মনে মনে শঙ্কিত হল ম্যাকেঞ্জি। এই পাহাড়ী মানুষগুলোকে বিশ্বাস নেই। গোঁ যখন ধরেছে তখন সেঙাই যে খুব নিরীহ ধরনের কিছু করবে, এমন ভরসা হচ্ছে না। বুকটা ধক করে উঠল, চোখের কোণটা সামান্য কোঁচকানো। কিন্তু হাসিটা তেমনই সারা মুখে ছড়িয়ে রইল। মোলায়েম গলায় বলল, আমি কি তোমাদের মেরেছি? আসান্যুরা মেরেছে।
ইজা হুবুতা! দাঁত খিঁচিয়ে চেঁচাল সেঙাই, রানী আমাদের বলেছে, তোরা, সায়েব শয়তানেরা বলিস বলেই আসান্যুরা আমাদের মারে। আয় টেফঙের বাচ্চা, তোর মুণ্ডু নিয়ে আজ মোরাঙের সামনে গেঁথে রাখব।
একটু একটু করে ম্যাকেঞ্জির মুখ থেকে হাসি মুছে গেল। কপালে মাকড়সার জালের মতো অসংখ্য জটিল রেখা ফুটে বেরিয়েছে। অনেক, অনেককাল আগে ব্রেটনব্রুকশায়ারের এক সাঙ্ঘাতিক আউট লর ছায়া এসে পড়েছে দুটো কটা চোখের মণিতে। সারপ্লিসের কোনো কোটরে অদৃশ্য হয়েছে বাদামি রঙের জপমালাটা। আশ্চর্য শান্ত এবং নিস্পৃহ সুরে ম্যাকেঞ্জি বলতে লাগল, দেখছ তো সেঙাই, তোমাদের গ্রামে আসা আর পুলিশরা কেমন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। বর্শা-তীর-ধনুক দিয়ে তোমরা আমাদের রুখতে গিয়েছিলে। পুলিশের বন্দুকের গুলিতে গোটাকয়েক সাবাড় হতে, বাকি সকলে জঙ্গলে পালাল। বুঝতেই পারছ, বর্শা কুড়াল দিয়ে বন্দুকের সঙ্গে তোমরা লড়তে পারবে না। ভালোয় ভালোয় বলছি, গাইডিলিওকে বার করে দাও।নইলে আসান্যুরা তোমাদের–একটা ভয়ানক ইঙ্গিত দিয়ে সেঙাইর দিকে তাকাল বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি।
সেঙাই বলল, রানী চলে গেছে বস্তি থেকে।
কোথায় গেছে?
তা আমরা জানি না।
তোমাদের কতবার বলেছি, ওই গাইডিলিওটার সঙ্গে মিশবে না, ওকে বস্তিতে ঢুকতে দেবে না। গাইডিলিও হল ডাইনি, রক্ত চুষে সবাইকে সাবাড় করবে।
ভীষণ উত্তেজিত গলায় চেঁচিয়ে উঠল সেঙাই, মিছে কথা, মিছে কথা। গাইডিলিও হল রানী। তোরা, তোরা ডাইনি। কোহিমায় যখন গিয়েছিলাম তোরা আমাকে মেরেছিলি। হুই রানী আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। গাইডিলিওকে ডাইনি বললি, এখুনি তোকে সাবাড় করব।
অত্যন্ত আচমকা, মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেল ঘটনাটা। সেঙাইর থাবা থেকে বর্শাটা সাঁ করে ছুটে গেল। বাঁকা খারে বর্শার ফলা ম্যাকেঞ্জির কণ্ঠায় গেঁথে গেল।
ওহ ক্রাইস্ট, মারডার মারডার। মিস্টার বসওয়েল, সেভ মি, সেভ মি। ওহ-হ-হ–প্রাণফাটা আর্তনাদ করে উঠল ম্যাকেঞ্জি। ফিনকি দিয়ে তাজা রক্তের ফোয়ারা সারা সারপ্লিসটাকে লাল করে দিতে লাগল।
প্রথমে বিচলিত এবং হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল বসওয়েল। জীবনে অনেক কিছু দেখেছে, মহাযুদ্ধের ধ্বংস এবং নির্বিচার হত্যা তার চোখের সামনে ঘটেছে। কোনোদিনই সামান্য রক্তপাতে সে অধীর হয়ে পড়ে না। স্নায়ুমণ্ডলীর জোর তার অসাধারণ। কিন্তু এমন একটা ঘটনা তার জীবনে যতটা অভিনব, তার চেয়ে অনেক বেশি আকস্মিক এবং উন্মাদনাকর। মস্তিষ্কের সমস্ত বুদ্ধি এবং বিনাশকামী মনের অন্যান্য অপুষ্ট অনুভূতিগুলি দিয়ে কিছুতেই বসওয়েল বুঝে উঠতে পারছে না, কেমন করে একটা পাহাড়ী জোয়ান বন্দুক এবং রিভলবার সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বর্শা ছুঁড়তে পারে! এ যেন তাকেই, তার মারাত্মক জবরদস্ত অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। সূক্ষ্ম এবং সাঙঘাতিক এক খোঁচা লাগল বসওয়েলের দম্ভে।
ঢালু উতরাই। ধারাল রুক্ষ পাথর। সেখানে লুটিয়ে পড়েছে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। বিরাট, মেদপুষ্ট দেহটা থরথর কাঁপছে। ম্যাকেঞ্জির তাজা মিশনারি রক্ত এই কেলুরি গ্রামের, এই অ্যাডোলেট্রির পাহাড়ী জগৎকে স্নান করাচ্ছে। আর এক ক্রাইস্ট! এতক্ষণ আকাশ ফাটিয়ে আর্তনাদ করছিল ম্যাকেঞ্জি। এবার গলাটা ক্ষীণ হয়ে আসছে। গোঁ গোঁ শব্দে গোঙাচ্ছে, থেমে থেমে অনেকক্ষণ পর পর বলছে, মিস্টার বসওয়েল, মারডার মারডার। আমাকে মেরে ফেলল। ওহ ক্রাইস্ট, আমি আর বাঁচব না।
টিলার গায়ে নানকোয়া এবং সালুয়ালা গ্রামের জোয়ান ছেলেরা এবং তাদের পেছনে অসমীয়া-বিহারী-মণিপুরী পুলিশের ঝাক নিশ্চল, স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। ওত পেতে সুযোগের অপেক্ষা করছে।
বসওয়েলের রুক্ষ কর্কশ মনে এই মুহূর্তে কেমন করে যেন অদ্ভুত এক উপমার জন্ম হল। এই গ্রামের প্রতিটি বাড়িই এক-একটা দুর্গ। ওপরের ওই বাড়িটা আদিম মানুষের শেষ দুর্গ। দুটো পাহাড়ী জোয়ান এবং অসংখ্য অর্ধনগ্ন মেয়েমানুষ বর্শা কুড়াল-তীর-ধনুক বাগিয়ে দুৰ্গটাকে পাহারা দিচ্ছে। আর তারা, সভ্য জগতের মানুষ, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত, আদিম বর্বরদের শেষ দুর্গ দখল করতে এসেছে। সভ্য জগতের সঙ্গে আদিম জগতের লড়াই। মনে মনে নিজের রসবোধে মুগ্ধ হয়ে গেল বসওয়েল। একটু হাসল। মোহিত হয়ে হাসলেও তাকে কী ভয়ঙ্করই না দেখায়!
কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র, তার পরেই রক্তে রক্তে গ্রেট ওয়ার নেচে উঠল যেন। চোখের সামনে দিয়ে হুস হুস করে মিছিলের মতো সরে সরে যেতে লাগল হত্যা, রক্ত, আর্তনাদ, ফ্লাইং ফাইটার আর অ্যান্টি এয়ারক্রাফটের গর্জন এবং অসংখ্য ওয়ারফ্রন্ট।
হা, ওয়ারফ্রন্টই বটে। ওই ওপরের বাড়িটা এই গ্রামের লাস্ট ফ্রন্টিয়ার। লাস্ট সিটাডেল। চোখের কপিশ মণিদুটো ধকধককরে জ্বলে উঠল বসওয়েলের। এই নাগাপাহাড়ে এমন একটা ওয়ারফ্রন্ট তারই জন্য অপেক্ষা করছিল, আগেভাগে কি তা জানত বসওয়েল? প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠল বসওয়েল, ফায়ার–
