বুড়ো খাপেগা। কেলুরি গ্রামের নিষ্ঠুর ক্ষমাহীন অতীতের জীবন্ত মূর্তি। এই পাহাড়ের অমোঘ রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার, পাপপুণ্যের বোধ এবং নিরবধি কালের সমস্ত সামাজিক অনুশাসনের নিয়ামক।
কিছুক্ষণ পর আচমকা চিৎকার করে উঠল বুড়ো খাপেগা, হো-য়া-য়া-য়া-য়া, হো-য়া-য়া-য়া-য়া–বস্তির জোয়ানেরা, তোরা সবাই মোরাঙ থেকে তীরধনুক বর্শাদা-কুড়াল নিয়ে যা।
খবদ্দার, হুই শয়তানের বাচ্চারা যেন আমাদের বস্তিতে ঢুকতে না পারে।
অসংখ্য গলা থেকে একটা ভীষণ উত্তেজিত হুঙ্কার সাঙসু ঋতুর বাতাস চিরে ফেঁড়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুন্যে মিলিয়ে গেল, হো-য়া-য়া-য়া, হো-য়া-য়া-য়া–
হাতিয়ারের খোঁজে মোরাঙের দিকে ছুটে গেল জোয়ান ছেলেরা। একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল ওঙলে আর সেঙাই। বুড়ো খাপেগা বলল, আমরা হুই টিজু নদীর দিকে যাচ্ছি। তোরা দুজনে মাগীগুলোকে নিয়ে জোহেরি কেসুঙে যা। মেয়েদের ইজ্জত তোরা রাখবি। তাদের ইজ্জত নষ্ট হলে টেটসে আনিজা তোদের পাহাড় থেকে খাদে ফেলে মারবে। খবদ্দার ওঙলে, খুব সাবধান সেঙাই। |||||||||| হু-হু, তুই ঘাবড়াসনি সদ্দার। শয়তানেরা আমাদের বস্তির মেয়েদের গায়ে হাত তুললে জান নিয়ে ফিরতে হবে না। সেঙাই বলল। তার চোখজোড়া খ্যাপা বাঘের মতো ধকধক করছে।
ওঙলের দিকে ঘুরে সে আবার বলল, এই ওঙলে, মেয়েদের ডাক।
হো-য়া-য়া-য়া-য়া–
হো-য়া-য়া-য়া-য়া–
মোরাঙের দিক থেকে জোয়ানদের চিৎকার ভেসে আসছে। ওঙলে আর সেঙাই মেয়েদের নিয়ে ডান দিকের টিলাটা পেরিয়ে জোহেরি কেসুঙের পথে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সাঙসু ঋতুর উজ্জ্বল দিনটির ওপর অশুভ ছায়া এসে পড়েছে। ছোট্ট পাহাড়ী গ্রামটার বিনাশকামী আত্মার ভেতর থেকে একটা আদিম হিংস্র সত্তা আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে। বর্শার মুখে মুখে তাজা উষ্ণ রক্তের ফোয়ারা ছুটবে, কুড়ালের ঘা লেগে লেগে মানুষের মুণ্ডু ধড় থেকে খসে পড়বে–পাহাড়ী বন্য মানুষের বিচারে এর চেয়ে অমোঘ সত্য আর কী আছে? এখানে বেঁচে থাকাটাই সাঙ্ঘাতিক তাজ্জবের ব্যাপার। সব সময় মৃত্যু এবং হত্যার জন্য এখানে উত্তেজক প্রস্তুতি।
জোহেরি কেসুঙের দিকে যেতে যেতে সেঙাই বলল, রানী গাইডিলিও খুনখারাপি করতে বারণ করে গেছে। সায়েবরা মারলেও আমরা যেন না মারি। কিন্তু সদ্দার বোধ হয় সে কথা শুনবে না। দলবল নিয়ে সে তো টিজু নদীর দিকে ছুটল। কী হবে বল তো ওঙলে? আমরা কি রানীর কথাটা মানব না?
দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ওঙলে চেঁচিয়ে উঠল, আহে ভু টেলো! ওরা মারবে আর আমরা বুঝি পড়ে পড়ে মার খাব! হুই সব আবদার এই পাহাড়ে চলবে না। হু-হু, তোর কী হয়েছে, বল তো সেঙাই? একটু থেমে আবার, খুনটুন না করলে কিসের পাহাড়ী জোয়ান! মনে থাকে যেন, বস্তির মেয়েদের ইজ্জত সদ্দার আমাদের হাতে ছেড়ে গেছে। ওদের ইজ্জত বাঁচাতেই হবে। সেঙাইকে সতর্ক করে দিল ওঙলে।
হু-হু, ঠিক বলেছিস। বস্তির ইজ্জত, মাগীদের ইজ্জত, সব রাখতেই হবে। হুই সায়েবরা আসছে। কোহিমায় ওরা আমাকে মেরেছিল। সালুয়ালাঙের শত্তুররা আসছে, ওরা আমার ঠাকুরদার মুণ্ডু কেটে নিয়েছিল। সব কটাকে আজ বর্শার মাথায় গেঁথে রাখব। প্রতিহিংসায় চোখজোড়া জ্বলতে লাগল সেঙাইর-এর।
সকলকে চমকে দিয়ে বিকট গলায় আমোদের হাসি হাসল ওঙলে। বলল, এই তো পাহাড়ী মরদের মতো কথা বেরিয়েছে। মাঝে মাঝে খামোকা এমন করিস কেন বল তো? খুনোখুনির ব্যাপারে এত ভাবিস কেন? আমরা হলাম পাহাড়ী, এত ভাবাভাবি করলে আমাদের চলে! মনে যা আসে তাই আমরা করি। সুন্দরী মাগী দেখলে, তার সঙ্গে পিরিত জমাতে ইচ্ছে হলে তাকে আমরা ছিনিয়ে আনি। আচেনা মানুষ বস্তিতে দেখলে এফোঁড় ওফোড় করে ফেলি। বুনো মোষ কোপাই, বাঘ মারি। আগুনে শুয়োর ঝলসে রোহি মধু দিয়ে খাই আর ভোঁস ভোস করে ঘুমোই। এত ভাবাভাবি আমাদের ধাতে সয় না রে সেঙাই। অত ভাবতে গেলে মরেই যাবি। বলতে বলতে মেয়েদের তাড়া দিতে লাগল ওঙলে, এই মাগীরা, চল চল। পা চালা। সায়েবরা এসে পড়লে গতর দুলিয়ে চলা বেরিয়ে যাবে।
একটি মেয়ে পিছিয়ে পড়ছিল। তার দিকে তাকিয়ে ওঙলে বলল, কি রে ইখুজা, অত পেছনে আছিস কেন? সায়েব ভাতার করবার মতলব বুঝি?
ইখুজা একগাদা অশ্রাব্য, অকথ্য খিস্তি দিল। গালাগালিটা গায়ে মাখল না ওঙলে। হো হো করে হেসে উঠল।
দ্রুত পা ফেলে ফেলে জোহেরি কেসুঙের রুক্ষ পাথুরে উঠোনটায় এসে পড়ল সকলে। বিরাট এক খণ্ড পাথর উঠোনের ডান পাশ ঘিরে জোরি বংশের বাড়িটার দিকে উঠে গিয়েছে।
ওঙলে আবার বলল, এই মেয়েরা, ঘরে ঢোক। আমরা বাইরে আছি।
কেলুরি গ্রামের সব কটা জোয়ানী, কিশোরী, বুড়ি এবং বউ বাচ্চা সেঙাইদের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
আর বাইরে দু টুকরো বড় পাথরের ওপর জাঁকিয়ে বসল সেঙাই এবং ওঙলে। তাদের থাবায় দুটো লম্বা খারে বর্শা। রোদ পড়ে ধারাল ফলা দুটো ঝকমক করছে। দুজনের। ইন্দ্রিয়গুলো ধনুকের ছিলার মতো টান টান হয়ে রয়েছে। সতর্ক চোখে তারা এধারে ওধারে নজর রাখতে লাগল।
ওঙলে বলল, খুব সাবধান সেঙাই।
সেঙাই সামনের দিকে ঝুঁকে বর্শার ফলার ধার পরখ করতে করতে বলল, আমি ঠিক আছি। তুই সাবধান হ টেফঙের বাচ্চা, চারদিকে নজর রাখ।
একটু চুপচাপ। অস্বস্তিকর নীরবতা চারপাশ থেকে ঘনিয়ে এল। একবার কোথায় যেন আউ পাখি ককিয়ে উঠল। এ ছাড়া শব্দ নেই। অসহ্য গুমোট। ঝড়ো বাতাস এসে ওক বনে আজ বোধ হয় আর মাথা কোটাকুটি করবে না।
