আর্তনাদটা শুনে ভীষণভাবে চমকে উঠল সেঙাই এবং ওঙলে। কান খাড়া করে ভাবতে লাগল, ভুল শুনছে না তো। নাঃ, কোনো ভুল নেই। সঙ্গে সঙ্গে বুকের মধ্যে অন্তরাত্মা থরথর কাঁপতে শুরু করল। পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল দুজনে। ওই চিৎকারের মধ্যে একটা অনিবার্য ইঙ্গিত রয়েছে। কেলুরি গ্রামের বাধা চুরমার হয়েছে। তাদের প্রতিরোধ তছনছ করে সাহেবরা ছুটে আসছে, তাদের সঙ্গে আসছে সালুয়ালাঙের শয়তানেরা। কেলুরি গ্রামের বীরত্ব, গর্ব, দুঃসাহসের গৌরব এবং দম্ভ ভেঙেচুরে একটা অপঘাত ধাওয়া করে আসছে যেন। আর উপায় নেই।
খো-কু-ঙ-ঙ-গা-আ-আ—পাহাড়ী যুদ্ধের পরিচিত সংকেত। লড়াইয়ে হেরে গ্রামের দিকে পালিয়ে আসার সময় জোয়ান ছেলেরা এমন শব্দ করে।
কেলুরি গ্রামের জোয়ানেরা হেরে পালিয়ে আসছে।
খো-কু-ঙ-ঙ-গা-আ-আ—ছোট পাহাড়ী গ্রামটা ঘিরে কাতর কান্নার শব্দ পাকিয়ে পাকিয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।
জোহেরি কেসুঙের উঠোনে ভয়ে আশঙ্কায় স্তব্ধ হয়ে বসে রয়েছে ওঙলে ও সেঙাই। একসময় ফিসফিস, সন্ত্রস্ত গলায় ওঙলে বলল, কি রে সেঙাই, আমরা তা হলে হেরে গেলাম। সেবারও হেরেছিলাম, সালুয়ালাঙ বস্তির শয়তানেরা তোর ঠাকুরদার মুণ্ডু কেটে নিয়ে গিয়েছিল। আর এবার হারলাম সায়েবদের কাছে।
তাই তো দেখছি। আবছা গলায় সেঙাই বলল।
খো-কু-ঙ-ঙ-গা-আ-আ—
ঘরের মধ্যে বুড়ি-ছুঁড়ি-বউ-বাচ্চা তুমুল চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে। কান্না, চিৎকার, অশ্রাব্য গালাগালি–সরু মোটা ঘড়ঘড়ে এবং তীক্ষ্ণ গলার মিশ্র শব্দ দলা পাকিয়ে একাকার হয়ে বাঁশের দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে। মেয়েরা ভয় পেয়েছে ভীষণ, মারাত্মক ভয়।
ভেতর থেকে মেহেলী বলল, এই সেঙাই, বস্তির জোয়ানরা যে পালিয়ে আসছে! কী হবে?
সেঙাই এবং ওঙলে কেউ জবাব দিল না। হতবাক, দাঁড়িয়ে রইল দুজনে।
আচমকা দক্ষিণ প্রান্তের সেই পাটকিলে ন্যাড়া টিলাটার পাশ থেকে পিঙলেই আর খোখিকেসারি বংশের দুটো জোয়ান ছেলে-ফামুসা এবং যাসেমু উঠে এল। তাদের সমস্ত দেহে তাজা রক্তের ছোপ লেগে রয়েছে। তিনজনে সাঁ করে সামনের একটা ছোট ভাঁজ পেরিয়ে মোরাঙের দিকে ছুটে পালাল।
সেঙাই চেঁচিয়ে উঠল, এই পিঙলেই, এই ফানুসা, এই যাসেমু, কী ব্যাপার? কী হয়েছে? এই শয়তানের বাচ্চারা–
একজনও উত্তর দিল না, মুহূর্তে ওরা মোরাঙের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।
পিঙলেইদের দিকে তাকিয়ে ছিল ওঙলেও। মুখ ফিরিয়ে সে ফুঁসে উঠল, দেখছিস সেঙাই, ওদের গায়ে কী রক্ত! নির্ঘাত সায়েবরা মেরেছে। এর বদলা
আরো কিছু হয়তো বলত ওঙলে। বিশ্রী মুখভঙ্গি করে খানিকটা চেঁচামেচি করত, গালাগালিতে সাঙসু ঋতুর দিনটাকে কদর্য করে তুলত। লাল লাল, অসমান দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠত, কিন্তু তার আগেই পাটকিলে টিলাটার পাশ থেকে দুটো ভয়ঙ্কর মুখ উঁকি দিল। পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি এবং পুলিশ সুপার বসওয়েল। দুটো মুখই কী হিংস্র না দেখাচ্ছে এখন। স্নেহ মায়া করুণা নামে মিগ্ধ সুকুমার বৃত্তিগুলির কোনো চিহ্নই নেই সে-মুখে।
চারিদিকে ভালো করে তাকিয়ে, যাচাই করে, বিপদের আশঙ্কা নেই বুঝে, বুকে হেঁটে হেঁটে টিলার মাথায় উঠে এল বসওয়েল এবং ম্যাকেঞ্জি। তাদের পেছন পেছন এল একদল মণিপুরী
বিহারী-অসমীয়া পুলিশ। এল জনকতক সাদা মানুষ। সকলের হাতেই রাইফেল এবং রিভলভার। ট্রিগারের ওপর তর্জনীগুলো নির্মমভাবে চেপে রয়েছে। সকলের সঙ্গে উঠে এল বৈকুণ্ঠ চ্যাটার্জি। তার পাশে সালুয়ালা গ্রামের বুড়ো সর্দার। এসেছে মেহেলীর বাপ সাঞ্চামখাবা। এসেছে নানকোয়া গ্রামের রাঙসুঙ এবং তার ছেলে মেজিচিজুঙ। কতদিন হল একশোটা খারে বর্শা তারা বউপণ দিয়ে গিয়েছে মেহেলীর বাপকে। এই পাহাড়ের মেহেলী নামে সেরা মেয়েটিকে তাদের চাই। সকলের পেছনে নানকোয়া এবং সালুয়ালা গ্রামের সব কটা জোয়ান ছেলে লম্বা লম্বা বর্শা বাগিয়ে এসেছে।
চাপা বীভৎস গলায় বসওয়েল বলল, খুব সাবধান, এই হিলি বিস্টগুলো কিন্তু মারাত্মক। কখন কোথা থেকে যে বিষমাখা তীর ছুঁড়ে বসবে, তার ঠিক নেই। বি কেয়ারপুল, চারদিকে নজর রাখ। অবশ্য গ্রেট ওয়ার ফেরত লোক আমি, আমাকে ঘায়েল করা অত সহজ নয়। বিশাল মাংসল মুখখানায় আত্মপ্রসাদ এবং দম্ভের হাসি নেচে বেড়াতে লাগল বসওয়েলের। কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র। তারপরেই গর্জে উঠল বসওয়েল, এক ঘন্টা ধরে গুলি ছোঁড়া হচ্ছে। পাহাড়ী বিস্টগুলো মরল, জখম হল, কিন্তু গাইডিলিও কোথায়? কোথায় সেই শয়তানী? আই মাস্ট র্যানস্যাক দা এনটায়ার ভিলেজ। ডাইনিটাকে ধরতেই হবে। আচ্ছা ফাদার, এই সর্দারটা ভুল খবর দেয়নি তো? আমি আবার ওদের ভাষা পুরোপুরি বুঝি না। একটু থেমে বলল, আমার এক-একসময় সন্দেহ হয়, গাইডিলিও বলে কেউ আছে কিনা। একটা মিরেজের পেছনে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি বোধ হয়। উঃ, হরিবল! গ্রেট ওয়ারের লোক আমি। জীবনে অনেক আজব অভিজ্ঞতা হয়েছে, কিন্তু আপনাদের এই নাগা পাহাড়ে টু চেজ দিস হিল উইচ আমি হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি ফাদার। হয়রান হয়ে পড়েছি। এত পাহাড়ী মানুষ মরল, জখম হল, কিন্তু শয়তানীটাকে বাগেই পাচ্ছি না। আপনার সর্দারকে জিগ্যেস করুন, গাইডিলিও কোথায়?
বসওয়েলের কথাগুলোতে ম্যাকেঞ্জির মনে কী প্রতিক্রিয়া হল, আদৌ হয়েছে কিনা, মুখ দেখে তা বুঝবার উপায় নেই। বসওয়েলের দিকে তাকিয়ে কপাল বুক বাহু ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে ক্রস আঁকল। ঠোঁটে সূক্ষ্ম, নির্লিপ্ত হাসিটুকু লেগেই রয়েছে। একটু পর মুখ ঘুরিয়ে শান্ত গলায়, নির্ভুল উচ্চারণে পাহাড়ী ভাষায় বলতে লাগল, কি হে সর্দার, তুমি ঠিক জানো তো, এই কেলুরি গ্রামে গাইডিলিও এসেছিল?
