থতমত, বিস্মিত, কিছুটা বা ভীত গলায় পিয়ার্সন বলল, কী বলছেন ফাদার! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। অসহায় মানুষকে রক্ষা করা তো ধর্ম পালনের মধ্যেই পড়ে।
আমি তোমার কাছে নীতিকথা শুনতে চাই না। পাহাড়ীদের গ্রামে গ্রামে তুমি কিসের খোঁজে যাও, সব খবরই আমি পাই। এতকাল শুনেছি, এখন দেখলাম। তোমার লজ্জা করে না, মিশনারি হয়ে পাহাড়ী মেয়েদের ওপর সুযোগ নিচ্ছ। ছিঃ ছিঃ, মিশনারিদের মর্যাদা আর রইল না। তোমার জন্যে মিশনারিরা পাহাড়ীদের চোখে ছোট হয়ে গেল। ধিক্কার দিয়ে থামল ম্যাকেঞ্জি।
মাথার কোনো অদৃশ্য বারুদের স্তূপে আগুন ধরে গেল যেন। জ্বলন্ত চোখে ম্যাকেঞ্জির দিকে তাকাল পিয়ার্সন, কিন্তু আশ্চর্য শান্ত গলায় বলল, আপনি স্পাই পাঠিয়ে গ্রামে গ্রামে আমি কী বলি, কী করি, সমস্ত খোঁজখবর নেন, তা জানি। পরে সেসব বোঝাপড়া হবে। এখন এর একটা ব্যবস্থা করুন ফাদার। ওর গ্রামের লোকেরা ওকে পেলে মেরে ফেলবে।
শুধু ওকেই মারবে, তোমাকে নয়? চোখের মণি দুটো একপাশে এনে তেরছা নজরে তাকাল ম্যাকেঞ্জি। বলল, যাক সে কথা, এ ব্যাপারে আমার কিছুই করার নেই।
কিন্তু–
তীব্র গলায় এবার গর্জে উঠল ম্যাকেঞ্জি, তোমার কোনো অজুহাত আমি শুনতে চাই না। তুমি চরিত্রহীন, রিপু আর কামের বশীভূত, চার্চ তোমার জায়গা নয়। গেট আউট, বেরিয়ে যাও। ইয়াস, বোথ অফ ইউ–
কী বলছেন ফাদার!
ঠিকই বলছি। চার্চে তোমাকে থাকতে দেওয়া হবে না। মিশনারি হওয়ার তুমি অযোগ্য। তোমার মতো লোক থাকলে ক্রিস্ট্যানিটির পক্ষে ভয়ানক বিপদের কথা। গেট আউট, গেট আউট–চিৎকার করে উঠল ম্যাকেঞ্জি। উত্তেজনায় গলার শিরাগুলো ফুলে ফুলে উঠছে। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে।
ম্যাকেঞ্জির চিৎকারে চার্চ থেকে আরো কয়েকজন মিশনারি বেরিয়ে এসেছে। একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে তারা।
স্থির গলায় পিয়ার্সন বলল, বেশ, তাই হোক ফাদার। আমরা চলেই যাচ্ছি। আশা করি, আবার দেখা হবে। সেদিনের জন্যে সব বোঝাপড়া ভোলা রইল।
বলতে বলতে চিনাসাঙবার একটা হাত ধরে শান্ত ভঙ্গিতে পা ফেলে ফেলে কোহিমার পথে নেমে গেল সে।
.
৪৪.
রানী গাইডিলিও এসেছে।
ছোট্ট কেলুরি গ্রামটা খুশিতে, উত্তেজনায় এবং হল্লায় মেতে উঠেছে।
গ্রামের পশ্চিম দিকে যে বড় মোরাঙটা রয়েছে, তার পাশ ঘেঁষেই একখানা সুন্দর ঘর বানিয়ে দিয়েছে কেলুরি গ্রামের মানুষেরা। মোটা মোটা বাঁশের পাটাতন, আতামারি পাতার ছাউনি আর ভেরা কাঠের দেওয়াল। ভেতরে বাঁশের মাচানে তুলোর দড়ির লেপ, খড়ের বালিশ, সব মিলিয়ে পরিপাটি বিছানা।
সকাল থেকে অনেক রাত পর্যন্ত ঘরটার সামনে নারী-পুরুষের জটলা থাকে। কেউ নিয়ে আসে রুণ স্বামীকে, কেউ পঙ্গু বাপ-মা বা ছেলেকে। প্রত্যেকেই নিজের নিজের বিকলাঙ্গ, অসুস্থ, অক্ষম প্রিয়জনকে নিয়ে হাজির হয়। গাইডিলিও একটু ছোঁবেন। তার স্পর্শে রোগ-জরা চলে যাবে, অক্ষম পঙ্গু অসুস্থ মানুষগুলো সুস্থ, বলিষ্ঠ এবং সক্ষম হবে। আনিজার খারাপ নজর সরে যাবে। সেই আশায় সারাদিন ভিড় জমে থাকে গাইডিলিওর ঘরের সামনে।
এখন দুপুর। ঝকঝকে রোদে ভরে গিয়েছে চারিদিক। দূরের বনটা নিশ্চল সবুজ নদীর মতো দেখায়। বনের মাথায় এক ধরনের লাল ফুল থোকায় থোকায় ফুটেছে। মনে হয়, সবুজ নদীর মাথায় আগুন জ্বলছে।
ঘরটার পাশেই একখণ্ড তিনকোনা পাথর। তার ওপর বসে রয়েছে রানী গাইডিলিও। তাঁর সঙ্গে এসেছে জদোনাঙ, লিকোক্যুঙবা এবং আরো জনকয়েক পাহাড়ী তরুণ। গ্রামে গ্রামে দমকা ঝড়ের মতো ছুটে বেড়াচ্ছেন গাইডিলিও।নাগাপাহাড়ের প্রাণকোষে স্বাধীনতার যে প্রখর আকাঙ্ক্ষাটি ফুটেছে, দিকে দিকে তা প্রতিটি নাগার মনে ছড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তার ক্ষান্তি নেই, বিরাম নেই।
গাইডিলিওর ঘরের সামনের ফাঁকা জায়গাটায় কেলুরি গ্রামের লোকজন ভিড় করে আছে। রীতিমতো শোরগোল শুরু হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি মাতবৃরি করছে সেঙাই। কখনও ধমকে, কখনও গর্জে, আবার কখনও বর্শার বাজু দিয়ে ধাক্কা মেরে সকলকে বাগে রাখছে।
কেলুরি গ্রামে গাইডিলিও এসেছেন। এর সবটুকু কৃতিত্ব এবং গৌরব যেন একমাত্র সেঙাই এর প্রাপ্য। ঘন ঘন মাথা নেড়ে সে বলছে, বলেছিলাম না রানী আসবে, হু। দ্যাখ, কেমন বড় বড় চোখ, চওড়া কপাল–
সকলেই এসেছে, কিন্তু মেহেলী আসেনি। মাঝখানে আর পনেরো দিন, তার পরেই তেলেঙ্গা সু মাসের শুরু। সেই মাসেই সেঙাই-এর সঙ্গে মেহেলীর বিয়ে। বিয়ের আগে মেহেলীর সঙ্গে সেঙাই-এর দেখা হওয়া বারণ। তাই মেহেলী আসেনি।
ওপাশে পিঙলেই সমানে চিৎকার করছে। তার পাঁজরে বর্শার বাজু দিয়ে একটা খোঁচা লাগায় সেঙাই। সঙ্গে সঙ্গে পিঙলেই হুমকে উঠল, ওরে টেফঙের বাচ্চা, খুব ফুটুনি হয়েছে তোর। পনেরো দিন পর মেহেলীকে বিয়ে করে মোরাঙ থেকে ভাগবি, তাই বুঝি মেজাজ গরম হয়ে রয়েছে। একেবারে জানে সাবাড় করে ফেলব।
ইজু হুবতা! চুপ কর শয়তান, দেখছিস না, রানী কথা বলছে। সেঙাই ধমকে উঠল।
কে যেন বলল, ও রানী,বল না, আমাদের এই পাহাড়ের গল্প বল। কাল অনেক রাত হয়ে গেল। তাই সবটা শোনা হয়নি। আজ বাকিটা বল।
প্রসন্ন হাসিতে মুখখানা ভরে গেল রানী গাইডিলিওর। বললেন, গল্প নয়, সত্যি কথা। জানো তো, কত বড় আমাদের এই নাগা পাহাড। কত জাত আমাদের। বেঙমা, সাঙটাম, আও, লোহটা, কোনিয়াক, অঙ্গামী, সেমা। তাদের যে কত বংশ, তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের পাহাড়ে সাহেবরা এসেছে। সাহেবদের সঙ্গে আমাদের ঝগড়া নেই, কিন্তু তারা যখন আমাদের পাহাড়ে সর্দারি করছে তখন তো আর সহ্য করা যায় না।
