সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের মুখগুলো থেকে নীলচে আগুনের সঙ্গে গুলি এবং গর্জন ছুটল, বুম্-ম্-ম্–, বু-ম্-ম্-ম্–
জোহেরি কেসুঙের চত্বরে গোটাকয়েক নারীদেহ লুটিয়ে পড়ল। তীক্ষ্ণ মরণকাতর গলায় ককিয়ে উঠল ওরা, আ-উ-উ-উ, আ-উ-উ-উ, আ-উ-উ-উ–
একটা গুলি সেঙাই-এর কবজি ফুঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। হাত থেকে বর্শাটা খসে পড়েছে। কপালের দু’পাশে সমস্ত রগগুলো একসঙ্গে লাফাচ্ছে। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সেঙাই, সব ঝাপসা হয়ে আসছে। টলতে টলতে পড়ে গেল সে। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল মেহেলী, সে-ও পাশে বসে পড়েছে। চোখ দুটো তার জ্বলছে। হাউ হাউ করে চেঁচাতে চেঁচাতে, কাঁদতে কাঁদতে সে বলছে, তোকে ওরা মারল সেঙাই, তোকে ওরা খুঁড়ে ফেলল! উরুর ওপর সেঙাইর মাথাটা তুলে নিল মেহেলী।
টিলার গায়ে একটা ভীষণতা দাপাদাপি করছে। একটা অট্টহাসি আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে। বসওয়েল চিৎকার করছে, গ্রেট ওয়ার ফেরত লোক আমি। হিলি প্যাগানদের লাস্ট ফোর্টরেস আমার দখলে। আই হ্যাভ কঙ্কারড, আই অ্যাম ডিক্লেয়ার্ড ভিক্টর। হাঃ-হাঃ-হাঃ–স্পিয়াব দিয়ে বন্দুকের সঙ্গে লড়াই করতে এসেছে শয়তানগুলো!
হো-য়া-য়া-য়া-আ-আ–
হো-য়া-য়া-য়া-আ-আ–
নানকোয়া এবং সালুয়ালাঙের জোয়ানগুলো এতক্ষণ টিলার গায়ে ওত পেতে ছিল। এবার সমস্ত কেলরি গ্রাম এবং চারপাশের বনভূমি চমকে দিয়ে চিৎকার করে উঠল। তারপর দ্রুত চড়াই বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
তাজা পাহাড়ী রক্তে জোহেরি কেসুঙের চত্বরটা ভিজে গিয়েছে। রক্তের মধ্যে নারীদেহগুলি থরথর কাঁপছে। কেলুরি গ্রামের অন্যান্য মেয়েরা বর্শা হাতে সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
সকলের আগে আগে ছুটে এল বসওয়েল। কেলুরি গ্রামের লাস্ট ওয়ারফ্রন্টে তার পা পড়ল।
হো-য়া-য়া-য়া-আ-আ—
হো-য়া-য়া-য়া-আ-আ—
টিলার গা বেয়ে একটা উন্মাদ ঝড় উঠে আসছে।
জোহেরি কেসুঙের ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল বুড়ি বেঙসানু। সাপের জিভের মতো লিকলিকে পিঙ্গল রঙের চুল উড়ছে। ভুরুতে লোম নেই। হলদে ছানিপড়া চোখে ঘোলাটে তারাদুটো ধকধক করছে। উলঙ্গ শুকনো দেহ, হাড়গুলো উৎকটভাবে চামড়া ছুঁড়ে বেরিয়েছে। বুকের দু’পাশে একজোড়া স্তন ঝুলছে। পাটকিলে রঙের মাড়ি দেখা যাচ্ছে। নোংরা ক্ষয়া দাঁতের পাটি ফাঁক হয়ে রয়েছে। গালের পাশ দিয়ে জিভ বেরিয়ে পড়েছে। উত্তেজনায় শুকনো বুকটা ফুলছে যুঁসছে উঠছে নামছে। হাতের মুঠিতে মস্ত এক কুড়াল। রাগে আক্রোশে দাঁতগুলো আপনা থেকেই ঘষে ঘষে শব্দ হচ্ছে। বুড়ি বেঙসানু সামনের দিকে আরো অনেকটা এগিয়ে এল। তীক্ষ্ণ আর ভাঙা গলায় গর্জে উঠল, ইজা হুতা! রামখোর বাচ্চারা, আমাদের বস্তির এতগুলো মানুষকে খুঁড়লি! আমার নাতি হুই সেঙাইকে খুঁড়লি! আজ তোদের সব কটার ঘাড় থেকে মুণ্ডু খসাব। হু-হু, আমার ছেলে সিজিটো শয়তানটা ছিল সায়েবচাটা। ওটা বলত, সায়েবদের গায়ের রং হুন্টসিঙ পাখির পালকের মতো সাদা। নির্ঘাত তোরা সেই সায়েব। এই কেলুরি বস্তি থেকে তোদের আর জান নিয়ে ফিরতে হবে না। দম নেবার জন্য একটু থামল বেঙসানু। তারপর আবার চিৎকার শুরু করল, আহে ভু টেলো। মর মর। সালুয়ালাঙ বস্তির শয়তানগুলো এসেছিস। তোরা আমার সোয়ামীর জান নিয়েছিলি, তোদেরও রহাই দেব না। আপোটিয়া।
একটা অপঘাত ছুটে আসছে। টিলা বেয়ে উঠে আসতে আসতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল বসওয়েল। চওড়া, বিশাল বুকটার মধ্যে হৃৎপিণ্ড দুরুদুরু করে উঠল। বেশ বোঝা যাচ্ছে, ধমনীর ওপর এক ঝলক রক্ত উছলে পড়ল। গলাটা কেঁপে গেল বসওয়েলের, উইচ, শুয়োরলি আ উইচ। ওহ ক্রাইস্ট! হাউ হরিবল! হাউ ডেঞ্জারাস!
বুড়ি বেঙসানু নামে পাহাড়ী বিভীষিকাটা ছুটতে ছুটতে টিলার শেষ মাথায় এসে পড়ল। একটানা চেঁচাতে চেঁচাতে বলল, আমি এখনও বেঁচে রয়েছি। দেখি কী করে জোহেরি বংশের ইজ্জত নষ্ট করিস! আয়, বেজন্ম না হলে এগিয়ে আয়। আজ তোদের একটাকেও ফিরতে দেব না। আমরা জানে খতম হয়ে গেলেও বস্তির ইজ্জতে হাত দিতে দেব না। আয় সায়েব শয়তানেরা। আমার ছেলে হুই সিজিটোটাকে কোহিমায় নিয়ে তোরা তার মাথা খেয়েছিস। সে আর আমার কাছে আসে না। আমার নাতি হুই সেঙাইটাকে তোরা ফুড়লি! আয় সালয়ালাঙের কুত্তারা। তোরা আমাদের তিনপুরুষের শর। তোদেরও সাবাড় করব। টেমে নটুঙ!
নিস্পন্দ দাঁড়িয়ে রয়েছে পুলিশ সুপার বসওয়েল। তার পেছনে থমকে রয়েছে নানকোয়া এবং সালুয়ালা গ্রামের অসংখ্য জোয়ান।
বসওয়েল ভাবছিল, পাহাড়ী ইজ্জত, গ্রাম-সমাজ এবং নারীর মর্যাদাবোধ এখানে কী উগ্র! কী সাঙ্ঘাতিক! টিলার মাথায় একটি শুকনো নীরস নারীদেহে সেই ইজ্জত এবং মর্যাদাবোধ দাবাগ্নির মতো জ্বলছে।
ওপাশ থেকে সালুয়ালা গ্রামের সর্দার চিৎকার করে উঠল, ডাইনি ডাইনি, নির্ঘাত ডাইনি। সায়েব, ওকে ছুঁড়ে ফেল, মেরে ফেল। নইলে ও সবাইকে সাবাড় করে ফেলবে।
পাহাড়ীদের ভাষা ঠিকমতো বোঝে না বসওয়েল। কিন্তু সালুয়ালাঙের সর্দারের চিৎকারে নিষ্ক্রিয় ভাবটা নিমেষে ঘুচে গেল। বুড়ি বেঙসানু সোঁ সোঁ করে ছুটে আসছে। কর্তব্য স্থির করে ফেলল বসওয়েল। কেলুরি গ্রামের লাস্ট ওয়ারফ্রন্ট তাকে দখল করতেই হবে। শিরায় শিরায় রক্তের কণিকাগুলি আগ্নেয় ধাতুস্রোতের মতো ছুটতে ছুটতে ধমনীতে ঘা দিতে লাগল। কোমর থেকে রিভলভারটা টেনে বাগিয়ে ধরল বসওয়েল। ট্রিগারের ওপর মোটা রোমশ তর্জনীটা চেপে বসল। পুরু পুরু ঠোঁট দুটো হিংস্র ভঙ্গিতে বেঁকে গেল।
