কেন থাকতে বলেছে এখানে?
কেন আবার? বস্তির মাগীদের ইজ্জত বাঁচাবার জন্যে।
.
৪৬.
টিলার ফাঁক থেকে, পাথরের খাঁজ থেকে, উঁচুনিচু উতরাই-এর আশপাশ থেকে আগুন জিভ মেলছে আকাশের দিকে। মোরাঙ পুড়ছে, চাল-দেওয়াল-পাটাতন পুড়ছে, গাছের আগায় কুমারী মেয়েদের শোওয়ার ঘরগুলি পুড়ছে। পাহাড়ী মানুষগুলো তাদের অস্ফুট মনের কামনা বাসনা দিয়ে, অফুরন্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা দিয়ে ঘর বানিয়েছিল। সব পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সংসার ভেঙে তছনছ হচ্ছে।
বসওয়েলের মনের বৃত্তিগুলির মধ্যে বিনাশকামিতাই বুঝি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ এবং স্পষ্ট। মহাযুদ্ধ-ফেরত বসওয়েল। নির্বিচার হত্যা, ধ্বংস এবং তাণ্ডবের মতো উত্তেজক নেশা তার কাছে আর কিছু নেই। তার বন্দুকের গুলি যখন মানুষের পাঁজর ভেদ করে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটায়, তার নির্দেশে মানুষের সাজানো-গোছানো গ্রাম-জনপদ যখন পুড়ে ছারখার হয়ে যায়, নিরাশ্রয় পশুর মতো সচকিত সন্ত্রস্ত হয়ে চারিদিকে মানুষ যখন পালাতে থাকে, তখন অবর্ণনীয় উল্লাসে বসওয়েলের মন ভরে যায়। ধ্বংস করার প্রবৃত্তিটা তার মনে এত প্রবল, এত সযত্নে লালিত হয়েছে যে অন্যান্য সুকুমার বৃত্তিগুলি মোটেই পুষ্টিলাভ করেনি।
চারপাশে আগুন এবং ধ্বংস। দু-চারটে গুলিবিদ্ধ মৃতদেহও এপাশে ওপাশে পড়ে আছে। নেশাটা মোটামুটি মন্দ জমেনি। রাক্ষসের মতো টিলায় টিলায় দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে। বসওয়েল। তার প্রচণ্ড অট্টহাসি পাথরে পাথরে ঘা লেগে উৎকট এবং ভীষণ শোনাচ্ছে, হাঃ হাঃহাঃ। উন্মত্তের মতো হেসে চলেছে সে। আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, কি ফাদার, ঘরে ঘরে আগুন ধরিয়ে দিলাম। কিন্তু কোথায়, গাইডিলিও কোথায়? পুলিশরা দু-চারটেকে গুলি করে মেরেছে, বাকি পাহাড়ীগুলো কোথায় যে ভাগল! পেলে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ঠিক খবর আদায় করতাম। ওই হেডম্যানটাকে জিগ্যেস করুন ব্যাপারটা কী।
পেছনে দাঁড়িয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সমানে মালা জপছে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। কটা চোখে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। কিছু একটা জবাব সে দিত। কিন্তু তার আগেই সালুয়ালা গ্রামের সর্দার চিৎকার করে উঠল, হুই, হুই যে সেঙাই। হুই যে মেহেলী। ইজা হুবতা!
চক্ষের পলকে ঘটে গেল ঘটনাটা। টিলার মাথা থেকে বিরাট খারে বর্শাটা আকাশের দিকে তুলে ধরল সালুয়ালা গ্রামের সর্দার। তার পরেই নিচের উতরাইতে লাফিয়ে পড়ল। তার পেছন পেছন অসংখ্য পাহাড়ী জোয়ানও লাফ দিল। তাদের হাতের থাবায় ঝকমকে বর্শা, মাথায় আউ পাখির পালকের মুকুট, কোমর থেকে জানু পর্যন্ত ডোরাকাটা পী মুঙ কাপড়। পেশীপুষ্ট তামাটে দেহগুলো উতরাই বেয়ে ঢলের মতো নেমে গেল। তাদের সঙ্গে নামল একটানা ভীষণ, ভয়ঙ্কর গর্জন, হো-য়া-য়া-আ-আ, হো-য়া-য়া-আ-আ-আ–
ঘটনাটা এত দ্রুত এবং আকস্মিকভাবে ঘটল যে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি বিমূঢ়ের মতো হতবাক দাঁড়িয়ে রইল। এমনকি বসওয়েলের অট্টহাসিও থেমে গেল।
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকার পর ম্যাকেঞ্জি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল, কুইক মিস্টার বসওয়েল, ওদের মধ্যে খুনখারাপি বাধলে আমাদের উদ্দেশ্য বানচাল হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি চলুন।
পেছন দিকে তাকিয়ে বসওয়েল হুঙ্কার ছাড়ল, টুপস, কুইক মার্চ, ডাউন দ্য হিল। সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিক নির্দেশ করল, কুইক
টিলার ওপর থেকে প্রথমে লাফ দিল বসওয়েল। তার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাকেঞ্জি, মণিপুরী বিহারী-অসমীয়া পুলিশের ঝক এবং ইউরোপীয় সার্জেন্টের দল। ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটে যাবার আগেই তাদের জোহেরি কেঙে পৌঁছুতে হবে। যেমন করে হোক।
ওদিকে জোহেরি কেসুঙের সামনে পাটকিলে রঙের বিরাট টিলাটার তলায় এসে থমকে দাঁড়াল সালুয়ালা গ্রামের বুড়ো সর্দার। তার পেছনে নানকোয়া গ্রামের রাঙসুঙ, তার ছেলে মেজিচিজুঙ এবং মেহেলীর বাপ সাঞ্চামখাবা। আর সবার পেছনে দুই গ্রামের পাহাড়ী জোয়ানেরা।
দূর থেকে বুড়ি বেঙসানুরা সালুয়ালা গ্রামের সর্দারদের ছুটে আসতে দেখেছিল। মুহূর্তে মেয়ে বউরা ঘরের দেওয়াল থেকে তীর-ধনুক কুড়াল এবং বাঁকা খারে বর্শা নিয়ে সেঙাই আর ওঙলের পাশে এসে দাঁড়াল। আদিম মানুষ এবং আদিম মানুষী। সকলের হাতে মৃত্যুমুখ অস্ত্র ঝকমক করছে। এমন সব ভয়ঙ্কর মুহূর্তে অর্ধনগ্ন পাহাড়ী মেয়েরা পুরুষের পাশে অন্তরঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। হত্যা এবং মৃত্যু সমান অংশে বাঁটোয়ারা করে নেয়।
টিলার ভাঁজে একটা ক্রুদ্ধ হিংস্রতা যুঁসছে। গর্জে চলেছে একটানা।
হো-য়া-য়া-য়া-আ-আ—
হো-য়া-য়া-য়া-আ-আ–
দীর্ঘ বাঁকানো খারে বর্শার ফলা। আকাশের দিকে সেটাকে বাগিয়ে সেঙাই চিৎকার করে উঠল, শয়তানের বাচ্চারা, খবদ্দার। না বলে বস্তিতে ঢুকেছিস! ওপরে উঠলে সাবাড় করে ফেলব। জানের মায়া থাকলে ভেগে পড়।
ঝাকড়া মাথা ঝাঁকিয়ে সালুয়ালাঙের সর্দার গর্জে উঠল, ভাগব! তোর ভয়ে ভাগব নাকি রে রামখোর ছা? সেবার টিজু নদী থেকে তোর ঠাকুদ্দার মাথা কেটে নিয়ে গিয়েছিলাম। এবার তোদের ঘর থেকেই বর্শার মাথায় তোর মুণ্ডুটা গেঁথে নিয়ে যাব।
সেঙাই-এর ঠিক পাশেই মস্ত বড় একটা কুড়াল হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেহেলী। চোখের পাতা কোঁচকানো, তারা দুটো জ্বলছে। স্তনে, চুলে, উরুতে, সুডৌল গলায় সাঙসু ঋতুর রোদ চিকচিক করছে। মেহেলী তীক্ষ্ণ, টানা গলায় বলল, ভেগে পড় সদ্দার। নইলে ঘাড়ের ওপর তোর মাথা থাকবে না। যা, ভাগ।
