সালুয়ালাঙের সর্দারের পাশ থেকে সাঞ্চামখাবা খেঁকিয়ে উঠল, এই মেহেলী, এই মাগী, টেফঙের বাচ্চা, শিগগির নেমে আয়। সেই গদা সু মাসে নানকোয়া বস্তির রাঙসুঙের কাছ থেকে বউপণ নিয়েছি। আর তুই কিনা এই বস্তিতে এসে সেঙাই শয়তানটার সঙ্গে পিরিত জমিয়েছিস! শিগগির আয়। বস্তিতে নিয়ে দুঠ্যাঙ ধরে ফেড়ে ফেলব, গায়ের ছাল উপড়ে নেব। তারপর তেলেঙ্গা সু মাসে মেজিচিজুঙের সঙ্গে বিয়ে দেব।
তীব্র, ধারাল গলায় মেহেলী চিৎকার করে উঠল, মেজিচিজুঙের সঙ্গে আমার বিয়ে দিবি। কক্ষনো না। তেলেঙ্গা সু মাসে সেঙাইর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। তুই ওদের নিয়ে বস্তিতে ফিরে যা বাপ, নইলে খুনোখুনি হবে।
টেমে নটুঙ! খুনোখুনি হবে! খুনোখুনিতে কি সাঞ্চামখাবা ভয় পায়! আমার বুকে পাহাড়ী রক্ত নেই! কলিজায় তাগদ নেই? হু-হুক্রুর চোখে তাকাল সাঞ্চামখাবা। বলল, তোদের দুটোকেই আজ ছুঁড়ে নিয়ে যাব। বলতে বলতে খাড়া পাহাড়ী টিলার গা বেয়ে বেয়ে ওপর দিকে উঠতে লাগল সে।
হোয়া–আ-আ-আ—
হো-য়া-য়া-য়া-আ-আ–
জোয়ানদের গলা থেকে উত্তেজিত, ভয়ানক শব্দটা পাক খেয়ে খেয়ে আকাশের দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
সালুয়ালা গ্রামের সর্দার বলল, এই শয়তানের বাচ্চা সেঙাই, একদিন তোর ঠাকুদ্দার রক্ত দিয়ে আমাদের মোরাঙের দেওয়ালে চিত্তির করেছিলাম; আজ তোর রক্ত দিয়ে
সর্দারের কথা শেষ হবার আগেই ব্যাপারটা ঘটল। মস্ত বড় এক খণ্ড পাথর তুলে নিল বুড়ি বেঙসানু। মাংসহীন লিকলিকে হাতে দেহের সবটুকু শক্তি একত্র করে ছুঁড়ে মারল। নির্ভুল লক্ষ্য। পাথরের খণ্ডটা সালুয়ালা গ্রামের বুড়ো সর্দারের মাথায় গিয়ে পড়ল। চড়াত করে একটা শব্দ হল। খুলি ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। আকাশ ফাটিয়ে আর্তনাদ করে উঠল সালয়ালা গ্রামের সর্দার, আ-উ-উ-উ-উ-মেরে ফেলল আমাকে। শয়তানের বাচ্চাটা আমাকে খতম করল। ওদের ছুঁড়ে ফেল, সাবাড় কর। টিলার গা বেয়ে গড়াতে গড়াতে নিচে গিয়ে পড়ল সে।
হামাগুড়ি দিয়ে অনেকটা উঠে এসেছিল সাঞ্চামখাবা। হঠাৎ থমকে গেল। আর জোহেরি কেসুঙের উঠোনে দাঁড়িয়ে ভাঙা কর্কশ গলায় একটানা অশ্রাব্য গালাগালিতে দুপুরটাকে ভরিয়ে তুলল বুড়ি বেঙসানু। সমানে গজগজ করতে লাগল, আমার সোয়ামীর মুণ্ডু নিয়েছিলি। তার শোধ তুললাম। এগিয়ে আয়, আরো কটাকে সাবাড় করি।
সর্দারকে পাথরের ঘা খেয়ে নিচে পড়তে দেখে জোয়ান ছেলেরা বেশ দমে গিয়েছিল; টিলা বেয়ে উঠতে উঠতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে তারা। হতভম্ব ভাবটা কেটে যাবার পর সকলে সমস্বরে শোরগোল করে উঠল হো-য়া-য়া-য়া-আ-আ, হো-য়া-য়া-য়া-আ-আ–
এবড়োখেবড়ো, রুক্ষ টিলাটা বেয়ে বেয়ে আবার সকলে জোহেরি বংশের বাড়িটার দিকে উঠতে লাগল।
সেঙাই চেঁচিয়ে উঠল, খুব হুঁশিয়ার শয়তানেরা। আর এগুবি না। মায়ের ছানা মায়ের কাছে ফিরে যা। যারা বিয়ে করেছিস, বউর কাছে ভাগ। নইলে রেহাই দেব না কাউকে।
আমাদের সদ্দারকে মেরেছিস। বিশটা মাথা নিয়ে শোধ তুলব। নিচে থেকে সাঞ্চামখাবা গর্জে উঠল, মেহেলীকে এতদিন বস্তিতে আটকে পিরিত করেছিস, সেই জন্যে তোর মাথাটা নেব সবার আগে।
রাঙসুঙের ছেলে মেজিচিজুঙ হামাগুড়ি দিয়ে দ্রুত এগুতে শুরু করল। টিলাটার মাথায় জোহেরি কেসুঙের উঠোনে মেহেলী নামে এক রমণীয় পাহাড়ী যুবতী দাঁড়িয়ে আছে। তার উজ্জ্বল তামাভ দেহে, সুঠাম চিকণ মাজায়, নির্ভাজ উরুতে, মসৃণ চামড়ায়, নিটোল গলায় অফুরন্ত স্বাস্থ্য এবং যৌবন বিচ্ছুরিত হয়ে রয়েছে। এর আগে কোনদিনই মেহেলীকে দেখেনি মেজিচিজুঙ। তার বাপ রাঙসুঙ মেহেলীর সঙ্গে তার বিয়ের জন্য বউপণ দিয়ে এসেছিল। এটুকুই তার জানা। মেহেলীকে দেখতে দেখতে মেজিচিজুঙের চাপা কুতকুতে চোখজোড়ায় বিস্ময় ফুটল। মনে মনে সে স্থির করে ফেলল, যেমন করে হোক, যত রক্তপাতই ঘটুক, মেহেলীকে তার চাই। ধমনীতে রক্তের কণাগুলো ঝনঝন করে বাজতে লাগল তার। নিশ্বাস ঘন হল। কামনাতুর নিষ্পলক চোখে মেহেলীর দিকে তাকিয়ে পিঠ বেঁকিয়ে আরো দ্রুত টিলা বাইতে লাগল মেজিচিজুঙ।
সেঙাই এবং ওঙল তাক করার জন্য বর্শা মাথার ওপর তুলে ধরেছিল। কিছু একটা ঘটে যেত, রুক্ষ টিলার গা বেয়ে তাজা টকটকে রক্তের ঢল নামতে পারত, কিন্তু তার আগেই বসওয়েল আর ম্যাকেঞ্জি দলবল নিয়ে এসে পড়ল।
চমকে উঠল ম্যাকেঞ্জি। কোহিমায় এত মার খেয়েও সেঙাই মরেনি। নিমেষে চমকটা ঝেড়ে ফেলে সে চেঁচিয়ে উঠল, এই সেঙাই, থামো থামো, বর্শা ছুড়ো না–
টিলার গায়ে জোয়ান ছেলেরা আবার থমকে গেল।
সেঙাই হুমকে উঠল, বর্শা ছুড়ব না! সবার আগে তোকে খুন করব শয়তানের বাচ্চা। আয়, এদিকে আয় একবার। কেলুরি বস্তিতে সদ্দারি ফলাতে এসেছিস! হুই সব এখানে চলবে না।
বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না ম্যাকেঞ্জি। ঠোঁটে আটকানো সেই হাসিটা অতি দ্রুত সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল। সস্নেহ সুরে বলল, আমি বুড়ো মানুষ, টিলা বেয়ে উঠতে পারব না। তুমিই নেমে এসো। অনেক কথা আছে। অনেক কাপড় আর টাকা এনেছি তোমাকে দেব বলে।
সেঙাই সমানে চেঁচাতে লাগল, তুই একটা আস্ত টেফঙের বাচ্চা। টাকা চাই না, তোর কাপড়ে মুতে দি। ওপরে আয়, তোকে খুঁড়ি। কোহিমায় মেরেছিলি, তার বদলা নেব। তোকে আজ ফুড়বই।
