হু-হু, একেবারে কুঁড়ে ফেলব সায়েব শয়তানগুলোকে। হু-হু– অসংখ্য গলা থেকে ক্রুদ্ধ গর্জন কেলরি গ্রামের আকাশের দিকে উঠে গেল।
সামনে হাত বাড়িয়ে গাইডিলিও বললেন, যে কথাটা বলবার জন্যে আমি পাহাড়ে পাহাড়ে ছুটে বেড়াচ্ছি সেটা মন দিয়ে শোন। সাহেবরা আমাদের মেয়েদের ইজ্জত নিচ্ছে। আমাদের ধর্ম নষ্ট করছে। এটা কি আমরা মানুষ হয়ে সইতে পারি? দু’টি শান্ত, স্নিগ্ধ চোখ কঠিন এবং তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল গাইডিলিওর। পরনে মণিপুরী বেশভূষা; তার নিচে রক্তমাংস মেদমজ্জার আড়ালে যেন একটি মশাল জ্বলছে। দুচোখের তারায় তার ছটা ফুটে বেরিয়েছে।
না-না–মাথা নেড়ে নেড়ে, লম্বা হাতের বর্শা ঝাঁকিয়ে মানুষগুলো হল্লা করতে লাগল।
অসান্যরা (সমতোলের বাসিন্দা) সাহেবদের খেদাবার চেষ্টা করছে। আমরা পাহাড়ীরা সাহেবদের পছন্দ করি না। এই পাহাড় থেকে তাদের ভাগাতে হবে। কি, তোমরা রাজি তো? স্থির দৃষ্টিতে সামনের জটলার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলেন গাইডিলিও।
হু-হু, তুই যা বলবি, আমরা তাই করব রানী। তুই আমাদের বস্তির সেঙাই আর সারুয়ামারুকে বাঁচিয়ে দিয়েছিস। সায়েবরা কি মারই দিয়েছিল! তোর কথামতো আমরা চলব। জটলার মধ্য থেকে বুড়ো খাপেগার গলা পর্দায় পর্দায় চড়তে লাগল।
গাইডিলিও বলতে লাগলেন, আমাদের এই নাগা পাহাড়ে আমরা কত জাত একসঙ্গে রয়েছি। একজনের সঙ্গে আরেকজন ঝগড়া করেছি, আবার ভালোও বেসেছি। সুচেন্যু দিয়ে একে অন্যকে কুপিয়েছি, বর্শা দিয়ে কুঁড়েছি। আবার আওশে ভোজে কি টেটসে আনিজার নামে যখন শুয়োর বলি দিই, তখন রেঙমা হলে সেমাকে ডেকে খাওয়াই, সাঙটাম হলে কোনিয়াকদের নেমন্তন্ন করি। ঝগড়া হলে নিজেরাই মিটমাট করি, কি পুষে রাখি, পিরিত করলে নিজেরাই করি। এর মধ্যে অন্য কাউকে ডাকি না, ডাকবও না। একটু দম নিয়ে আবার শুরু হল, সাহেবরা আমাদের ওপর সর্দারি করতে এসেছে। আমরা পাহাড়ী মানুষ, গায়ে রক্ত থাকা পর্যন্ত আমাদের পাহাড়ে সাহেবদের সর্দারি করতে দেব না।
ঠিক ঠিক–আবার চেঁচামেচি শুরু হল। একটানা সেই চিৎকারে ছেদ নেই। থামবার লক্ষণ নেই।
বুড়ো খাপেগা হুঙ্কার ছাড়ল, চুপ রামখোর বাচ্চারা—
শোরগোল থেমে এল।
একসময় আবার গাইডিলিও বলতে লাগলেন, তার গলাটা তীক্ষ্ণ ধাতব শব্দের মতো বাজতে লাগল, এই পাহাড়ের এক দিক থেকে আর এক দিকে আমি আর আমার বন্ধুরা ছুটে বেড়াচ্ছি। বস্তিতে বস্তিতে গিয়ে সকলকে জানিয়ে দিচ্ছি, সাহেবরা আমাদের পাহড়ে এসে কেমন করে মেয়েদের ইজ্জত নিচ্ছে, ধর্ম নষ্ট করছে, সর্দারি করছে। সেই রাগে আমাদের পেছনে লেগেছে ওরা। পুলিশরা বন্দুক নিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের পেলে গুলি করে মারবে।
তোকে মারবে! তুই আমাদের বস্তিতে রয়েছিস; একবার এদিকে এসে দেখুক না শয়তানের বাচ্চারা। জান নিয়ে ফিরতে হবে না। তুই আমাদের বস্তিতে থাক রানী। ভিড়ের ভেতর থেকে কেলুরি গ্রামের সর্দার বুড়ো খাপেগা উঠে দাঁড়াল। অর্ধনগ্ন দেহ, লাফাতে লাফাতে গাইডিলিওর পাশে চলে এল সে।
তা হয় না সর্দার। অন্য বস্তিতেও আমাদের ঘুরতে হবে। নাগা পাহাড়ের প্রতিটি মানুষকে সাহেবদের শয়তানির কথা বলতে হবে। আসান্যুরা সাহেবদের ভাগাবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। দরকার হলে জান দিচ্ছে। তাদের সর্দারের নাম হল গান্ধিজি। তোমরা যদি আমার পাশে একসঙ্গে দাঁড়াও, এই পাহাড় থেকে সাদা শয়তানগুলোকে আমরাও খেদিয়ে দিতে পারি। সকলে মিলে রুখে না দাঁড়ালে সাহেবদের সঙ্গে পারা যাবে না। গাইডিলিওর গলা অত্যন্ত দৃঢ় শোনাল।
বুড়ো খাপেগার ঘোলাটে চোখের তারাদুটো নড়ে উঠল। হাতের বর্শায় ঝকানি দিয়ে সে বলল, হু-হু, তুই একবার বল না রানী, জোয়ানগুলোকে বর্শায় শান দিতে বলি, সুচ্যের ফলায় ধার দিতে বলি, অনেক তীরধনুক বানাতে বলি। আসান্যুরা সায়েবদের সঙ্গে লড়ছে, আর আমরা পারব না!
না না–সন্ত্রস্ত গলায় গাইডিলিও বললেন, খবরদার মারামারি নয়। আমরা মারব না, ওরা আমাদের মারুক। কত মারবে? মারতে মারতে নিজেরাই একদিন ঘায়েল হয়ে যাবে।
বিস্মিত, বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বুড়ো খাপেগা। বলল, এ কেমন লড়াই, মার খাব তবু মারব না!
ওপাশ থেকে সেঙাই চেঁচিয়ে উঠল, কি রে সদ্দার, কোহিমা থেকে ফিরে রানীর এই লড়াইটার কথা তোকে বলেছিলাম না? মার খেতে হবে, কিন্তু মারা চলবে না।
হু-হু–বুড়ো খাপেগা ঘাড় নাড়ল।
গাইডিলিও হয়তো আরো কিছু বলতেন–তার মুখচোখ দেখে তাই মনে হচ্ছিল; তার আগেই আচমকা বুড়ো খাপেগা সরোষ, ক্ষিপ্ত গলায় চিৎকার করে উঠল, ইজা হুবুতা! এই। মেহেলী, এই মাগী, তোকে না বলেছি সেঙাই-এর সামনে বেরুবি না। পনেরো দিন পর তেলেঙ্গা সু মাসে তোদের বিয়ে। কতবার বলেছি, বিয়ের আগে তোদের দেখা হলে আনিজার গোসা হবে। তা নয়, মরদের গন্ধ না পেলে মাগী ঠিক থাকতে পারে না। তর আর সইছে না। আজ সাবাড়ই করে ফেলব শয়তানীকে। বিশ্রী, কুৎসিত মুখভঙ্গি করল বুড়ো খাপেগা।
বুড়ো খাপেগার চিৎকারে এবং তার চেয়েও অনেক বেশি আতঙ্কে, পাহাড়ী নারী-পুরুষের জটলাটা একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। বিয়ের আগে মেহেলীর সঙ্গে সেঙাইর দেখা হয়েছে। পাহাড়ীদের সংস্কার এবং বিশ্বাসের দিক থেকে এ এক সাঙ্ঘাতিক অপরাধ। এই অজুহাতেই আনিজার রোষ এবং দণ্ড কখন কী রূপ ধরে এসে পড়বে, সেই আশঙ্কায় মানুষগুলোকে স্রিয়মাণ দেখাচ্ছে।
