সামনের ঘাসের জমিটার ওপর বড় বড় পা ফেলে সালুয়ালা গ্রামের সর্দার এগিয়ে এল। ম্যাকেঞ্জির পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল। লম্বা বর্শা এবং ঝাকড়া মাথাটা একসঙ্গে ঝাঁকিয়ে সে বলল, হু-হু– ফাদার, অনেক খবর আছে। মজাদার খর।
বল কী খবর? কৌতূহলে চোখজোড়া তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জির।
হুই যে টেপঙের বাচ্চা সেঙাই তোর কাছে এসেছিল, তাদের বক্তির নাম কেলুরি। আমাদের বস্তির মেহেলী শয়তানী সেখানে ভেগেছে, সেকথা তো তুই জানিস। মেহেলীকে ওরা আটকে রেখেছে। দুটো ছোকরাকে সেদিন রাত্তিরে ওদের বস্তিতে পাঠিয়েছিলাম। তাদের বর্শা দিয়ে ফুড়েছে। এর শোধ তুলতে হবে। তোরা আমাদের হয়ে লড়বি। তোদের বন্দুক নিয়ে আমাদের সঙ্গে যাবি। কেলুরির শয়তানগুলো ভালো লড়ে। বন্দুক না নিয়ে গেলে হবে না। ঘঘালাটে চোখে ম্যাকেঞ্জির দিকে তাকাল সালুয়ালা গ্রামের সর্দার।
বিরক্ত উগ্র গলায় ম্যাকেঞ্জি বলল, এই কথা বলবার জন্যেই বুঝি এত রাতে কোহিমা এসেছ!
না রে সায়েব, অন্য খবরও আছে। আরো একটু ঘন হয়ে দাঁড়াল সালুয়ালা গ্রামের সর্দার। তার গা থেকে একটা মিশ্র দুর্গন্ধ ধক করে নাকে এসে লাগল ম্যাকেঞ্জির। নাকটা স্বাভাবিক নিয়মেই কুঁচকে গেল।
মুখে নিস্পৃহ ভঙ্গি ফুটিয়ে ম্যাকেঞ্জি বলল, অন্য খবর বলতে?
তিন দিন ধরে গাইডিলিও ডাইনিটা কেলুরি বস্তিতে এসে রয়েছে। হু-হু–ঘন ঘন মাথা নাড়তে শুরু করল সালুয়ালাঙের সর্দার। বলল, তুই আমাকে টাকা কাপড় খাবার দিয়েছিলি। নিমকহারামি করব না। গাইডিলিওর খবর দিয়ে গেলাম ফাদার।
এতক্ষণ অনেক দূরের আবছা পাহাড়চূড়ার দিকে তাকিয়ে ছিল বসওয়েল। অলস ভঙ্গিতে তামাকের ধোঁয়া ছাড়ছিল। গাইডিলিওর নামটা কানে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নড়ে চড়ে খাড়া হয়ে বসল। বলল, কোথায়–হোয়ার ইজ দ্যাট উইচ, দ্যাট মিংক্স গাইডিলিও?
সর্দার বলল, তিন দিন ধরে কেলুরি গ্রামে আস্তানা গেড়েছে।
এখুনি, জাস্ট নাউ আমরা স্টার্ট করব। আমি আউট-পোস্টে যাচ্ছি। ফোর্স নিয়ে রেডি হই গিয়ে। আপনিও আমাদের সঙ্গে যাবেন ফাদার। আর এই ভিলেজ হেডম্যানটাকে ধরে রাখুন। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। বলতে বলতে বিরাট দেহ নিয়ে লাফিয়ে উঠে পড়ল বসওয়েল। তারপর একরকম ছুটতে ছুটতে ঘাসের জমিটা পেরিয়ে কোহিমার আঁকাবাঁকা পথে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সর্দারের পিঠে একখানা হাত রেখে সোহ্লাসে ম্যাকেঞ্জি বলল, বুঝলে সর্দার, এখুনি তোমাদের সঙ্গে পুলিশ আর বন্দুক নিয়ে আমরা যাব। কেলুরি বস্তি থেকে মেহেলীকে ছিনিয়ে
এনে তোমাদের হাতে তুলে দেব। কি, খুশি তো?
খুব খুশি, হু-হু, খুব খুশি–আনন্দ এবং উত্তেজনার মিশ্র অনুভূতিতে সালুয়ালাঙের বুড়ো সর্দারের চোখজোড়া বুজে আসতে লাগল। জড়ানো গলায় বলল, মেহেলীকে না আনতে পারলে না খেয়ে মরতে হবে। আমাদের বস্তির মেয়ে অন্য বস্তিতে পালিয়ে রয়েছে, আমাদের ইজ্জত সাবাড়। সাঙটামরা অঙ্গামীরা এখন ধান বদল করে না, হাঁড়ি দেয় না, লোহার ছুরি আর লাঙল দেয় না। আবাদ করতে পারি না। চল ফাদার, তাড়াতাড়ি চল।
কোহিমার আকাশে সুলু পক্ষের চাঁদ পরিপূর্ণ গোলাকার হয়ে উঠেছে। স্নিগ্ধ, উজ্জ্বল আলোয় দিগদিগন্ত ভেসে যাচ্ছে।
.
খানিকটা সময় কেটে গেল। পায়ের কাছে বশংবদ কুকুরের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে রয়েছে সালুয়ালাঙের সর্দার।
একটু পরেই বসওয়েল আসবে। কেলুরি গ্রামে হানা দিতে হবে। তবু কেন যেন তেমন উৎসাহ পাচ্ছে না ম্যাকেঞ্জি। সে ভাবল, ইণ্ডিয়ার মাটিতে সাত সাতটা বছর কাটিয়ে তার। উদ্দামতা কেমন মরে আসছে। রক্ত ঝিমিয়ে যাচ্ছে। দেহমনের সক্রিয় ইন্দ্রিয়গুলোর ওপর মাকড়সার জালের মতো ছায়া নেমেছে। ব্রেটব্রুকশায়ারের সেই দুর্দান্ত আউটল একটু একটু করে যেন নিজের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে। মুখে মুখে যতই তর্জন গর্জন করুক, এই ভয়ঙ্কর সত্যটা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই ম্যাকেঞ্জির। কাছে কেউ না থাকলে এই ভাবনাটা টুটি টিপে ধরে। পারতপক্ষে তাই একা থাকে না ম্যাকেঞ্জি। ইণ্ডিয়ার নরম মাটির বিশ্রী প্রভাব আছে। জীবনের উদ্দাম ভীষণ গতিকে সেটা পদে পদে থামিয়ে দেয়।
ইণ্ডিয়ায় প্ৰিচ করতে এসে একটি নগদ লাভ হয়েছে ম্যাকেঞ্জির। কয়েক দিন বাদে বাদে নিয়মিত কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। কয়েক ঘন্টা মাত্র মেয়াদ। তার মধ্যেই শরীরটাকে বড় পঙ্গু করে দেয়। দেহের সঙ্গে সঙ্গে মনেরও রুগণতা দেখা দিয়েছে। যতটা সম্ভব, ম্যাকেঞ্জি সব রকম দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলতে চায়। দেহ যাক, মনের দিকে দুর্বলতার হাত সে কিছুতেই বাড়াতে দেবে না। যতই ভাবে মনের জোর ততই যেন কমতে থাকে। ভেতরে ভেতরে যুঝতে বুঝতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে ম্যাকেঞ্জি।
চোখ জ্বালা করছে। অবসাদে হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে। কপালের দু’পাশে দুটো রগ নাচছে। জ্বর আসবে বোধ হয়।
আরো কিছুক্ষণ পর ঝড়ের মতো এসে পড়ল পিয়ার্সন। তার পেছনে একটি পাহাড়ী মেয়ে। চিনাসঙবা। ম্যাকেঞ্জি চমকে উঠল। তীক্ষ্ণ চড়া গলায় বলল, কী ব্যাপার পিয়ার্সন?
ফাদার, এই মেয়েটাকে ওর গ্রামের লোকেরা মেরে ফেলছিল। আমি বাঁচিয়ে এখানে নিয়ে এসেছি। একে আশ্রয় দিতে হবে।
ম্যাকেঞ্জি চিৎকার করে উঠল, ইট ইজ চার্চ। বদমাইশি করার জায়গা নয়। রাত দুপুরে ন্যাংটো মেয়ে নিয়ে এখানে উঠবে, আমি কিছুতেই বরদাস্ত করব না।
