বনের মধ্যে চারিদিকে জোড়া জোড়া নীল আগুন ঘুরপাক খাচ্ছে। বাঘের চোখ, ময়ালের দৃষ্টি। কখনও মুমূর্ষ গলায় আর্তনাদ করে উঠছে কোনো নিরীহ হরিণ। নির্ঘাত তার ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে কোনো হিংস্র জানোয়ার। টানডেনলা পাখি এই নিবিড় অন্ধকারে, নাগা পাহাড়ের এই ভয়াল শীতের রাত্রে প্রেতকণ্ঠে ককিয়ে উঠছে।
উপত্যকা মাতিয়ে কলোল্লাসে নামছে জলপ্রপাত। গম গম শব্দ বিভীষিকার মতো ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
নীর অন্ধকার। যেন কঠিন হিমস্তূপের মধ্যে দিয়ে পথ কেটে কেটে এগিয়ে চলছে চারটে পাহাড়ী মানুষ। মাঝে মাঝে বাঘ গর্জাচ্ছে। উল্কার মতো সরে সরে যাচ্ছে বুনো সাপ। অনাবৃত শরীরের ওপর উড়ে উড়ে বসছে বিষাক্ত পতঙ্গ। তাদের তীক্ষ্ণ হুলে জ্বলে যাচ্ছে বুক পিঠ, হাত পা।
একসময় মালভূমিটা পার হয়ে এল চারজন। মাঝখানে রেঙকিলান, সামনে সেঙাই, পেছনে ওঙলে আর পিঙলেই।
চাপা গলায় সেঙাই বলল, আরো আগে বস্তিতে ফেরা উচিত ছিল। বড় দেরি হয়ে গেছে।
হু-হু। ওঙলে মাথা নেড়ে সায় দিল।
আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। শুধু পাহাড়ী ঘাসের ওপর দিয়ে চার জোড়া পায়ের সন্ত্রস্ত শব্দ। শোনা যেতে লাগল।
একসময় রেঙকিলান ফিসফিস গলায় বলল, আমার ভয় করছে সেঙাই, বড় ভয় করছে। আরো জোরে আমাকে চেপে ধর।
আগের মতো সেঙাই এবার আর মশকরা করল না। বিন্দুমাত্র ব্যঙ্গ কি ঠাট্টা নয়। চকিত হয়ে সে বলল, কী ব্যাপার রেঙকিলান?
আমি একটা মিছে কথা বলেছিলাম তোকে। অস্ফুট শোনাল রেঙকিলানের কণ্ঠ। অস্বাভাবিক আতঙ্কে গলাটা যেন বুজে আসছে তার।
কী বলেছিলি?
প্রায় স্বগতোক্তি করল রেঙকিলান, সে কথা আমি বলতে পারব না। বললে তোরা আমাকে মেরে ফেলবি।
রেঙকিলানের শেষ কথাগুলো কেউ শুনতে পেল না। ওঙলে না, সেঙাই না, পিঙলেই না। এমন কি রেঙকিলান নিজেই হয়তো শোনেনি। শুধু তার স্নায়ুর তারে তারে এক তীব্র আতঙ্ক তরঙ্গিত হয়ে যাচ্ছে। আনিজা! আনিজা! দূর পাহাড়চূড়া থেকে বনদেবীর অভিশাপ তাকে লক্ষ করে যেন উদ্যত হয়ে রয়েছে।
আচমকা দক্ষিণ পাহাড়ের খাড়া উতরাই থেকে একটা সুতীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে এল। শব্দটা ঘন বনের পাতায় পাতায় স্পন্দিত হচ্ছে। উৎকর্ণ হয়ে চারটে পাহাড়ী মানুষ শুনতে লাগল।
চমকে উঠল রেঙকিলান। নাঃ, এতটুকু ভুল নেই। এখন পুরোপুরি নিঃসংশয় সে। এ শব্দে বাতাসের কারসাজি নেই, এ শব্দ একটি মানবীর কণ্ঠ। সে মানবীর নাম সালুনারু। সালুনারু তার বউ। এই মুহূর্তে ওই শব্দের মধ্যে সালুনারুর গলা চিনতে পেরে চকিত হয়ে উঠল রেঙকিলান।
আবার সেই তীক্ষ্ণ অথচ করুণ আওয়াজ ভেসে এল। পাহাড়ী উপত্যকায় উপত্যকায় সে আওয়াজ একটা আর্ত সুরের মতো ছড়িয়ে পড়ল।
সেঙাই বলল, কে যেন ডাকছে—
হু-হু। ও নির্ঘাত সালুনারু। রেঙকিলান বলল।
সকালে শিকারে বেরুবার পর থেকে খানিক আগে পর্যন্ত একেবারে মিইয়ে ছিল রেঙকিলান। তার ধমনীতে রক্ত আবার স্বাভাবিকভাবে বইতে লাগল। সতেজ হল রেঙকিলান। সেঙাইরা আছে পাশে। কিন্তু তাদের বিশ্বাস নেই। কাল রাতের অনাচারের কথা জানামাত্র। তাকে বর্শা দিয়ে চৌফালা করে ফেলবে ওরা। একমাত্র সালুনারু নিরাপদ, তার আশ্রয়ে এতটুকু ভয় নেই। সেই সালুনারুই তাকে পাহাড়ের চড়াই-উতরাইতে ডেকে ডেকে ফিরছে। দেহমন। থেকে গুড়ো গুঁড়ো বরফের মতো সব ভয়, সব আতঙ্ক ঝরে গেল এই ডাকে। পুনর্জীবনে ফিরে এল রেঙকিলান।
সেঙাই বলল, কিরকম একটা শব্দ, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে ওটা মানুষের গলাই। ও কি সালুনারু?
হু-হু, ও সালুনারু। আমি চললাম। তোরা বস্তিতে যা, আমি বউকে নিয়ে ফিরব। রেঙকিলানের গলাটা খুশি খুশি হয়ে উঠেছে।
ভয় করবে না তো, কি রে ছাগী! সেঙাইর গলায় কৌতুক রয়েছে, খুব সোয়ামী হয়েছিস বটে!
যা যা, বেশি ফ্যাক ফ্যাক করতে হবে না। বলতে বলতে একটু যেন সংশয়ই হল রেঙকিলানের, গলাটা সালুনারুর তো? তারপর তীরের মতো ছুটে দক্ষিণ পাহাড়ের খাড়া উতরাই-এর দিকে মিলিয়ে গেল সে।
পেছনে তিনটি বন্য গলায় উৎকট অট্টহাসি বেজে উঠল। ওঙলে, সেঙাই আর পিঙলেই তিনজনেই সারা দেহ দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে।
.
০৪.
আকাশ থেকে শীতের বিকেল তখনও খানিকটা আলো দিচ্ছিল। এই পাহাড়ে, এই উপত্যকায়, এই মালভূমির ওপর রোদের সোনা ছড়াচ্ছিল। নিঃশব্দ ঝরনার পাশে বসে বসে আজকের এই পাহাড়ী পৃথিবীটাকে বড় মধুর লাগছিল মেহেলীর। এই নিবিড় বন, সাপেথ কুঞ্জের পাশ দিয়ে এই নিরুচ্ছাস জলধারা, বিকেলের মায়াবী রোদ–সব যেন আশ্চর্য রূপময় হয়ে উঠেছে।
খানিক আগে তার দিকে বর্শা উঁচিয়ে ধরেছিল সেঙাই, তাদের শত্রুপক্ষের ছেলে। জোহেরি বংশের উদ্ধত যৌবন। তামাভ দেহ, কানে নীয়েঙ গয়না। পিঙ্গল চোখে ভয়াল সৌন্দর্য। সেঙাইর সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনেছে লিজোমুর কাছে, পলিঙার কাছে। তাদের ছোট পাহাড়ী জনপদ সালুয়ালাঙের অনেক যুবতী সেঙাইর রূপে মাতাল। দূর থেকে দেখেই মজে গিয়েছে। তারা। তাদের মুখে সেঙাইর গল্প শুনে শুনে কামনায় আর চেতনায় একটা রমণীয় ছবি এঁকেছে মেহেলী। আজ প্রথম সে দেখল শত্রুপক্ষের যৌবনকে–সেঙাইকে। তার কামনার মানুষটিকে।
চারিদিকে একবার চনমনে চোখে তাকাল মেহেলী। আশ্চর্য, সেঙাই নেই। একটু আগে এই নিঝুম ঝরনা, এই নিবিড় বন, এই খাড়াই উপত্যকার পটভূমি থেকে কী এক ভোজবাজিতে যেন মুছে গিয়েছে সে। যে পথ দিয়ে সেঙাই চলে গিয়েছে, সেদিকে অনেক, অনেকক্ষণ আবিষ্ট নজরে তাকিয়ে রইল মেহেলী। তারপর একটা পাহাড়ী ময়ালের মতো ফোঁস ফোঁস করে কয়েকটা নিশ্বাস ফেলল।
