জমায়েতের এক পাশে চুপচাপ কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছিল মেহেলী। ভিড়ের মধ্যে একাকার হয়ে মিশে রানী গাইডিলিওকে দেখছিল।
রানী গাইডিলিওর কথা মেহেলী শুনেছে খাপেগার কাছে। তা ছাড়া, কোহিমা থেকে ফিরে বুড়ো খাপেগার কেসুঙে বসে গাইডিলিওর অনেক গল্প করেছে সেঙাই। ভেতরের ঘর থেকে সেসবও শুনেছে মেহেলী। সেই থেকে তার মনে গাইডিলিও সম্বন্ধে এক অদম্য আগ্রহ জন্মেছে।
দু দিন হল কেলুরি গ্রামে রানী গাইডিলিও এসেছেন। মেয়ে-মরদ সকলেই তাঁকে দেখছে। অথচ মেহেলীর বেরুবার উপায় ছিল না। কেননা গাইডিলিওর কাছে সেঙাই আছে।
কাল রাতে জোয়ান ছেলেমেয়েরা রানীকে ফসল বোনার নাচ দেখিয়েছে। সারুয়ামারুর বউ জামাতসু সুরেলা গলায় গান শুনিয়েছে। খুলি এবং মোটা বাঁশের বাঁশির সুরে সমস্ত কেলুরি গ্রামটা কুঁদ হয়ে ছিল। ফুর্তিতে দুটো মোষ পুড়িয়ে খেয়েছে জোয়ানেরা। চোঙায় চোঙায় রোহিমধু গিলেছে। নাচ গান হল্লা চিৎকার বাজনা, এসব এই দু দিন অবিরাম চলছে। রানী গাইডিলিও নাচগানের খুব তারিফ করেছেন। বাজনদারেরা আর গায়েনরা খুব উৎসাহ পেয়েছে। নাচগান এবং গাইডিলিও সম্বন্ধে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা মেহেলীকে শুনিয়ে গিয়েছিল নানাজনে। অসহ্য কৌতূহলে চুপিচুপি একবার দেখতে এসেছিল মেহেলী। ভেবেছিল, ভিড়ের আড়াল থেকে গাইডিলিওকে এক পলক দেখেই চলে যাবে, কিন্তু ঠিক খাপেগা সর্দারের নজরে পড়ে গেল।
ভয়ে আতঙ্কে বুকের ভেতরটা দূর দূর করছে। চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। ক্রমে ক্রমে বুনো অস্ফুট মনের অনুভূতিগুলো লোপ পেয়ে যাচ্ছে মেহেলীর। ঘোর ঘোর আচ্ছন্ন দৃষ্টি, বেহুঁশের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। পা-মাথা টলছে। গা কাঁপছে থরথর।
এই পাহাড়ী সমাজ বড়ই নিষ্ঠুর। তার প্রথা, সংস্কার এবং বিশ্বাসগুলো অমান্য করলে চরম শাস্তি পেতে হয়। এ ব্যাপারে সামান্য করুণা আশা করাও বৃথা।
বুড়ো খাপেগা বর্শা বাগিয়ে এগিয়ে আসছে। রানী গাইডিলিওর পাশ থেকে লিকোক্যুঙবা চেঁচিয়ে উঠল, এই সর্দার, কী করছ? খুনখারাপি করবে নাকি? এই–
লিকোক্যুঙবার গলায় বাকি কথাগুলো আটকে রইল। হঠাৎ সামনের পাঁশুটে রঙের ঘাসবন কুঁড়ে ঝড়ের গতিতে সারুয়ামারু ছুটে এল। উত্তেজনায় তামাটে মুখখানা লাল দেখাচ্ছে। বুকটা উঠছে, নামছে। ফোঁস ফোঁস নিশ্বাস পড়ছে। লম্বা দম নিয়ে সে বলল, সদ্দার, সর্বনাশ হয়ে গেছে।
মেহেলীর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে সাঁ করে ঘুরে দাঁড়াল খাপেগা সর্দার। লাল লাল নোংরা দাঁত খিঁচিয়ে বলল, কী হয়েছে?
সালুয়ালাঙ বস্তি থেকে অনেক সায়েব আর পুলিশ বন্দুক নিয়ে আমাদের বস্তির দিকে আসছে। কোহিমার সেই ফাদারও ওদের সঙ্গে আছে। আমাকে আর সেঙাইকে যারা মেরেছিল তারাও আছে। এতক্ষণে টিজু নদী বুঝি পেরিয়ে এল শয়তানগুলো। কী হবে সদ্দার? কী হবে রানী? সারুয়ামারুর গলাটা উত্তেজনায় এবং ভয়ে কাঁপতে লাগল।
তিনকোনা পাহাড়ী গ্রাম কেলুরি। এপারে চড়াই, ওপারে উতরাই। চারপাশে মালভূমি এবং উপত্যকা। কেলুরিতে এসেই গ্রামের তিনটি প্রান্তে তিনজন পাহাড়ী জোয়ানকে মোতায়েন রেখেছিলেন রানী গাইডিলিও। কখন, কোন দিক থেকে অতর্কিতে পুলিশ এসে হানা দেবে, কিছু ঠিক নেই। গাইডিলিও উঠে দাঁড়ালেন। শান্ত গলায় বললেন, এইবার আমাদের যেতে হবে সর্দার। টিজু নদীর দিক দিয়ে পুলিশরা আসছে। বাঁ দিকে খাদ। আমরা কোন দিক দিয়ে যাব? কোন দিক দিয়ে গেলে ওরা আমাদের দেখতে পাবে না, সেটা দেখিয়ে দাও সর্দার।
কেন যাবি আমাদের বস্তি থেকে? সায়েবরা আসছে, লড়াইটা বাধিয়ে দিই। আসান্যুরা সায়েবদের সঙ্গে লড়াই করছে, আমরা পাহাড়ীরা পারি কিনা দেখ?
না না সর্দার, মারামারি খুনোখুনি আমাদের লড়াই নয়। একথাটা তোমাদের অনেক বার বলেছি। একটু থেমে, দৃঢ় গলায় বলতে লাগলেন গাইডিলিও, আমরা ধরা পড়লে তো চলবে সর্দার। নাগা পাহাড়ের সব মানুষকে সাহেবদের সম্বন্ধে বলতে হবে। বোঝাতে হবে। বুড়ো খাপেগা মাথা নাড়ল, হু-হু–
গাইডিলিও বললেন, একটা কথা তোমরা মনে রেখো সর্দার, একটু পরেই পুলিশ আসবে। গ্রাম তছনছ করে দেবে, তোমাদের মারবে, ঘরে হয়তো আগুন ধরিয়ে দেবে। তোমরা কিন্তু তাদের মেরো না। না মেরে, মার খেয়েই আমাদের লড়াই চলবে।
বিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইল বুড়ো খাপেগা। খানিক পর বলল, সায়েবরা মারবে, মার খাব আর মারব না, তেমন মানুষ আমরা পাহাড়ীরা নাই। হু-হু–
শঙ্কিত গলায় গাইডিলিও বললেন, না না, মারামারি নয় সর্দার। তোমরাই তো বলেছিলে আমি যা বলব, তাই করবে।
নীরবে ঘাড় নাড়ল বুড়ো খাপেগা। তাতে হাঁ-না কিছুই বোঝা গেল না।
সামনের দিকে এগিয়ে এলেন রানী গাইডিলিও। তার পেছনে জদোনাঙ। পাশে পাশে আরো জনকয়েক পাহাড়ী তরুণ।
চলতে চলতে গাইডিলিও বললেন, এখন যাচ্ছি সর্দার, আবার আমরা তোমাদের গ্রামে আসব। যেদিন এই পাহাড়ের কোথাও সাহেবদের সর্দারি থাকবে না সেদিন নিশ্চয়ই আসব। আজ সাহেবদের ভয়ে আমাদের পালিয়ে যেতে হচ্ছে, সেদিন পালাতে হবে না। আবেগে গলাটা কাঁপতে লাগল তার।
অস্ফুট মন দিয়ে গাইডিলিওর ভাবাবেগ বোঝা সহজ নয়। তবু তার কথাগুলো বুড়ো খাপেগার মন ছুঁয়েছে। নিঃশব্দে সে মাথা নাড়ছে।
