একটু আগে শব্দ করে আমুদে হাসি হাসছিল ওঙলে। এখন তাকে বিষয় এবং সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে। মাথা নেড়ে সে বলল, ঠিক বলেছিস সেঙাই। আমরা হেরেই গেছি।
আচমকা উত্তর দিকের আকাশে লকলকে আগুন দেখা দিল। প্রথম উত্তর, তারপর দক্ষিণ, তারও পর পশ্চিম দিকের আকাশ ঘিরে ক্রমে ক্রমে লেলিহান আগুন সমস্ত গ্রামটাকে ঘিরে ধরতে লাগল।
টিলায় টিলায়, মস্ত মস্ত পাথরের খাঁজে, চড়াই এবং উতরাইতে কেলুরি গ্রামের ঘরবাড়িগুলো ছড়ানো ছিটানো। ছোট ছোট ঘর। আতামারি পাতার ছাউনি, ওক কাঠের পাটাতন, চারপাশে আস্ত আস্ত বাঁশের দেওয়াল। ঘরের চালে চালে আগুনের ফণা নেচে বেড়াচ্ছে। বাঁশের গাঁটগুলো ফাটছে। ফটফট শব্দ হচ্ছে। আতামারি পাতার চাল পুড়ে পুড়ে উৎকট গন্ধ বেরুচ্ছে। ঘরপোড়া ছাই উড়ে উড়ে যাচ্ছে। উত্তর-দক্ষিণ-পশ্চিমছোট্ট পাহাড়ী গ্রামটার তিন দিক থেকে কান্না-চিৎকার-আর্তনাদের শব্দ পাকিয়ে পাকিয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে, আ-উ-উ-উ-উ, আ-উ-উ-উ-উ, আ-উ-উ-উ-উ। মাঝে মাঝে বুম্-ম্-ম্ বুম্-ম্-ম্ আওয়াজ হচ্ছে। হল্লা এবং শোরগোলের মিশ্র শব্দ ভেসে আসছে। সব মিলিয়ে একটা ভয়ঙ্কর তাণ্ডব।
আর টিলায় টিলায়, চড়াই-এর মাথায় মাথায় ভারী পা ফেলে ছোটাছুটি করছে পুলিশ সুপার বসওয়েল। মাথার চুল উড়ছে, রিভলবার বাগিয়ে উন্মাদের মতো অট্টহাসি হাসছে সে। মনে হয়, বসওয়েলের ঘাড়ে প্রেতাত্মা ভর করেছে। বাঁশের গাঁট ফাটার শব্দ, হল্লা-চিৎকার গোঙানির শব্দ, গুলির শব্দ, সব ছাপিয়ে তার উন্মত্ত গলা পর্দায় পর্দায় চড়ছে, গাইডিলিও ড্যামনড় উইচ, ডার্টি উম্যান। কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারিস, আমি একবার দেখব।
বসওয়েলের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। বিডসের ওপর আঙুলগুলো পরম নির্বিকার। কপালের একটি রেখাও স্থানচ্যুত হয়নি। এমনকি ঠোঁটের সেই হাসিটুকু পর্যন্ত অবিচল।
পুব দিকে জোহেরি বংশের এই বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে গ্রামপোড়া আগুন দেখছিল সেঙাই
আর ওঙলে। দেখতে দেখতে অপরিসীম আতঙ্কে বিহ্বল এবং আড়ষ্ট হয়ে পড়েছিল।
হঠাৎ ঘরের মধ্যে নারীকণ্ঠের আর্তনাদ উঠল, আগুন আগুন। এই সেঙাই এই ওঙলে, হুই পশ্চিম দিকেই তো আমাদের ঘর! সব পুড়ে বুঝি ছারখার হল।
একজন বলল, পাঁচ খুদি ধান আর জোয়ার রেখে এসেছি। পরশু রাত্তিরে টাটকা রোহি মধু বানিয়েছি। সব পুড়ে গেলে তেলেঙ্গা সু মাসটা চলবে কেমন করে?
আর-একটি গলা শোনা গেল, বাচ্চা ছেলেটাকে শুইয়ে রেখে এসেছি ঘরের মধ্যে। নির্ঘাত পুড়ে মরছে। ইজ্জত দিয়ে কী হবে? আমার বাচ্চা চাই।
ঘরের ভেতর থেকে উল্কার মতো বাইরে বেরিয়ে এলে একটি অর্ধনগ্ন নারীদেহ; চক্ষের পলকে সামনের বড় টিলার আড়ালে অদৃশ্য হল।
নারীকন্ঠের চিৎকার তুমুল হয়ে উঠেছে। উত্তর-দক্ষিণ-পশ্চিম, খোখিকেসারি বংশ, জোরি বংশ, গুসেরি, সোচারি, লোহেরিনানা বংশের ঘরবাড়ি পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে নিরুপায়, অসহায় আক্রোশে ফুলতে লাগল সেঙাই এবং ওঙলে।
.
পুব দিকের খাড়া চড়াই বেয়ে সেঙাইদের কাছাকাছি এসে পড়ল বুড়ি বেঙসানু, ফাসাও আর নজলি। দিনকয়েক আগে তিন পাহাড়ের ওপারে কোনিয়াকদের গ্রাম ফচিমাঙে কুটুম বাড়ি গিয়েছিল তারা। অনেকখানি উঁচুনিচু দুর্গম পাহাড়ী পথ ভেঙে এসেছে। রীতিমতো হাঁপাতে শুরু করল বুড়ি বেঙসানু। জিভ বেরিয়ে পড়েছে। জীর্ণ, শুকনো স্তন দুটো ঘন ঘন নিশ্বাসের তালে তালে উঠছে, নামছে। বেঙসানু বলল, তার গলায় ভীত কৌতূহলের সুর, এই সেঙাই, এই ওঙলে, ব্যাপার কী? চড়াই ডিঙিয়ে আসতে আসতে আগুন নজরে পড়ল। তাই দেখে ছুটতে লাগলাম। এখন তো জঙ্গল পোড়াবার সময় নয়। তা হলে বস্তিতে আগুন ধরেছেনাকি?
আগুন ধরে নি। সায়েবরা ধরিয়ে দিয়েছে।
সায়েবরা ধরিয়ে দিয়েছে। ইজা হুতা! শয়তানদের খুঁড়ে ফেল সেঙাই। কুড়ুল দিয়ে কুপিয়ে সাবাড় কর ওঙলে। উত্তেজনায়, রাগে বুড়ি বেঙসানুর গলার স্বয় কয়েক পর্দা চড়ে ভয়ানক শোনাতে লাগল। নিশ্বাস দ্রুততর হল তার। বুকটা আরো জোরে তোলপাড় হচ্ছে। ঘোলাটে চোখের অস্পষ্ট তারা দুটো লাল হয়ে উঠল।
তার আর উপায় নেই ঠাকুমা। কিছু করতে পারলে কি আর এখানে দাঁড়িয়ে আছি? একটু থেমে লম্বা দম নিয়ে সেঙাই বলতে লাগল, আমরা হেরে গেছি সায়েবদের কাছে। সদ্দার জোয়ান ছোকরাদের নিয়ে সায়েবদের রুখতে গিয়েছিল। সবাইকে সাবাড় করে সায়েরা বস্তিতে ঢুকেছে। একটু আগে পিঙলেই, ফামুসা আর যাসেমু মোরাঙের দিকে ছুটে পালাল। ওদের গা থেকে দরদর করে রক্ত পড়ছিল।
আহে ভু টেলো! আনিজা তোদের ঘাড় মুচড়ে রক্ত খাক।দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বুড়ি বেঙসানু খেঁকিয়ে উঠল, শয়তানের বাচ্চারা, এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস! বস্তির সবাই লড়াই করে মরল, আর তোরা এখানে জানের ডরে লুকিয়ে রয়েছিস! থুঃ থুঃএকদলা থুতু সেঙাই এবং ওঙলের মুখে ছুঁড়ে মারল বুড়ি বেঙসানু।
বেঙসানুর সাড়া পেয়ে ঘর থেকে মেয়েরা বেরিয়ে এসেছে। চারপাশ থেকে বুড়ি বেঙসানু, ওঙলে এবং সেঙাইকে ঘিরে ধরেছে। সকলের মুখচোখে আতঙ্কের ছায়া।
বেঙসানু আবার খেঁকিয়ে উঠল, কেলুরি বস্তির ইজ্জত তোরা ডুবিয়ে দিলি।
সেঙাই বলল, সদ্দারই তো আমাদের এখানে থাকতে বলেছে। লড়াই করতে যাব কেমন করে?
