খাওয়ার পর্ব শেষ হল। পরিতৃপ্তির একটা ঢেকুর তুলল সেঙাই।
আচমকা ওঙলেদের দৃষ্টি এসে পড়ল রেঙকিলানের দিকে। মোটা মোটা আঙুল দিয়ে টঘুটুঘোটাঙ পাতার খাবারগুলো সে নাড়াচাড়া করছে। মাংস আর রোহি মধুর পাত্র তেমনি পড়ে রয়েছে। কিছুই খায়নি সে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল হয়ে উঠেছে রেঙকিলানের। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে।
সন্ত্রস্ত গলায় ওঙলো বলল, কি রে রেঙকিলান, কী হয়েছে তোর? খাচ্ছিস না যে, শরীর খারাপ নাকি?
সেঙাইর গলা থেকে বিরক্তি ঝরল, কি জানি কী হয়েছে। বিয়ে করে একটা ছাগী হয়ে গিয়েছে ওটা। ওকে নিয়ে শিকারে গিয়ে ভুলই করে ফেলেছি।
নিরুত্তর রইল রেঙকিলান। শুধু অদ্ভুত ঘোলাটে দৃষ্টিতে সকলের দিকে তাকাতে লাগল। কিছুই যেন শুনতে পাচ্ছে না, কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কতকগুলো অস্পষ্ট কথা, কতকগুলো আবছা মুখ তার ইন্দ্রিয়ের ওপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। মনের ওপর ক্ষীণ রেখাপাতও হচ্ছে না।
হা হা করে হাসির লহর তুলল সেঙাই, একেবারে বোবা মেরে গেছে রে ছাগীটা। কেলুরি বস্তির মোরাঙের নাম ডোবাবে। থুঃ—থুঃ—থুঃ–একদলা থুতু রেঙকিলানের গায়ে ছিটিয়ে দিল সে।
বিস্মিত ওঙলে বলল, কী হল রে সেঙাই?
কী হয়নি বল? ছাগীটাকে নিয়ে একটা সম্বরের খোঁজে নদীর ওপারে গিয়েছিলাম।
কোথায়! সালুয়ালাঙ বস্তিতে! চিৎকার করে উঠল ওঙলে। আতঙ্কে চোখে দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসবে যেন তার।
হু-হু। তাতে কী হয়েছে? তুইও দেখি রেঙকিলানের মতো ভীতু মেরে যাচ্ছিস। সেঙাই ভুরু কুঁচকে ধিক্কারের সুরে বলল।
আরে না না, তেমন বংশের ছেলে আমি না। আমিও খোখিকেসারি বংশের ছেলে। আমার জেঠা হল খাপেগা। মুখ সামাল দিয়ে কথা বলবি সেঙাই। গর্জে উঠল ওঙলে। ভীরু! এই অন্যায় অপবাদ তার বন্য পৌরুষকে রীতিমতো আহত করেছে।
ওঙলের দিকে একবার তির্যক চোখে তাকাল সেঙাই। একটা খ্যাপা চিতাবাঘের মতো দুর্বার আর ভয়ঙ্কর ওঙলে। ওকে ঘাঁটানো সুবিধের হবে না। সাঁ করে একটা বর্শা নির্বিকার ছুঁড়ে বসতে পারে সে।
দাঁতে দাঁত ঘষে শব্দ করে উঠল সেঙাই। তারপর চাপা গলায় বলল, আচ্ছা, কেমন মরদ, কাজের সময় দেখা যাবে।
দেখিস।
যেতে দে ও কথা। সেঙাই নিজে থেকেই ব্যাপারটা মিটিয়ে নিল, তারপর যা বলছিলাম। সম্বরটার তল্লাশে তো গেলাম সালুয়ালাঙে। আমি বর্শা দিয়ে ছুঁড়বার আগেই একটা চিতাবাঘ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওটার ঘাড়ে।
তাই বলি, দুপুরবেলা বাঁশের চাচারিতে শব্দ করলাম কত বার। তোদের কোনো সাড়াই নেই। ভাবলাম, ব্যাপার কী? আরেলা ঝোঁপটার পাশ থেকে বলে উঠল পিঙলেই, আবার দুপুর পেরিয়ে যখন বিকেল হল তখন চাচারি বাজালাম। তখনও তোদের সাড়া নেই। আমরা
তো ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। ওঙলে আর আমি ঠিক করলাম, তোদের তল্লাশে বেরুব। তারপর ঠিক পড়ন্ত বেলায় বস্তির ছেলেরা যখন গোরু-ছাগল-মোষ নিয়ে ঘরে ফিরছে ঠিক তখন তোদের চারির শব্দ পেলাম।
আরে যেতে দে, যেতে দে ও-সব কথা। একটা কাণ্ড হয়েছে। তা-ই শোন। আমার যা আনন্দ হচ্ছে তা কি আর বলব! দুটো পা ছড়িয়ে বেশ তরিবত করে বসল সেঙাই।
না-না, এখন না। এখন গল্প বললে দেরি হয়ে যাবে। মোরাঙে গিয়ে তোর গল্প শুনব সকলে মিলে। বড় শীত করছে সেঙাই। তা ছাড়া সন্ধ্যা হয়ে আসছে। চড়াই-উৎরাই ডিঙিয়ে, বনবাদাড় ঠেঙিয়ে যেতে যেতে রাত্তিরে খাবার সময় পার হয়ে যাবে। বড় শীত সেঙাই। হি হি করে কাঁপা গলায় বলল ওঙলে।
শীতের সন্ধ্যা। বাতাসে যেন গুঁড়ো গুঁড়ো হিম উড়ছে। মহাশূন্যের অন্ধকার ঘন হয়ে নামতে। শুরু করেছে নাগা পাহাড়ের ওপর।
সেঙাই বলল, তাই ভালো। বড্ড শীত করছে। মোরাঙে ফিরে আগুনের ধারে বসে বসে গল্প বলবখন।
শীতের বাতাসে যেন ধারাল দাঁত বেরিয়েছে। অনাবৃত দেহের ওপর কেটে কেটে বসছে তার নির্মম কামড়। আকাশে একটা একটা করে বিবর্ণ তারা ফুটতে শুরু করেছে। আর মাঝে মাঝে দমকা বাতাস সাঁ সাঁ করে আছড়ে পড়ছে নিবিড় বনের ওপর।
তিনজনে আরেলা ঝোঁপটার পাশ থেকে উঠে দাঁড়াল। একটা নিষ্প্রাণ শিলামূর্তির মতো এখনও স্থির হয়ে বসে রয়েছে রেঙকিলান।
সেঙাই বলল, কি রে, কী হল তোর? বস্তিতে ফিরবি না?
ভাবলেশহীন চোখে তাকাল রেঙকিলান। খানিকক্ষণ তাকিয়েই রইল। তারপর ফিসফিস গলায় বলল, আমি উঠতে পারছি না সেঙাই। শরীরটা বড় ভারী লাগছে। আমাকে টেনে তোল তোরা।
হো হো করে শীতের সন্ধ্যা কাঁপিয়ে, নাগা পাহাড়ের উপত্যকা দুলিয়ে দুলিয়ে হেসে উঠল ওঙলে, সেঙাই আর পিঙলেই। নাঃ, আনিজাতেই পেয়েছে ছাগীটাকে।
আনিজা! আর্তনাদ করে উঠল রেঙকিলান। অদ্ভুত ভয়ে গলা শুকিয়ে উঠছে। বুকের ভেতরটা যেন জ্বলতে জ্বলতে খাক হয়ে যাচ্ছে তার।
রেঙকিলানের আর্তনাদে স্তব্ধ হয়ে গেল তিনজন। সেঙাই, পিঙলেই আর ওঙলে। নিঃশব্দে তারা তিনখানা হাত বাড়িয়ে দিল। তিনটে হাতের আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দিল রেঙকিলান। তারপর খাড়াই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বেয়ে নিচের দিকে নামতে লাগল।
নিচের মালভূমিতে এখন গাঢ় অন্ধকার। সেখানে জটিল বনের আঁকিবুকি। এই মালভূমি পেরিয়ে দক্ষিণের পাহাড়। সেই পাহাড়ের চড়াইতে সেঙাইদের গ্রাম।
এর মধ্যে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। অবিরাম, অবিশ্রাম। আর এই কুয়াশার স্তরের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে নাগা পাহাড়। ক্কচিৎ দুএকটি মিটমিটে তারা নজরে আসে।
