আরো, আরো অনেকটা এগিয়ে এসেছে বুড়ি বেঙসানু।
উইচ, স্টপ! বসওয়েল গর্জে উঠল। গর্জনের রেশটা বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে ছড়িয়ে পড়ল। তারপরেই রিভালভারের নলের মুখ দিয়ে খানিকটা নীল আগুন ছুটে গেল, বুম্-ম্-ম্-ম্–
বেঙসানুর দুটো জীর্ণ স্তনের নিচে এবং বুকে চোখা চোখা হাড় প্রকট হয়ে রয়েছে। হাড় এবং চামড়ার খাঁচার মধ্যে ছোট্ট হৃৎপিণ্ড ধুকধুক করে বাজছে। সেই হৃৎপিণ্ডটা কুঁড়ে রিভালভারের নীল আগুন বেরিয়ে গেল।
আ-উ-উ-উ-কাতর শব্দ করে টিলার ওপর লুটিয়ে পড়ল বেঙসানু।
হাঃ-হাঃ-হাঃ–ভয়াল অট্টহাসি বাজল বসওয়েলের গলায়, এনি ফারদার রেজিস্টান্স, ওয়াইল্ড বিস্টস? হাঃ-হাঃ-হাঃ
ঠাকুমা, ঠাকুমা–কাতর গলায় বার দুই গুঙিয়ে উঠল সেঙাই। শরীর এবং মন থেকে
চেতনা লোপ পেয়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো আপনা থেকেই বুজে বুজে আসছে। মেহেলীর উরুতে ভর দিয়ে উঠে বসতে চাইল সেঙাই। অসহ্য যন্ত্রণায় শিরা-স্নায়ু-হাড়-মাংস সব যেন ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ছে। কবজির হাড়টা বুঝি চুরমারই হয়ে গিয়েছে। ফিসফিস, আবছা গলায় সেঙাই। ডাকল, মেহেলী–
কী বলছিস সেঙাই? দ্রুত মুখটা নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে মেহেলী জিগ্যেস করল।
আমার বর্শাটা একবার দে তো।
কেন?
শয়তানদের ফুঁড়ব।
তুই পারবি না সেঙাই। আমার কোলে চুপ করে শুয়ে থাক। দেখছিস না, কত রক্ত পড়েছে তোর?
পারব, খুব পারব। গোঙাতে গোঙাতে নির্জীব হয়ে পড়ল সেঙাই। আর কথা বলল না, বলতে পারল না।
চোখের পাতাদুটো দুখণ্ড পাথরের মতো ভারী হয়ে গিয়েছে। কিছুতেই চোখ খুলে রাখতে পারছে না সেঙাই। উজ্জ্বল তামাটে মুখখানা ফ্যাকাসে, নীরক্ত হয়ে গিয়েছে।
মেহেলী নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেঙাই-এর দিকে। কেলুরি গ্রামের দুর্দান্ত জোয়ান তার উরু দুটোর মধ্যে এখন নির্জীব হয়ে পড়ে রয়েছে। তবে কি সেঙাই মরে গেল? আশঙ্কায় বুকের ভেতরটা দুরু দুরু করে উঠল। সেঙাইর দুকাধ ধরে প্রবল ঝকানি দিল মেহেলী। সমস্ত দেহে যন্ত্রণা জ্বালা এবং আতঙ্কের ভঙ্গি ফুটিয়ে তীব্র, অতি তীব্র, অতি তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, সেঙাই, সেঙাই–
কোনো জবাব দিল না সেঙাই।
মেহেলী আবার ডাকল। ভীত, উত্তেজিত স্বরটাকে অনেক উঁচুতে তুলে সমানে চেঁচাতে লাগল, সেঙাই–সেঙাই–
অনেকক্ষণ পর আবছা গলায় সেঙাই বলল, কী?
তুই খতম হয়ে গেলি?
হু—হু–
সেঙাই, এই সেঙাই—
আবার থেমে গিয়েছে সেঙাই। সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
শিরায় শিরায় তীব্র বেগে রক্তের ধারা ছোটাছুটি করছে মেহেলীর। জখমী ময়ালীর মতো তার চোখজোড়া জ্বলছে। হিংস্র, বলিষ্ঠ, বুনো জোয়ানী সে। আরণ্যক প্রকৃতির ক্রুরতা, ভীষণতা এবং দুর্বার জীবনবেগের মধ্যে সে মানুষ হয়েছে। হত্যা, প্রতিহিংসা, চরম আক্রোশ এবং প্রচণ্ড ক্রোধ–আদিম জীবনের স্কুল এবং অতি স্পষ্ট প্রবণতাগুলি উত্তরাধিকার সূত্রে ও নিজের জৈবিক প্রয়োজনের তাড়নায় জোগাড় করে নিয়েছে মেহেলী।
দুই উরুর মাঝখানে মাথা রেখে অসাড় পড়ে রয়েছে সেঙাই। সাহেবরা তাকে খুঁড়েছে। তাজা ঘন রক্তে সমস্ত দেহ মাখামাখি। সেঙাই-এর রক্ত তার উরুতে এবং হাতে লেগে রয়েছে। মেহেলী কি জানত, সেঙাই নামে শত্রুপক্ষের অনাত্মীয়, স্বল্পজানা জোয়ানটাকে কেউ ফুঁড়লে কি মারলে তার কষ্ট হয়, ভয়ানক সাঙ্ঘাতিক রাগ হয়, দুচোখ জ্বালা করতে থাকে।
পাতলা চামড়ার নিচে চাপবাঁধা মাংসপিণ্ড এবং শিরা-উপশিরায় কী যেন সমানে ফুঁসছে। স্নায়ুতে স্নায়ুতে একটা শ্বাপদ যেন অবিরাম হুঙ্কার ছাড়ছে। আবার চেঁচিয়ে উঠল মেহেলী, তোকে ওরা মারল সেঙাই! হুই শয়তানের বাচ্চারা খুঁড়ল!
দেহটা অল্প অল্প কাঁপছে। বড় বড় শ্বাস পড়ছে। চোখের পাতা দুটো সামান্য ফাঁক হয়েছে। নির্জীব, প্রায় শোনা যায় না, এমন গলায় সেঙাই বলল, হু-হু–
আমি হুই টেফঙের বাচ্চাদের সাবাড় করব। তুই আমার পিরিতের জোয়ান। পনেরো দিন পর তেলেঙ্গা সু মাসে তোর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। তুই আমার সোয়ামী হবি। আর তোকে ওরা ফুড়ল! একটাকেও আজ রেহাই দেব না। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কাঁদতে লাগল মেহেলী। শরীরটা কাঁপছে, নড়ছে, ঝকানি খেয়ে দুলে দুলে উঠছে। হাউ হাউ কান্নাটা বিকট শব্দ করে বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।
পাহাড়ী মানুষের শোক প্রকাশের রীতিই আলাদা। এরা প্রবল শব্দ করে কাঁদে, চেঁচায়। সেই সঙ্গে শোকের কারণের বিপক্ষে অভিযোগ করে, আক্রোশ জানায় এবং প্রতিহিংসা নেবার। চেষ্টা করে। শোকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিমূঢ়, বিহ্বল হয়ে প্রতিশোধপ্রবণ বন্য প্রকৃতির কথা ভোলে না।
একটু পর আবার ডাকল মেহেলী, ওরা সবাইকে মারল। তোর ঠাকুমাকে মারল। বস্তির ঘরে ঘরে আগুন ধরাল। তোকেও খতম করল। কী হবে সেঙাই? আমাদের কি বিয়ে হবে না?
চোখের পাতা দুটো বুজে আসছে আবার। তবু সব যন্ত্রণা ঝেড়েকুড়ে শরীরটাকে দুমড়ে বেঁকিয়ে উঠে বসতে চাইল সেঙাই। পারল না। কাঁধে চাপ দিয়ে তাকে আবার শুইয়ে দিল মেহেলী।
ক্ষীণ গলায় সেঙাই বলল, নির্ঘাত তোর আর আমার বিয়ে হবে।
হঠাৎ জোহেরি কেসুঙটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে ভীত সন্ত্রস্ত গলায় চিৎকার করে উঠল মেহেলী, সেঙাই সেঙাই, হুই শয়তানের বাচ্চারা উঠে আসছে। সামনে একটা আনিজা। আমার বড্ড ভয় করছে।
