খানিক পর ওঙলে বলল, এতকাল সদ্দারের মুখে খালি লড়াইর কথা শুনেছি। দু-একটা মাথা কাটা ছাড়া তেমন লড়াই দেখিওনি, করিওনি। আজ বড় মজা লাগছে রে সেঙাই। শব্দুরদের মুণ্ডু কেটে আগেকার মানুষদের মতো মোরাঙের সামনে গেঁথে রাখব। মোরাঙের দেওয়াল রক্ত দিয়ে চিত্তির করব। ভারি ফুত্তি হচ্ছে। তোর হচ্ছে না সেঙাই?
হু-হু। দুচোখ তুলে সেঙাই বলল, আমি কিন্তু অন্য কথা ভাবছি ওঙলে।
আবার কী ভাবছিস? ভাবনার ব্যারামে ধরেছে তোকে। বল, কী ভাবছিস? তামাটে চারকোনা মুখে বিরক্ত ভ্রুকুটি ফুটে বেরুল ওঙলের।
ঠিকই বলেছিস। ভাবনার ব্যারামেই আমাকে ধরেছে। একটু থেমে মাথার চুল খামচা মেরে ধরে সেঙাই বলল, শোন ওঙলে, ভাবছি এরপর কী হবে?
কিসের পর কী হবে?
হুই যে সদ্দার বলল, সায়েব আর সালুয়ালাঙ বস্তির শয়তানগুলোকে খতম করে মেহেলীর চামড়া উপড়ে ফেলবে। কী হবে বল দিকি? সেঙাই-এর মুখখানা বড়ই বিমর্ষ দেখাল।
ইজা হুতা! বউর চামড়ার কথা এখন থেকে ভাবতে শুরু করেছিস? মেহেলীর চামড়ার চেয়ে বস্তির ইজ্জত অনেক ওপরে। সেটা আগে বাঁচাতে হবে। সে কথা ভুলিস না সেঙাই। বলতে বলতে উঠে দাঁড়িয়ে সেঙাই-এর দুকাঁধ ধরে ঝকানি দিল ওঙলে।
কিছু একটা জবাব দিত সেঙাই, কিন্তু তার আগেই টিজু নদীর দিক থেকে সামনের উপত্যকা বেয়ে একটা তুমুল হল্লার রেশ ছুটে এল, হো-য়া-য়া-য়া-য়া–সঙ্গে সঙ্গে এক আঁক অপরিচিত এবং ভয়ঙ্কর শব্দ শোনা গেল, বুম্-ম্-ম্-ম্-বুম্-ম্-ম্-ম্–
আউ-উ-উ-উ–আউ-উ-উ-উ–জোয়ানদের তীক্ষ্ণ এবং অস্বাভাবিক গলার আর্তনাদ ভেসে এল।
ওঙলে শিউরে উঠল, সেঙাই চমকে উঠল। তারপর দুটো পাহাড়ী জোয়ানের শিরায় শিরায় রক্ত ফেনিয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। অজানা, অপরিসীম আতঙ্কে বুক ছমছম করছে। বিমূঢ় দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল ওঙলে এবং সেঙাই।
বুম্-ম্-ম্-ম্-বুম্-ম্-ম্-ম্–
আ-উ-উ-উ-উ–আ-উ-উ-উ-উ–
অপরিচিত সাআতিক ওই শব্দগুলো, পাহাড়ী জোয়ানদের আর্তনাদ, সব মিলিয়ে কী এক অশুভ সংকেত চারপাশ থেকে যেন চেপে ধরছে। সাঙসু ঋতুর উজ্জ্বল দিন, ঝলমলে রোদ, গুহাগোপন জলপ্রপাতের শব্দ–এই মুহূর্তে সব যেন থেমে যাচ্ছে, সব উজ্জ্বলতা নিভে আসছে।
ভেতরের ঘর থেকে জামাতসু বাইরে বেরিয়ে এল। তার পেছন পেছন এল মেহেলী। কাঁপা কাঁপা গলায় জামাতসু বললে, হুই সব কিসের শব্দ রে সেঙাই?
কী জানি। এমন ধরনের শব্দ কোনদিন শুনিনি।
মেহেলী বলল, আমার বড্ড ভয় করছে সেঙাই। জোয়ান ছেলেরা অমন করে ককাচ্ছে কেন রে?
ঠিক বুঝতে পারছি না।ভীরু, ভাঙা গলায় সেঙাই বলতে লাগল, তুই ঘরে যা মেহেলী। এখনও আমাদের বিয়ে হয়নি। তুই আমার সঙ্গে কথা বলছিস, সদ্দার টের পেলে আর রেহাই নেই। যা যা–
ঘরের ভেতর আমার ভয় করছে।
দাঁতমুখ খিঁচিয়ে কুৎসিত মুখভঙ্গি করল ওঙলে। খেঁকিয়ে খেঁকিয়ে বলতে লাগল, ভয় করছে! তা হলে পাহাড়ী মাগী হয়েছিস কেন? ভয় করছে, না পিরিতের জ্বালায় ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিস? বাইরে আমরা বসে আছি না? আমাদের না মেরে তোদের গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে? যা যা, ঘরে ঢোক। পনেরো দিন পর তেলেঙ্গা সু মাসে তোদর বিয়ে। বুর সইছেনা শয়তান দুটোর। ঠিক বলেছে সদ্দার, চামড়া উপড়ে নেবে তোর। যা যা, ঘরে ঢোক।
তাড়িয়ে তাড়িয়ে জামাতসু আর মেহেলীকে আবার ঘরে ঢুকিয়ে দিল ওঙলে।
বুম্-ম্-ম্-ম্–বুম্-ম্-ম্-ম্–
আকাশে বাতাসে সাঙসু ঋতুর পাখিরা ছড়িয়ে পড়েছে। বনের মাথা থেকে অসংখ্য পাখির ঝাঁক–আউ, গুটসুঙ, ইবাতঙ–ডানা মেলে উড়ে পালাচ্ছে। ওই অনভ্যস্ত, ভয়ানক শব্দগুলো কনভূমিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। দাঁতাল শুয়োরেরা দল বেঁধে ঘোঁত ঘোত করতে করতে ছুটছে। বুনো মোষ, সম্বর, চিতা বাঘ, নীলচে রঙের পাহাড়ী সাপ, সব ঊর্ধ্বশ্বাসে দিগ্বিদিকে পালাচ্ছে। দক্ষিণ পাহাড়ের খাদ পেরিয়ে অঙ্গামীদের জঙ্গলের দিকে ছুটেছে একদল চিতি হরিণ। এই পাহাড়ী বনের পশুজগৎ, তাদের এতকালের সাজানো সংসার ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলে যাচ্ছে।
জোহেরি কেসুঙের উঠোন থেকে সেঙাই এবং ওঙলে দেখতে লাগল, কেমন করে পাখি পশু-সাপ-পতঙ্গ ঝাঁক বেঁধে পালাচ্ছে।
ওঙলে বলল, নিঘাত খুনোখুনি বেধেছে রে সেঙাই। লড়াইটা বেশ জমেছে মনে হচ্ছে।
কী করে বুঝলি?
সদ্দার বলেছে, আমাদের পাহাড়ে যখন লড়াই জমে ওঠে, হই-হল্লায় বন থেকে বাঘ শুয়োর-সাপ বেরিয়ে আসে। ভারি মজাদার ব্যাপার, কিন্তু আমার বড় আপশোশ হচ্ছে।
কেন? সেঙাই-এর চোখদুটোয় কৌতূহল।
আপশোশ হবে না! তুই বড় বোকা সেঙাই। আমরা জোয়ান মরদ, আমাদের বস্তির সঙ্গে অমন খাসা লড়াই বেধেছে, সবাই বর্শা হাঁকাচ্ছে। আর এখানে বসে আমরা মাগীদের পাহারা দিচ্ছি। এখন পর্যন্ত একটা কোপ ঝাড়তে পারলাম না। হাতটা যা নিশপিশ করছে! ইজা হুবতা! উত্তেজনায় নিজের হাত কামড়াতে লাগল ওঙলে। তামাটে মুখটা ঝকমক করছে তার।
হু-হু, ঠিক বলেছিস। সেঙাই মাথা নেড়ে সায় দিল।
বুম্-ম্-ম্-ম্–বুম্-ম্-ম্-ম্–শব্দগুলো অনেকটা কাছাকাছি এসে পড়েছে।
কেলুরি গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে পাটকিলে রঙের যে ন্যাড়া টিলাটা রয়েছে, আচমকা তার পাশ থেকে ভাঙা গলার আর্ত চিৎকার ভেসে এল, খো-কু-ঙ-ঙ-গা-আ-আ—
