষ। দেখামাত্র ছুঁড়ে ফেলবে বর্শা দিয়ে।
ফুঁড়বে কেন? পিরিত করবে। রহস্যময় গলায় খিলখিল করে হেসে উঠল মেহেলী।
সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল লিজোমু, পিরিত করবে?
করবে লো, করবে। আমার সঙ্গে একদিন ওপারে গিয়ে দেখিস, তোরও একটা লগোয়া পন্যু (প্রেমিক) জুটিয়ে দেব। পাহাড়ী মেয়ে মেহেলী, তার চোখ দুটো আমারী ফলের দানার মতো চকচক করে উঠল, সত্যি বলছি, কেলুরি বস্তির ছোঁড়ারা বড় ভালো।
কেন, আমার লগোয়া পন্য (প্রেমিক) নেই? খোনকে আছে না? তোর দাদা লো, তোর দাদা। তোর দাদাকে আমি পিরিত করি, জানিস না? ফোঁস করে ওঠে লিজোমু।
খোনকেকে পিরিত করিস, তা তো জানি। পাহাড়ী মাগী তুই; মোটে একটা পুরুষকে নিয়ে খুশি থাকতে পারবি? বাঁকা চোখে তাকাল মেহেলী; তারপর আউ পাখির মতো ঘাড় কাত করে খিকখিক শব্দ হেসে উঠল, অনেক পুরুষকে একসঙ্গে মাতিয়ে দিবি, মজাবি। তারপর এক পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখবি। দুবস্তিতে দাঙ্গা বাধাবি, রক্তে লাল হয়ে যাবে পাহাড়। তা। না হলে কী জোয়ান মাগী হলি!
ধাঁ করে একটা লোহার মেরিকেতসু তুলে ধরল লিজোম, মাথা একেবারে ঘেঁচে দেব মাগী। তেমন লগোয় লেন (প্রেমিকা) আমাকে পাসনি মেহেলী। তোর দাদা ছাড়া আর কারো সঙ্গে আমি পিরিত করেছি? এত ছোঁড়া তো আছে আমাদের সালুয়ালাঙ বস্তিতে!
আরে যেতে দে ওসব কথা। আচ্ছা মেহেলী, নদীর ওপারে রোজ রোজ কী জন্যে যাস বল দিকি, শুনি। সত্যি কথা বলবি। শান্ত মেয়ে পলিঙা জানতে চাইল।
হু-হু–একবার ধারাল চোখে লিজোমুর দিকে তাকিয়ে নিল মেহেলী। তারপর বলল, তোরা যার গল্প করিস, আজ তার দেখা পেয়েছি। সেঙাইকে দেখলুম হুই ঝরনাটার পাশে।
বলিস কী! এবার অন্তরঙ্গ হয়ে বসল পলিঙা।
তারপর? লিজোমুও মেরিকেতসুটা এক পাশে রেখে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। খানিক আগে যা যা ঘটেছে সব বলল মেহেলী, সত্যি ভাই, দেখেই আমার মন মজে গেছে। ওকে পেতেই হবে। একটা বুদ্ধি দে তোরা।
চকচকে চোখে তাকিয়ে লিজোমু বলল, আচ্ছা, সেঙাই একবার ছুঁয়েও দেখল না তোকে? তোর সোয়াদ একটু চেখেও নিল না?
চেখে দেখলে তো মনের জ্বলুনি কমত। ওকে না পেলে সারা দিনরাত জ্বলে মরব। মনে হচ্ছে, সেঙাইকে জড়িয়ে ধরি, আঁচড়াই, কামড়াই। তোরা বল তো কী করি? ব্যাকুল দু’টি চোখ তুলে তাকাল মেহেলী, আমার সঙ্গে যাবি কাল ঝরনাটার পাশে? কি লো লিজোমু, কি লো পলিঙা-যাবি?
না, যাব না। আমাদের অত সাহস নেই। আচমকা বর্শা ছুড়লে নির্ঘাত মরে যাব। জোয়ান বয়েস, এখন তোর জন্যে মরবার ইচ্ছা নেই। ঘর বাঁধব, পুরুষ চাখব, ছেলেপুলে হবে। এই বয়েসে মরতে সাধ হয় না। নিস্তেজ গলায় বলে উঠল লিজোমু, তবে সেঙাই বড় খাসা পুরুষ–
কী করি বল তো? এখন আমি কী করি? মনের প্রবল অস্থিরতা থেকে মেহেলীর কথাগুলো যেন বেরিয়ে আসতে লাগল।
সহসা পলিঙা বলল, উত্তর পাহাড়ে এক বুড়িডাইনি আছে। সে অনেক ওষুধ জানে, পুরুষ বশ করার অনেক মন্তর তার জানা। তার কাছে চল। সে ঠিক বলে দেবে কী করতে হবে।
তীরের মত উঠে দাঁড়াল মেহেলী, চল, এখুনি যাব।
লিজোমু আর পলিঙাও উঠে পড়ল। লিজোমু বলল, তোরা যা, আমি এখন যেতে পারব না। সারাদিন খোনকের দেখা পাইনি। তার খোঁজে যাব। সেঙাইকে তুই পেলি মেহেলী, বড় তাগড়া জোয়ান সে–
বস্তিতে যা তুই। আমরা উত্তর পাহাড়ে ডাইনি বুড়ির সঙ্গে দেখা করে ফিরব।
সালয়ালা গ্রামের দিকে চলে গেল লিজোমু। আর উত্তর পাহাড়ের নিবিড় বনে-ঘেরা চড়াইর দিকে পা বাড়িয়ে দিল মেহেলী আর পলিঙা। দু’টি পাহাড়ী যুবতী। দু’টি বন্য আপোজি (বান্ধবী)।
.
বাদামি পাথরের মধ্যে ছোট্ট একটি সুড়ঙ্গ। চারপাশে উদ্দাম বন। সুড়ঙ্গের মুখ থেকে স্বচ্ছন্দে প্রবেশের জন্য বন কাটা হয়েছে অনেকটা। জনপদ থেকে অনেক, অনেক দূরে এই সুড়ঙ্গ হল ডাইনি নাকপোলিবার আস্তানা।
সুড়ঙ্গের মুখে এসে থমকে দাঁড়াল পলিঙা আর মেহেলী। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ড যেন থর থর করে কেঁপে উঠল। তীব্র আতঙ্কে চেতনাটা ছমছম করছে। আকাশ থেকে শীতের অসহ্য সন্ধ্যা নামছে। চুপচাপ দাঁড়িয়েই রইল দুজনে।
