গাইডিলিও আবার বললেন, দু’দিন তোমাদের গ্রামে রইলাম। তোমাদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না সর্দার।
বুড়ো খাপেগা ফের বলে উঠল, তুই থেকে যা রানী, তোর যদ্দিন খুশি।
একটু ম্লান হাসি ফুটল গাইডিলিওর মুখে, এখন আর তা হয় না সর্দার, যেদিন নিশ্চিন্তে এসে থাকতে পারব সেদিন আসব।
একসময় সকলে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে এসে পড়ল। বুড়ো খাপেগা সামনের দিকে ডান হাতখানা বাড়িয়ে বলল, হুই উতরাই ধরে চলে যা। তিনটে পাহাড় পেরিয়ে গেলে কোনিয়াকদের বস্তি ইটিগুচি পাবি। ওদের সদ্দারের কাছে আমার নাম বলবি। সে আমার দোস্ত। সেখানে তোদের কোনো ভয় নেই। হুই সায়েব শয়তানদের সাধ্যি নেই সেখানে গিয়ে তোদের গায়ে হাত তোলে।
উতরাই ধরে দু’পা নিচের দিকে নেমে গিয়েছিলেন গাইডিলিও। থেমে, পেছন ফিরে বললেন, পুলিশরা তোমাদের বস্তিতে আসছে। হয়তো অনেক অত্যাচার করবে। তোমরা কিন্তু ওদের মেরো না। তাতে আমাদের, এই নাগা পাহাড়ের ভীষণ ক্ষতি হবে।
এর পর নিচে নামতে লাগলেন রানী গাইডিলিও।
সামনে নিবিড় জটিল বন, প্রকৃতির অফুরান বদান্যতা। মধ্যে মধ্যে আঁকাবাঁকা ঝরনা, জলপ্রপাত এবং ছোট ছোট পাহাড়ী নদী। সেগুলোর মধ্য দিয়ে একটা পথ সোজা সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। একটি মাত্র পথ। দুর্গম এবং ভয়ঙ্কর।
চলতে চলতে মুখ উঁচু করে গাইডিলিও আকাশের দিকে তাকালেন।
৪৫. সাঙসু ঋতুর রোদ
৪৫.
উপত্যকায়, বনের মাথায়, পাহাড়ের চূড়ায় সাঙসু ঋতুর রোদ জ্বলছে। স্বচ্ছ নীলাকাশে ধূসর রঙের কয়েকটি বিন্দু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ওগুলো মরশুমি পাখি। গুটসুঙ, আউ আর ইবাতঙ পাখিরা বাতাসে সাঁতার কাটছে। সাঙসু ঋতুতে নাগা পাহাড়ের আকাশে এই সব পাখি দেখা যায়।
একটু আগেই পেছনের উতরাই বেয়ে নেমে গিয়েছেন গাইডিলিও। নাগা পাহাড়ের দিগদিগন্তে, গ্রামে-জনপদে, চড়াই-উতরাই-মালভূমি-উপত্যকায় সরল, বন্য মানুষের প্রাণে প্রাণে স্বাধীনতার প্রখর আকাঙ্ক্ষাটি বীজ-ফসলের মতো বুনে চলেছেন তিনি। লোটা, রেঙমা, সাঙটাম, আওলানা মানুষ, নানা জাতি, গোত্র, বংশ, কুল, নানা ভাষা-উপভাষার এই বিরাট বিস্তীর্ণ পাহাড়ী জগৎকে একটি শপথের মালায় গেঁথে ক্রমাগত ছুটছেন। সেই শপথের নাম স্বাধীনতা।
টোঘুটুঘোটা পাতার চাল, চারপাশে আও আও বাঁশের দেওয়াল, নিচে খাসেম কাঠের
পাটাতন। নতুন ঘরখানায় দু’দিন ছিলেন গাইডিলিও। ঘরটার সামনে পাহাড়ী মানুষের জটলাটা এখনও স্তব্ধ হয়ে রয়েছে।
একটু পরেই বুড়ো খাপেগা, সেঙাই এবং অন্যান্য জোয়ান ছেলেরা গাইডিলিওকে পথ দেখিয়ে দিয়ে ফিরে এল।
সারুয়ামারু ভীরু, কাঁপা গলায় বলল, কী হবে সদ্দার?
কিসের কী? নিরোম ভুরু দুটো কুঁচকে বুড়ো খাপেগা তাকাল।
হুই যে বললাম, সায়েব্রা আসছে। হু, কোহিমার সেই বড় ফাদার রয়েছে সামনে। সালুয়ালাঙ বস্তির সদ্দার রয়েছে। মণিপুরী পুলিশের হাতে বন্দুক রয়েছে। দূর থেকে একবার তাক করলে জানে লোপাট হয়ে যাব। কী হবে সদ্দার? সারুয়ামারুর পিঙ্গল চোখের মণিতে ভয়ের ছায়া। গলার স্বরটা কাঁপছে, আমার ভয় করছে সদ্দার।
বর্শার বাজুতে ঝকানি দিল বুড়ো খাপেগা। দুটো ঘোলাটে পিচুটিভরা নোংরা চোখ দপ করে জ্বলে উঠল। ভাঙা, ক্ষয়া শেষ দাঁত কটা কড়মড় শব্দে বাজল। খাপেগা হুমকে উঠল, ভয় করছে! ইজা হুবতা! তোকে আমিই সাবাড় করব। তুইনা পাহাড়ী জোয়ান! হুই শরদের। বস্তি থেকে আমাদের বস্তিতে না বলে কয়ে, না জানিয়ে শুনিয়ে ওরা এসে ঢুকবে, তা হবে না। লড়াই বাধাতেই হবে। তা নইলে আমাদের ইজ্জত থাকবে না। কোনিয়াকরা সাঙটামরা গায়ে থুতু দেবে।
এর মধ্যে মেয়ে-পুরুষেরা উঠে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে বুড়ো খাপেগাকে। মাথা নেড়ে নেড়ে তারা সায় দিল, হু-হু, ঠিক বলেছিস সদ্দার। আমাদের বস্তির ইজ্জত আছেনা? না বলে কয়ে শয়তানেরা বস্তিতে ঢুকবে, জান থাকতে তা আমরা হতে দেব না। হু-হু।
সকলকে ঠেলে গুতিয়ে একটা অর্ধনগ্ন যুবতী সামনের দিকে এগিয়ে এল। সে হল সারুয়ামারুর বউ জামাতসু। রুক্ষ, ঘন চুলের ফাঁকে ফাঁকে আরেলা ফুল গোঁজা।সগোল মসৃণ। স্তন দু’টি টস টস করছে, কিছুদিনের মধ্যে সন্তানের জন্য প্রাণরস আসবে। সুধায় ভরে যাবে। চোখের কোলে কালো দাগ পড়েছে, মাজা এবং পেট স্ফীত হয়ে উঠেছে, নিটোল উরুর পাতলা চামড়ার তলায় লাল রক্তের বেগবান ধারাগুলি উত্তেজনায় ছোটাছুটি করছে। মাতৃত্ব দেখিয়ে বেড়ায় সে। খুব সম্ভব, এই দেখানোর মধ্যে অতি স্পষ্ট এক গৌরব বোধ রয়েছে।
অলস ভঙ্গিতে মাথার ওপর হাত দুটো তুলে হাই তুলল জামাতসু। চোখের ঘনপক্ষ্ম পাতাদু’টি সন্তান ধারণের গর্বে বুজে বুজে আসছে। অপরিসীম ক্লান্ত গলায় সে বলল, এই সদ্দার, আসল কথাটা ভুলে মেরে দিলি, দেখছি।
কী আবার ভুললাম রে কুকুরের বাচ্চা? বিরক্ত চোখে তাকাল বুড়ো সর্দার।
খুব যে খিস্তি দিচ্ছিস! হুই মেহেলী যে বিয়ের আগেই সেঙাইকে দেখল, তার একটা ব্যবস্থা করতে হবে না? তোর আক্কেল নেই? তুই এখনও বেঁচে রয়েছিস! তুই থাকতে বস্তিতে পাপ ঢুকবে? আনিজার গোেসা এসে পড়বে? তা হতে পারে না।
প্রবলভাবে ঘাড়খানা ঝাঁকিয়ে বুড়ো খাপেগা বলল, হু, হতে পারে না। আমি এখনও বেঁচে আছি। মেহেলীর শয়তানীর কথা ভুলিনি রে জামাতসু। আগে হুই সায়েব আর সালুয়ালাঙ বক্তির শয়তানগুলোকে সাবাড় করি। তারপর মেহেলী মাগীর চামড়া উপড়ে ফেলব। আমি যদ্দিন বেঁচে আছি তদ্দিন বস্তিতে পাপ হতে দেব না।
