হু-হু– পালকের মুকুট নেড়ে সালুয়ালাঙের সর্দার বলল, আমি নিজের চোখে দেখেছি। দু’দিন এই বস্তিতে ছিল গাইডিলিও। রাত্তির বেলা লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিয়েছি, ডাইনিটা আর কোথাও পালায় কিনা।
গ্রামের মধ্যে কাউকেই তো দেখছি না। সব গেল কোথায়?
বন্দুকের আওয়াজ শুনে নির্ঘাত জঙ্গলে ভেগেছে। দেখলি না, শয়তানের বাচ্চারা আমাদের ফুঁড়তে গিয়েছিল। গুলি খেয়ে কটা পড়তেই বাকিগুলো জঙ্গলে পালাল। সালুয়ালা গ্রামের সর্দার ক্ষয়া, হলদে ছোপধরা দাঁত বার করে আমোদের হাসি হাসল। বলল, হু-হু, টেফঙের বাচ্চারা বন্দুকের সঙ্গে লড়াই করতে এসেছে বর্শা দিয়ে! থুঃ থুঃ–রুক্ষ টিলাটার মাথায় একদলা থুতু ছিটিয়ে দিল সর্দার। আবার শুরু করল, ফাদার, তুই আমাদের মেহেলীটাকে এনে দে। নইলে বস্তির ইজ্জত আর থাকছে না। অঙ্গামীরা ধান বদল করছে না; সাঙটামরা কোদাল, মাটির হাঁড়ি কি উল্কির রং দিচ্ছে না। মাগীটাকে ছিনিয়ে দে আমাদের। এই দ্যাখ না, নানকোয়া বস্তির রাঙসুঙ এসেছে। ওর ছেলে মেজিচিজুঙের সঙ্গে মেহেলীর বিয়ে দেবে। এই জন্যে একশোটা খারে বর্শা বউপণ দিয়ে গেছে। মেহেলীকে মেজিচিজুঙের সঙ্গে বিয়ে না দিলে নানকোয়া বস্তির সঙ্গে আমাদের লড়াই বেধে যাবে।
বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির ঠোঁটে হাসিটুকু আগের মতোই আটকে রয়েছে। মোটা মোটা, রোমশ আঙুলের নিচে জপমালাটা থামল না। স্নিগ্ধ, মধুর গলায় সে বলল,
নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। মেহেলীকে তোমরা ঠিক পাবে, কিন্তু গাইডিলিওকে তো আমাদের চাই।
হু-হু। সালুয়ালাঙের সর্দার সায় দিল।
তা হলে এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। গ্রামের ভেতর চল। খুঁজে বার করতে হবে তোমাদের মেহেলী আর আমাদের গাইডিলিওকে। আমরা এই বস্তির কিছুই চিনি না। কোথায় কী আছে, জানি না। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চল।
হু-হু, চল ফাদার। আমি তো আছি, এ বস্তির সব কিছু চিনি। অনেক দিন আগে আমাদের সালুয়ালাঙ আর এই কেলুরি মিলিয়ে একটা মস্ত বড় বস্তি ছিল। তার নাম কুরগুলাঙ। ছোটবেলায় কতবার এসেছি এই বস্তিতে। চল ফাদার, চল–আমি সব দেখিয়ে দিচ্ছি।
বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি বসওয়েলের দিকে তাকাল। বলল, চলুন পুলিশ সুপার, ভেতরে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে।
চলুন। চওড়া ঘাড়খানা ঘুরিয়ে চারিদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভরাট গমগমে গলায় বসওয়েল বলল, টুপস, খুব সাবধান। পাহাড়ীগুলোকে দেখামাত্র গুলি করবে। গাইডিলিওকে না পেলে এই পাহাড়ের সবাইকে আমি খুন করব। দেখি, পাই কিনা। আর ইয়াস, ওই ঘরে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেবে। পাহাড়ী কুত্তীটা কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে, আমিও দেখব।
ভারী ভারী পা ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে এল পুলিশ সুপার বসওয়েল। তার পাশে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। পেছন পেছন ইউরোপীয় সার্জেন্টদের দল, অসমীয়া-বিহারী-মণিপুরী পুলিশের আঁক। তাদের পেছনে নানকোয়া এবং সালুয়ালা গ্রামের জোয়ান ছেলেরাও এগিয়ে আসছে।
বেয়নেট, রাইফেল ও রিভলবারের নল এবং বর্শার মাথায় মাথায় ধারাল রোদ জ্বলছে। শক্ত পাথুরে টিলায় বুটের শব্দ হচ্ছে। খট, খট, খট, খট।
জোহেরি কেসুঙের উঠোন থেকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রয়েছে সেঙাই আর ওঙলে।
সেঙাই বলল, রামখোর বাচ্চারা যে বক্তির মধ্যে ঢুকে পড়ল রে ওঙলে!
দাঁতে দাঁত ঘষে অস্ফুট শব্দ করল ওঙলে। বলল, তাই তো দেখছি।
আচমকা জোহেরি কেসুঙের মধ্যে চিৎকার করে উঠল মেহেলী। বাঁশের দেওয়ালের ফাঁকে চোখ রেখে সে সাহেব-পুলিশ বর্শা বন্দুক, সব দেখে ফেলেছে। কিছুক্ষণ পর নির্জীব গলায় মেহেলী বলল, এই সেঙাই, আমাদের সালুয়ালাঙ বস্তি থেকে সর্দার এসেছে, বাপ এসেছে। বাঘ-মানুষ মেজিচিজুঙ এসেছে। হুই শয়তানটাই তো আমাকে বিয়ে করতে চায়। ওরা যে আমাকে খতম করে ফেলবে।
এত মানুষ, সাহেব, নানকোয়া এবং সালুয়ালা গ্রামের অসংখ্য জোয়ান, মণিপুরী অসমীয়া বিহারী পুলিশ, তাদের বর্শা বন্দুককুড়াল দেখতে দেখতে খুবই ভয় পেয়েছে সেঙাই। বুকের মধ্যে শ্বাস আটকে আটকে আসছে। চোখের তারা দুটো অসাড় হয়ে যাচ্ছে। এমন সময় মেহেলীর কথাগুলো কানে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া ঘটে গেল। স্কুল পৌরুষবোধে সাঙ্ঘাতিক ঘা লেগেছে। চোখজোড়া জ্বলে উঠল। চড়া, তীক্ষ্ণ গলায় সেঙাই চেঁচিয়ে উঠল, চুপ কর মাগী। আমি আছি না? আমার হাতে এই বর্শা থাকতে কেউ তোকে ছুঁতে পারবে না। এফোঁড়-ওফোড় করে ফেলব।
হঠাৎ কালচে মাড়িসমেত দু’পাটি দাঁত বার করে, বিকট শব্দ করে হাসতে লাগল ওঙলে। হাসির দমকে তার বলিষ্ঠ পেশল দেহটা কাঁপছে, ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। আবার টান টান খাড়া হয়ে যাচ্ছে। ওঙলে বলল, ভালোই হল সেঙাই, খুব ভালো। হুই সায়েবরা, হুই সালুয়ালাঙের শয়তানেরা আসায় মেজাজটা খাসা হয়ে গেল।
কেন?
কেন আবার?হাসি থামিয়ে উত্তেজিত গলায় ওঙলে আবার বলতে লাগল, তুই আমাদের বক্তির সেরা জোয়ান আর মেহেলী হল সালুয়ালাঙ বস্তির সেরা মেয়ে। তোদের বিয়েতে কম করে তিন কুড়ি মাথা ধড় থেকে না নামলে জুত হয়! একটু থেমে কপাল-ভুরু কুঁচকে বলল, রামখোর বাচ্চারা কেমন করে বস্তির ভেতর ঢুকল বল তো সেঙাই?
আমরা হেরে গেছি। নইলে ওরা ঢুকবে কেমন করে? সদ্দারটার দেখা নেই। সেটা হয়; মরেছে, নয় তো জঙ্গলে পালিয়েছে। হুই যে শুনলি না খো কু-ঙ-গা-আ-আ-। হেরে। গেলেই তো জোয়ানেরা অমন করে চেঁচায়।
